টিপু হত্যাকাণ্ড

চার্জশিটে থাকতে পারে একাধিক সন্ত্রাসী ও আ.লীগ নেতার নাম

রাজধানীর মতিঝিলে আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শেষ পর্যায়ে। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত এখন পর্যন্ত ২৭ জনকে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। অচিরেই এ হত্যা মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হবে।

শনিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বাংলা ট্রিবিউনকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশিদ।

অতিরিক্ত কমিশনার আরও বলেন, এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তকাজ শেষ করা হয়েছে। রাজধানীর মতিঝিলে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সেগুলো মূলত আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে। দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী মুসাকে ওমান থেকে ফিরিয়ে আনা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার কাছ থেকেই হত্যাকাণ্ডের অনেক বিষয় সম্পর্কে আমরা জানতে পেরেছি।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, হত্যাকাণ্ডের পর একটি মোবাইল নম্বরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর সূত্র ধরে তদন্তে উঠে আসে শুটার মাসুমের নাম। গ্রেফতার করা হয় মাসুম ওরফে আকাশকে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসে মুসার নাম। ওমান থেকে গ্রেফতারের পর নিয়ে আসা হলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও ফ্রিডম মানিকের।

নাম আসতে পারে যাদের
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, হত্যার পরিকল্পনায় অংশ নেওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান, ফ্রিডম মানিক, সাবেক আওয়ামী লীগ নেতাসহ ২০ থেকে ২২ জনের নাম থাকতে পারে চার্জশিটে। এর মধ্যে থাকতে পারে আওয়ামী লীগ নেতা সোহেল শাহরিয়ার, দামাল, মানিক, ফারুক, পলাশ, সালেহসহ ১২ জন‌।

সূত্র আরও জানায়, ২০১৯ সালে ক্যাসিনো-বিরোধী অভিযানে গ্রেফতার হন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূইয়া। এর পরপরই মতিঝিল এলাকার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় জাহিদুল ইসলাম টিপুর হাতে। শুরুর দিকে টিপুর সঙ্গে বেশ সখ্য ছিল শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও ফ্রিডম মানিকের। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তাদের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে ঘটে সম্পর্কের অবনতি। সম্পর্কের অবনতির জের ধরে টিপুকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার হারুন অর রশিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপুকে। মামলাটির সব বিষয় মাথায় রেখেই তদন্ত করা হয়েছে। তদন্তে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

সেদিন যা ঘটেছিল
২০২১ সালের ২৪ মার্চ রাতে মতিঝিল থেকে শাহজাহানপুর বাসায় ফেরার পথে শাহজাহানপুর রেলগেট পার হওয়ার সময় যানজটে আটকে থাকা গাড়ি লক্ষ্য করে অতর্কিত গুলি চালানো হয়। এ সময় প্রাইভেট কারের চালকের পাশে বসে থাকা জাহিদুল ইসলাম টিপু গুলিবিদ্ধ হন। এলোপাথাড়ি গুলির আঘাতে প্রাইভেট কারের পাশে রিকশায় থাকা বদরুন্নেছা কলেজের শিক্ষার্থী সামিয়া জামাল প্রীতি গুলিবিদ্ধ হন। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

আলোচিত এই জোড়া খুনের দুই দিনের মাথায় শুটার মাসুমকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশের খিলগাঁও জোনাল টিম। হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় মাসুম। মাসুমের স্বীকারোক্তিতে বেরিয়ে আসে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় জড়িত অনেকের নাম।

হত্যার দায়িত্ব দেওয়া হয় মুসাকে
পরিকল্পনা অনুযায়ী দায়িত্ব দেওয়া হয় সুমন সিকদার ওরফে মুসাকে। যুবলীগ নেতা মিল্কি ও বাবু হত্যা নিয়ে টিপু-বিরোধীদের এই হত্যার পরিকল্পনায় যুক্ত করে মুসা। টিপু হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার পর মোল্লা শামীমকে দায়িত্ব দিয়ে গত ১২ মার্চ দুবাই চলে যান মুসা। হত্যাকাণ্ডের পর তদন্তে মুসার নাম আসলে দুবাই থেকে সে পালিয়ে ওমান চলে যায়। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মুসার পাসপোর্ট সংগ্রহ করে পুলিশ সদর দফতরের এনসিবি শাখার মাধ্যমে রয়েল পুলিশ অব ওমানের এনসিবি শাখাকে চিঠির মাধ্যমে মুসাকে গ্রেফতারে সহযোগিতা চায়।

