সুষমে উন্নয়নে বাজেট ও নাগরিক সুবিধা বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন

দেশের সুষম উন্নয়নে ঢাকা -চট্টগ্রামের মত বড় শহরের সঙ্গে অন্যান্য জেলা সমূহের বিদ্যমান উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দের ব্যবধান কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

মঙ্গলবার ৮ নভেম্বর বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবস উপলক্ষ্যে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) কর্তৃক আয়োজিত ‘উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণে বাংলাদেশের সুষম ও টেকসই নগরায়না প্রেক্ষিত ও করণীয়' শীর্ষক আইপিডি নগর সংলাপে এ আহ্বান জানান তারা। দেশের সুষম নগরায়ন ও উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণে বাজেট বরাদ্দে সাম্যের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও নাগরিক সুবিধাদির বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। 

তারা বলেন, ঢাকা কেন্দ্রিক উন্নয়নের কার্যকর নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সারা দেশে পরিকল্পিত ও সুষম নগরায়ন নিশ্চিত করতে পারলে উন্নয়নের সুফল সব অঞ্চল ও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিভিন্ন সেতু ও সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠা অর্থনৈতিক এলাকাসমূহের মাধ্যমে অঞ্চলভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। 

পাশাপাশি বিভাগীয় জেলা-উপজেলা ও পৌর নগর এলাকার কার্যকর মহাপরিকল্পনার প্রণয়নের মাধ্যমে মানসম্মত নাগরিক সুবিধাদির সংস্থান ও বাসযোগ্য নগর তৈরি করা প্রয়োজন। সরকারের বাজেট বরাদ্দে ঢাকা-চট্টগ্রামের মত বড় শহরগুলোর সঙ্গে অন্যান্য জেলাসমূহের বাজেটের বিদ্যমান ব্যবধান কমিয়ে উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করতে নীতিমালা ও বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপন্থা তৈরি করা দরকার, যার মাধ্যমে সারা দেশের টেকসই নগরায়ন ও সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।

নগর সংলাপে আইপিডির তত্ত্বাবধানে পরিকল্পনাবিদ মো. রিদওয়ানুর রহমান ও অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান কর্তৃক বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাজেট বরাদ্দের খাত ও জেলাভিত্তিক বিন্যাসের ওপর করা সমীক্ষা গবেষণা’র সারাংশ উপস্থাপন করা নয়।

নগর সংলাপের মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, দেশের সুষম নগরায়ন নিশ্চিত করতে ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন কমানোর সাম্প্রতিক বেশ কিছু উদ্যোগ চলমান আছে। কিন্তু এতেও দেখা যাচ্ছে বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বেশ অঞ্চলে এখনও তুলনামূলক বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে। এমনকি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে অর্থনৈতিক জোন তৈরির যে প্রয়াস চলমান আছে, সেখানেও এই এলাকাগুলোতেই বেশি কর্মসংস্থান হবার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এই প্রেক্ষিতে সামনের দিনগুলোতে ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামেও উন্নয়নে কেন্দ্রীভূত হয়ে বাই-পোলার ইকোনমি তৈরি হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের সুষম নগরায়নে পিছিয়ে পড়া রংপুর, বরিশাল, রাজশাহী অঞ্চলসমূহে বাজেট বরাদ্দ ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ আরও বৃদ্ধির  উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

মূল প্রবন্ধে সমীক্ষা প্রতিবেদনের সারাংশে বলা হয়, ২০২১-২২ অর্থ বছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাজেট বরাদ্দে আবাসন ও নাগরিক সুবিধাদি খাতে ঢাকা জেলা ৩৭ ভাগ, চট্টগ্রাম জেলা বরাদ্দ পেয়েছে ১৭ ভাগ। সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত ৬টি জেলা (ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, রাজশাহী, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ) মোট বরাদ্দের প্রায় ৭৪ ভাগ পেয়েছে, বিপরীতে সর্বনিম্ন বরাদ্দপ্রাপ্ত ২৫টি জেলা পেয়েছে মোট বরাদ্দের প্রায় ৬ ভাগ। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম বরাদ্দ পাওয়া কয়েকটি জেলা হচ্ছে, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, বরগুনা যাদের প্রত্যেকের প্রাপ্তি শতকরা ০.২০ ভাগের মত। এই খাতের জন্য বৈষম্য পরিমাপক পালমা রেশিও'র মান ১২.৬৩ যা উচ্চ মাত্রার বৈষম্য নির্দেশ করে। উল্লেখ্য পালমা রেশিও তে সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত ১০ ভাগের মোট প্রাপ্তির সাথে সর্বনিম্ন বরাদ্দপ্রাপ্ত ৪০ ভাগের মোট প্রাপ্তি'র তুলনা করা হয়।

২০২১-২২ সালের এডিপিতে  ঢাকার জেলার প্রাপ্তি শতকরা ২২.৭২, চট্টগ্রামের ১১.৭৫, গাজীপুরের ৫.২৩, কক্সবাজারের ৩.৫১ ভাগ। সর্বনিম্ন বরাদ্দপ্রাপ্ত জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম ঝালকাঠি, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, মুন্সিগঞ্জ, মেহেরপুর নড়াইল যাদের প্রত্যেকের প্রাপ্তি শতকরা ০.৫০ ভাগের মত। 

নগর সংলাপে পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, নগরায়নের প্রকৃত সুফল পেতে হলে সরকারের 'আমার গ্রাম আমার শহর' প্রকল্প, উপজেলা মাস্টার প্ল্যানসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়ন করতে উপজেলা পর্যায়ে দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে।'

পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম, বাংলাদেশের নগর এলাকায় টেকসই উন্নয়ন করতে ব্যক্তিস্বার্থের পরিবর্তে সামগ্রিক জনস্বার্থের বিষয় মাথায় রেখে নগর পরিকল্পনার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন তিনি। শহরের সুবিধা যখন গ্রামে যাবে এবং গ্রামের সুবিধা যখন শহরে পাওয়া যাবে, তখনই ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন হবে। 

পরিকল্পনাবিদ ড. চৌধুরী মোঃ জাবের সাদেক সারা দেশের সুষম উন্নয়নের জন্য বিকেন্দ্রীকরণ নীতিমালা তৈরি এবং প্রশাসনিক ও দক্ষ মানবসম্পদের বিকেন্দ্রীকরণ এর উপর জোর দেন।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রাশেদুল হাসান উদয় বলেন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও অর্থনীতিক অঞ্চল তৈরি করবার কারণে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে যেন পরিবেশ-প্রতিবেশের কোন বিপর্যয় না হয়। 

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ মইনুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপেনারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের পক্ষে সকলের জন্য মানসম্মত সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।