অপরাধে জড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে—কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকার এমন ৩৬ জন নারী-পুরুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মমুখী করেছে র্যাব। প্রশিক্ষণ শেষে বৃহস্পতিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সনদ ও সেলাই মেশিন।
অপরাধে জড়ানোর আগেই এসব নারী-পুরুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করা হয়েছে। এখন তারা কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পে এবং নিজ পরিবারে গঠনমূলক ভূমিকা রাখবেন।
বৃহস্পতিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকালে কক্সবাজারের লং বিচ হোটেলের বলরুমে ‘নবজাগরণ: অপরাধকে না বলুন’ শীর্ষক এক কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তারা কেউ অপরাধী না। তবে জড়ানোর সম্ভাবনা ছিল। কক্সবাজারে দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থান কম, এমন সব এলাকা থেকে তাদের বাছাই করা হয়েছে। তাদের আলো দেখিয়েছে র্যাব। তারা এখন কাজ করে পরিবারে অবদান রাখবে।’
প্রথম দফায় ২৫ জন পুরুষ ও ১১ জন নারী প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। যারা এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তারা সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিজেদের সংযুক্ত করবেন।
র্যাবের মহাপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘সারা দেশে যে মামলা হয়, তার ৪০ শতাংশ মাদকের মামলা। আমরা প্রতিবছর অনেক মাদক উদ্ধার করি। কিন্তু মাদক কারবারিরা তাদের পাচারের ধরন পরিবর্তন করে, আমরাও অভিযানের ধরন পরিবর্তন করি।’
যেসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ
সেলাই, ড্রাইভিং, সার্ফিং, গৃহ-ব্যবস্থাপনা বা হাউজ কিপিং, ট্যুরিস্ট গাইড ও ফটোগ্রাফি—এই ৬টি বিষয়ে তালিকাভুক্ত ৩৬ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
ট্যুরিস্ট গাইড হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়া তৌহিদুল ইসলাম তৌহিদ বলেন, ‘পর্যটন ও কক্সবাজারের পর্যটন সেক্টরের পরিবেশ উন্নয়নে আমরা ভূমিকা রাখবো।’
সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন সেতারা আক্তার মুক্তা। তিনি বলেন, ‘এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমরা স্বাবলম্বী হতে পারবো। এতে আমার বেকারত্ব দূর হবে। আমরা যারাই প্রশিক্ষণ নিয়েছি, সবাই সাবলম্বী হবো।’
অনুষ্ঠানে পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘র্যাব আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখতে ও নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধের কাজ করে। র্যাব এটা নিয়মিত করে যাচ্ছে।’
বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘আমরা এমনও দেখেছি, মা তার জঙ্গি ছেলেকে র্যাবের হাতে তুলে দিয়েছে। আত্মসমর্পণ করা জঙ্গিরা স্বাভাবিক জীবনে এসেছে। তারাও কিন্তু ভালো হয়েছে। তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পুনর্বাসন করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের যে অর্থনৈতিক অবস্থা, তাতে সবাই উদ্যোক্তা হতে পারে। চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী এই কথাটা বলেছেন, আমিও তার কথায় প্রতিধ্বনি রেখে বলতে চাই।’
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি বলেন, ‘তরুণ বয়সের ছেলেমেয়েরা বেশি অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কেবল ফৌজদারি মামলা দিয়ে সমাজকে অপরাধমুক্ত করা যাবে না। যারা প্রথম পর্যায়ে অপরাধ করে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা না দিয়ে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উচিত। সারা বিশ্বে এটাই হয়। আমাদেরও তাই করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘জলদস্যু ও বনদস্যু গ্রেফতারের পাশাপাশি অনেকে আত্মসমর্পণ করেছে। র্যাব কেবল আত্মসমর্পণ করায়নি, তাদের খোঁজ-খবর নেয় নিয়মিত। তাদের পুনর্বাসন না করা পর্যন্ত খোঁজ-খবর নেয়। র্যাবের এই পুনর্বাসনের বিষয়টিকে আরও বড় আকারে করলে দেশের মানুষ আরও উপকৃত হবে।’
কক্সবাজারের মেয়র মজিবুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, ‘কক্সবাজারে আগে টোকাই ছিল, এখন কিশোর গ্যাং হয়েছে, তারা এখন অপহরণ করে। এগুলো রোধ করতে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। এই শহরে চাঁদাবাজ, টোকাই, কিশোর গ্যাং—এটা ভাবা যায় না।’
তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারে ইয়াবার ছড়াছড়ি। সবাইকে র্যাব ও পুলিশ হতে হবে। কেবল পুলিশ এটা পারবে না। কারণ, একটা ইয়াবার দাম তিনশ’ টাকা। মাদক ব্যবসায়ীরা তাই কোনও কিছু পরোয়া করে না। এদের প্রতিহত করতে হবে।’
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মামুনুর রশীদ বলেন, ‘র্যাবকে অভিনন্দন, তারা এই উদ্যোগে প্রথমেই কক্সবাজারকে বেছে নিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এই ধরনের আয়োজনে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো আরও উৎসাহ পাবে, একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’