৬ এপ্রিল পুলিশের এনসিবি শাখা মুসাকে গ্রেফতারের ইন্টারপোলের সহযোগিতা নেয়। ৮ এপ্রিল প্রতিবেশী দেশসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইন্টারপোলের মাধ্যমে পত্র পাঠায়। পরে জানা যায়, সুমন সিকদার মুসা গত ৮ মে দুবাই থেকে ওমানে প্রবেশ করে। তখন ইন্টারপোলের ওমান পুলিশ এনসিবির সহযোগিতায় তাকে ১২ মে গ্রেফতার করে। গত ৯ জুন তাকে ওমান থেকে দেশ ফিরিয়ে আনা হয়।

পুলিশ তখন বলেছিল, মুসাকে ফিরিয়ে আনতে পারলে মতিঝিলের আওয়ামী লীগ নেতা হত্যাকাণ্ডসহ আরও অনেক বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যাবে তার কাছ থেকে।

হত্যাকাণ্ডের অস্ত্র সরবরাহ
হত্যাকাণ্ডের জন্য অস্ত্র সরবরাহ এবং গুলি সরবরাহের দায়িত্ব পায় সাগর ইশতিয়াক জিতু রাকিব বাবু। মূল কিলিং মিশনে দায়িত্ব দেওয়া হয় শুটার মাসুম মোহাম্মদ আকাশকে। আর হত্যায় ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর জন্য মোটরসাইকেলের সহায়তা করে মোল্লা শামীম। হত্যাকাণ্ড ঘটানোর সময় সহায়তায় ছিল মারুফ, একরাম, সৈকত ও সেকান্দার।

‘হত্যা মামলা থেকে বাঁচতে’ টিপুকে হত্যা
২০১৬ সালে আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপুর আস্থাভাজন রিজভী হাসান ওরফে বোচা বাবুকে হত্যা করা হয়। আর সেই হত্যা মামলায় আসামি করা হয় মোহাম্মদ ওমর ফারুক (৫২), আবু সালেহ শিকদার ওরফে শুটার সালেহ (৩৮), নাছির উদ্দিন ওরফে কিলার নাছির (৩৮) এবং মোরশেদুল আলম ওরফে কাইল্লা পলাশকে (৫১)। সেই হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্যতম ভূমিকা পালন করে আরেক সন্ত্রাসী মুসা; যিনি তালিকাভুক্ত শীর্ষসন্ত্রাসী প্রকাশ-বিকাশের সহযোগী বলে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হলে মামলাটির গতি চলমান থাকায় ‘ফাঁসি হতে পারে’ এমন শঙ্কা থেকে তারা টিপুকে হত্যার পরিকল্পনা করে।

তখন র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘বোচা বাবু হত্যাকাণ্ডের পর মামলাটি চলমান রাখার জন্য জাহিদুল ইসলাম টিপু সবসময় খোঁজ-খবর রাখতো। তার আরেক বিশ্বস্ত কালাম এ মামলার সাক্ষী ছিল। গ্রেফতারকৃত ওমর ফারুক, কিলার নাসির, শুটার সালেহ ও কাইল্লা পলাশ মিলে বিভিন্ন সময় কালামকে সাক্ষী না দেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করে। কিন্তু কোনও কাজ না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে তারা সন্ত্রাসী মুসার সহায়তায় টিপুকে হত্যার পরিকল্পনা করে।’

টিপু হত্যায় রাজনৈতিক মোড়
আওয়ামী লীগ নেতা টিপুসহ ডাবল মার্ডারের ঘটনায় সমীকরণ সামনে এসে যায়। আন্ডারওয়ার্ল্ডে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে মনে করা হলেও তদন্তে নেয় রাজনৈতিক মোড়। গত আগস্ট মাসে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যে ছয় জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, তাদের একজন ছাড়া বাকিরা মতিঝিলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। অনেকেই আগে থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদে ছিল।

তখন স্থানীয় নেতা-কর্মীরা গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, মতিঝিলে যে দুই-একজনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ছিল, এই হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। এতে কারাবন্দি সাবেক দুই নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট ও খালেদের ‘পথ পরিষ্কার’ হয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে কথা হয় মামলার বাদী জাহিদুল ইসলাম টিপুর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম ডলির সঙ্গে। তিনি শনিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তে সন্তুষ্ট।’ দ্রুত যেন চার্জশিট দেওয়া হয়, সে কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‌‘বিভিন্ন মোবাইল নম্বর থেকে প্রতিনিয়ত ফোন দিয়ে চার্জশিট থেকে সাগর, সোহেল শাহরিয়ার, মুনসুর ও আশরাফের নাম বাদ দেওয়ার জন্য ভয়-ভীতি দেখানো হচ্ছে। আমার পরিবার শঙ্কা নিয়েই দিন পার করছি। আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই। যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তারা যেন কোনোভাবেই ছাড় না পায়।’