ছেলেকে খুন করে দাবি জিনে মেরেছে, আটকে গেলো বাবার জামিন

পুত্রবধূর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে শেষে ছেলেকেই খুন করেন বাবা আবু জাফর ওরফে স্বপন। ছেলে হাবিবুল্লাহকে খুন করে জিন-পরী উঠিয়ে নিয়ে গেছে বলে প্রচারণা চালানো হয়। ঘাটাইল থানাধীন দেওজানা বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। হত্যাকাণ্ডের মোটিভ পরিবর্তনের চেষ্টা সত্ত্বেও ধরা পড়ে আসামিরা।

ভিকটিম হাবিবুল্লাহর নিখোঁজের বিষয়ে জানা গেছে, টাঙ্গাইলের ঘাটাইল থানাধীন দেওজানা বাজার এলাকায় মো. আবু জাফর ওরফে স্বপন (৫০) তার বড় ছেলে হাবিবুল্লাহ (২৪) ও পুত্রবধূ মোছা. ছাফুরা খাতুনকে (২৩) নিয়ে একই বাড়িতে বসবাস করতেন। ঘটনার বছর হাবিবুল্লাহ পোড়াবাড়ী ফাজিল মাদ্রাসা থেকে ফাজিল চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেন এবং পাশাপাশি দেওজানা বাজারে কাপড়ের ব্যবসা করতে থাকেন।

২০১৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর রাতের খাবার শেষে ছাফুরা ও হাবিবুল্লাহ একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ে। তবে সকালে উঠে স্বামীকে দেখতে পাননি স্ত্রী। এরপর কয়েক দিন খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে হাবিবুল্লাহকে জিন-পরী উঠিয়ে নিয়ে গেছে বলে তার বাবা আত্মীয়-স্বজনদের কাছে বলতে থাকেন।

তবে ঘটনার চারদিন পর ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর দুপুর ১টায় হাবিবুল্লাহর মরদেহ বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে পাওয়া যায়। মরদেহের গলা ও ঘাড়ে কালো ছোপযুক্ত দাগ ও বাম চোখ উপড়ানো দেখতে পান স্থানীয়রা। ওই দিনই ঘাটাইল থানার এসআই মোহাম্মাদ আসাদুজ্জামান বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন।

মামলার তদন্তে নেমে পুলিশ হাবিবুল্লাহর বাবা ও স্ত্রীর অসংলগ্ন বক্তব্য শুনে প্রাথমিকভাবে তাদের সন্দেহ করেন। এরপর ২০২০ সালের ৫ জানুয়ারি ছাফুরাকে এবং ৭ জানুয়ারি স্বপনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে তারা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

ছাফুরা জবানবন্দিতে জানায়, বিয়ের ৫ মাসের মাথায় শ্বশুর তার দিকে কুনজর দিতে শুরু করে। লজ্জায় তাকে কিছু বলতে পারতো না। একদিন শ্বশুর জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক করে। এ কথা কাউকে বলতে বারণ করে এবং ভয় দেখায়। এর কয়েক দিন পর থেকে তারা শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পরে। একদিন হাবিবুল্লাহ দোকান থেকে বাড়ি ফিরে তাদের আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পায়। এ ঘটনায় হাবিবুল্লাহ স্তব্ধ হয় যায়। সে খাওয়া-দাওয়া ও দোকানে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। এর কিছু দিন পর শ্বশুর আমাকে নিয়ে পরিকল্পনা করে আমার স্বামীকে সরিয়ে দিতে হবে। আমার সঙ্গে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু কীভাবে হত্যা করা হবে তা জানানো হয়নি। আমি ভয়ে শ্বশুরকে কিছু বলতে পারিনি। আমার স্বামীও তার বাবাকে অনেক ভয় পেতো। ঘটনার রাতে স্বামীকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। ঘরের খিল নষ্ট ছিল। রাত ২টায় শ্বশুর আমাদের ঘরে ঢোকে। তখন আমার স্বামী জেগে ছিল। বাবাকে দেখে সে হতভম্ব হয়ে যায়। শ্বশুর আমার স্বামীকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যায়। তখন বাইরে অন্য লোক রাখা ছিল। এরপর স্বামীকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আমাকে শ্বশুর বলেনি। তবে এসব কাউকে বললে প্রাণনাশের হুমকি দিতো।

২০২০ সালের ৯ অক্টোবর চার্জশিট দাখিল করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। চার্জশিটে ওই হত্যাকাণ্ডে বাবা ও স্ত্রীর সম্পৃক্ততা এবং তথ্য-প্রমাণ লোপাটের অপচেষ্টার বিষয়টি উঠে আসে। বর্তমানে মামলাটি টাঙ্গাইলের দায়রা আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। 

এদিকে মামলার প্রধান আসামি মো. আবু জাফর ওরফে স্বপন গত ৩০ মে টাঙ্গাইলের বিচারিক আদালতে জামিন আবেদন করেন। তবে সেই আবেদন নামঞ্জুর হলে তিনি হাইকোর্টে জামিন চেয়ে রিভিশন মিসকেস দায়ের করেন। এরপর গত ১৪ নভেম্বর মামলার আসামি স্বপন হাইকোর্ট থেকে জামিন পায়। তবে সেই জামিনের সংবাদে বসে থাকেনি রাষ্ট্রপক্ষ।

জামিন আটকাতে চেম্বার জজ আদালতে আবেদন জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। সেই আবেদনের শুনানির পর বুধবার (১৬ নভেম্বর) বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন চেম্বার জজ আদালত হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি স্বপনকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিতের আদেশ দেন। এর ফলে তার কারামুক্তি আটকে গেলো বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মুজিবুর রহমান সম্রাট।