‘পরিবার থেকে রাষ্ট্রের তিনটি অংশেই সাহসী-সৎ নেতৃত্ব প্রয়োজন’

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নতুন নিয়োগ পাওয়া বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী বলেছেন, পরিবার থেকে রাষ্ট্রের তিনটি অংশ– আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগে সাহসী, বিচক্ষণ, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নির্লোভ, ত্যাগী, আদর্শিক, সৎ নেতৃত্ব আজ ভীষণ প্রয়োজন।

রবিবার (১১ ডিসেম্বর) আপিল বিভাগের এজলাস কক্ষে নতুন তিন বিচারপতির সংবর্ধনার জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।

প্রচলিত রীতি অনুসারে এদিন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে নতুন নিযুক্ত তিন বিচারপতিকে সংবর্ধনা দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি এবং অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়। এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি সিনিয়র অ্যাডভোকেট মো. মোমতাজ উদ্দিন ফকির নতুন তিন বিচারপতির গৌরবময় কর্মজীবন পড়ে শোনান।

প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীসহ আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতি ও আইনজীবীরা এ সময় এজলাসে উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে সংবর্ধনার জবাবে আপিল বিভাগে নতুন নিয়োগ পাওয়া বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী বলেন, ‘দ্বিধাহীনভাবে সত্য কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই। আমার জন্ম একটি রাজনৈতিক পরিবারে। বাবা, মা, ভাই ও নিকট আত্মীয়– সবাই একই আদর্শ নিয়ে নিজ নিজ জায়গা থেকে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। জাতির পিতার রাজনৈতিক আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ছাত্র রাজনীতি থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় রাজনীতিতে বিভিন্ন স্তরে নির্বাহী পদে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছি। নিজের জন্য নয়, দেশের মানুষের জন্যে নিঃস্বার্থভাবে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছি। এ কারণেই বেছে নিয়েছিলাম আইন পেশা।’

যে কোনও কাজে নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও সততা একই ধারায় অটুট রাখার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষ হিসাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমাজ বিনির্মাণে জীবনকে উৎসর্গ করা। কতটুকু সফল হয়েছি সে মূল্যায়ন নিজে করিনি কখনও। মূল স্রোতধারার আদর্শিক জায়গা থেকে সরে যাইনি কখনও। কথা ও কাজে দুরকম হয়েছে, চরম প্রতিপক্ষও এমন অভিযোগ তোলেনি আজ পর্যন্ত। তবে লক্ষ্যচ্যূত হয়েছি, এ কথা অস্বীকার করি না। রাজপথ ছেড়ে আসীন হয়েছি উচ্চ আদালতের বিচারকের আসনে। বিচারক হিসাবে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা রাখতে পেরেছি কিনা সে বিচারের ভারতো আপনাদের এবং বিচারপ্রার্থী জনগণের কাছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সত্য কথা স্পষ্ট করে বলা আমার সহজাত প্রবৃত্তি, যা জীবন চলার পথে প্রায়ই প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠে। আত্মবিশ্বাসের শক্তিতে সব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে উত্তীর্ণ হওয়া আমার জীবনের এক অনন্য বৈশিষ্ট। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মুক্তিযুদ্ধ ও মহান স্বাধীনতাসহ এই রাষ্ট্রের যা কিছু অর্জন তার পেছনে দৃশ্যমান ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সুদৃঢ় ও আদর্শিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব। রাষ্ট্রের সব স্তরে নেতৃত্বের জায়গাটি আদর্শিক ও নৈতিকভাবে সঠিক ও সুদৃঢ় হলে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে।’

বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী বলেন, ‘অনুরাগ ও বিরাগের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং গণতান্ত্রিক ধারায় সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দেশের আর্থ-সামাজিক ও মানব সম্পদের উন্নয়ন, রাষ্ট্রের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠমোগত উন্নয়ন, জাতিগতভাবে আমাদের জন্মের ইতিহাস, জাতির পিতা ও বাংলাদেশে এ সব জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্থায়ীত্বকরণ অপরিহার্য। পরিবার থেকে রাষ্ট্রের তিনটি অংশেই সাহসী, বিচক্ষণ, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নির্লোভ, ত্যাগী, আদর্শিক, সৎ নেতৃত্ব আজ ভীষণ প্রয়োজন। একটি জনকল্যাণকর সুখী, সমৃদ্ধশালী গণতান্ত্রিক উন্নত সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক রূপকে স্থায়ী করতে স্বাধীন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কোনও বিকল্প নেই।’

আপিল বিভাগের নতুন এই বিচারপতি বলেন, ‘১১ মাস আগে আপনার (প্রধান বিচারপতি) সংবর্ধনা সভায় আপনি জাতিকে দিয়েছেন– সততা, ন্যায়পরায়ণতা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। এই বার্তার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণভাবে একমত পোষণ করে বলতে চাই, আমার অতীত যাই হোক না কেন প্রথমে আমি একজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মানুষ এবং এ দেশের সুনাগরিক, সর্বোপরি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের একজন বিচারক হিসেবে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন। এ সংবর্ধনা সভায় আপনার মাধ্যমে সমগ্র জাতিকে জানাতে চাই– নিরপেক্ষ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য আপনি যে শপথ বাক্য পড়িয়েছেন তা বিচারিক জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্মরণ রাখবো। আমি নিরপেক্ষতা, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতির পিতার স্বপ্নপূরণে বিচারপ্রার্থী মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করলাম।’

এর আগে গত ৮ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির নির্দেশক্রমে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের তিন বিচারপতিকে আপিল বিভাগে নিয়োগ দিয়ে আইন মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে। নিয়োগপ্রাপ্তরা অন্য দুই বিচারপতি হলেন– বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম।