‘নিখোঁজ’ ব্যক্তিদের বিষয়ে জাতিসংঘের মাধ্যমে তদন্তের আহ্বান

‘নিখোঁজ’ বা ‘গুম হওয়া’ ব্যক্তিদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা জানার জন্য জাতিসংঘের মাধ্যমে তদন্ত করতে আহ্বান জানিয়েছেন তাদের স্বজনরা।

মঙ্গলবার (৩০ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর শাহবাগে জাদুঘরের সামনে ‘নিখোঁজ’ ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর আয়োজনে এক মানবন্ধনে এই আহ্বান জানানো হয়।

মানবন্ধনে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, মানবাধিকার কর্মী ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন। নিখোঁজ রয়েছেন এমন ২৮ জনের ছবি নিয়ে তাদের স্বজনরা দাঁড়িয়েছিলেন মানববন্ধনে। এদের (নিখোঁজ) মধ্যে নাসির উদ্দিন পিন্টু একজন। তার গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরে।

পিন্টুর ভাই আল আমিন বলেন, ‘ভাইয়ের সন্ধানে আমি গত সাত-আট বছর ধরে বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াচ্ছি, কিন্তু সরকার কিছুই বলছে না। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি এতোই দুর্বল যে, তাদের বিষয়ে কিছুই করতে পারছে না। আর কত বিচার চাইবো আমরা?'

নিখোঁজ আল মোকাদ্দেসের চাচা পরিচয় দিয়ে একজন বলেন, ‘২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি র‌্যাব-৪ এর ক্যাম্পের সামনে থেকে মোকাদ্দেসকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। আমরা উচ্চ আদালতে রিট মামলা করেছিলাম, উচ্চ আদালত সশরীরে মোকাদ্দেসকে হাজির করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিল, কিন্তু আপিল বিভাগ সেটি স্থগিত করে দেয়।’

মায়ের ডাক (3)
তিনি বলেন, ‘আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়েছি, আন্তর্জাতিক গুম দিবসে আমাদের দাবি, স্বজনদের আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেন।'

নিখোঁজ ওমর ফারুকের ছেলে ইমন ফারুক বলেন, ‘এখানে আমরা আছি, তাদের কারও বাবা, কারও চাচা, কারও সন্তান গুম হয়েছে। এই নির্মমতা একাত্তরের নির্মমতাকেও ছাড়িয়ে যায়।'

তিনি বলেন, 'আমার বাবা চেয়ারম্যান ছিলেন, তাকে গুম করা হয়েছে। আমরা চাই জাতিসংঘের মাধ্যমে তদন্ত কমিটি গঠন করে গুম হওয়া মানুষের বিষয়ে খোঁজ খবর নেওয়া হোক, তাদের কোথায় রাখা হয়েছে তা বের করা হোক?'

তিনি আরও বলেন, 'আমরা আর কোনও অভিযোগ করবো না, আপনারা তাদের ফিরিয়ে দিন।'

মানববন্ধনের অংশ নেন মিরপুরের কাঠ ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন বাতেনের মেয়ে আনিসা ইসলাম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'বাবাকে ফিরে পেতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও অভিযোগ করেছি, ঊর্ধ্বতনদের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি, তিন বছর ধরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি। বাবার জন্য নামাজ পড়ে দোয়াও করতে পারি না, কারণ আমরা জানি না, তিনি জীবিত না মৃত। তারা কি আমাদের কথা বুঝতে পারেন না? আমার বাবাকে দয়া করে ফিরিয়ে দিন।'

মায়ের ডাক (2)

মানববন্ধনে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন তার বক্তব্যে বলেন, ‘গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিরা ফিরে এসে একটা কথাও বলতে চান না। তাদের এমনভাবে নির্যাতন করা হয়, এমন ভয় ভীতি দেখানো হয়; তারা কিছুই বলতে চান না। অবিলম্বে স্বাধীন নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করা হোক। জাতিসংঘ সনদে অবিলম্বে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করুক। অবিলম্বে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হক।'

মানববন্ধনে যোগ দিতে কুমিল্লা থেকে এসেছেন সাবিনা ইয়াসমিন নামে এক নারী। তার ২৪ বছরের ছেলে ফজলে রাব্বি কুমিল্লার মুরাদনগর থেকে নিখোঁজ হন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার ছেলে সহজ সরল, সে কোনও রাজনীতিও করে না। তাকে ২০১৬ সালের ১৭ জুলাই মুরাদনগরের গাজীপুরের একটি মসজিদ থেকে তুলে নিয়ে যায় একটি কালো গাড়ি, তার কী দোষ? আমরা জানি না, সে জীবনে একটা পিপড়াও মারেনি, তাকে কেন তুলে নিলো?'

মানববন্ধনে অংশ নিয়ে ডাকসুর সাবেক ভিপি ও গণঅধিকার পরিষদের সদস্য সচিব নুরুল হক নুর বলেন, 'রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তন না হলে গুম হওয়া মানুষকে ফেরত পাবো কিনা আমরা জানি না।'

এসময় নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না তার বক্তব্যে বলেন, 'আমার মনে চায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এখানে নিয়ে আসি। তিনি দেখুক, দেশে নিখোঁজ বা গুম হয়েছে কিনা।’

তিনি নিখোঁজ স্বজনদের উদ্দেশে বলেন, ‘হঠাৎ করে মনে করার কোনও কারণ নেই, এই সরকার আপনাদের কান্না শুনে সহানুভূতি দেখাবে, এটা মনে করলে ভুল করবেন।’