মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ডিসেম্বরের চিত্রটা একদমই ব্যতিক্রম। দেশের সূর্য সন্তানদের শ্রদ্ধার জন্য পুরো এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। রঙ করা হয় ইট-কনক্রিটের স্থাপনাগুলো। সাজ সাজ রব পড়ে যায় গোটা কবরস্থানে। কিন্তু ডিসেম্বর ছাড়া অন্য মাসগুলোর চিত্র উদ্বেগের। মাদকসেবী ও বিক্রেতাদের আনাগোনা থাকে অহরহ। এলাকার বখাটে ও কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত থাকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থান। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকার বাসিন্দারা। আর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা প্রকাশ করেছেন অসহায়ত্ব।
প্রতিবছর ১৪ ডিসেম্বর এলেই একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করে জাতি। এদিন সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে সব রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করে সেখানে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানান।
শুক্রবার (২ ডিসেম্বর) দুপুরের পর থেকে রাত পর্যন্ত এবং সোমবার (১২ ডিসেম্বর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মিরপুর মাজার রোডের বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে (বধ্যভূমি) সরেজমিনে ঘুরে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ হয় এ প্রতিবেদকের।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও উত্তর সিটির ১০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. শাহজাহান দেওয়ান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মিরপুর দারুস সালাম এলাকার কাউন্সিলর থাকাকালে মাদকসেবন ও বিক্রির অভিযোগে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে রাতে অভিযান চালিয়ে হাতেনাতে বখাটে ও কিশোর গ্যাংয়ের বেশ কয়েকজন সদস্যকে আটক করেছিলাম। কিন্তু এখন শারীরিক অসুস্থতার কারণে আগের মতো খবর রাখতে পারি না।
তিনি বলেন, যুদ্ধের পর এই বধ্যভূমি থেকে দুটি লাশ উদ্ধার করেছিলাম। এখন জায়গাটি অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা কবরস্থানের মধ্যে মাদক সেবন ও কেনাবেচা করে। বধ্যভূমির দেয়াল ভেঙ্গে ভেতরে যাওয়া-আসার রাস্তা করেছে অপরাধীরা। প্রতিবছর মোটা অংকের বাজেটে কবরস্থান এলাকার সংস্কার কাজ করে সিটি করপোরেশন। এবারও ৫৪ লাখ টাকার বাজেট দেওয়া হয়েছে। এ টাকায় রঙ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ভাঙ্গা প্রাচীর মেরামতসহ অন্যান্য কাজ করা হয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে (বধ্যভূমি) প্রবেশের জন্য রয়েছে তিনটি গেট। এরমধ্যে একটি মাজার রোড থেকে স্বাধীনতা চত্বর হয়ে সোজা বধ্যভূমিতে চলে গেছে। আরেকটি দিয়ে মিরপুর মাজার গেট (২নং), মিরপুর ১নং পাইকারি কাঁচা বাজার ও দিয়াবাড়ী বের হওয়া যায়। অন্যটি তার উল্টোপাশে দারুস সালাম গেট (৩নং)।
এ বধ্যভূমি বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের ১৬ তারিখ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এছাড়া অন্য সময় প্রতিদিন দুই বেলা সাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। এর নিরাপত্তায় আট সদস্যের আনসার দল থাকেন। তারা তিন পালায় কর্তব্যপালন করেন।
আকবর আলী নামে স্থানীয় একব্যক্তি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রতিদিনই মিরপুর মাজার রোডের এই বধ্যভূমিতে দূর-দূরান্ত থেকে সাধারণ মানুষ আসে শ্রদ্ধা জানাতে। দিনের বেলায় উন্মুক্ত থাকে। কিন্তু সন্ধ্যার পর এলাকার বখাটে ছেলেরা গেটের ওপর দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে মাদকের আসর বসায়। এটা বন্ধ করতে বিভিন্ন সময় বলা হলেও কাজ হয়নি।
প্রধান ফটকে দায়িত্বরত একজন আনসার সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রতিদিন দুই বেলা গেট খোলা হয়। সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত একবার। আরেকবার বিকাল ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত। এসময়ে তিনটি গেটই খোলা রাখা হয়। এসময় দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা ঘুরে দেখে এলাকাটি। তবে সন্ধ্যার পর স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় ভিন্ন চিত্র দেখা যায় এখানে। একই রকম তথ্য দেয় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আরও এক আনসার সদস্য। তিনি বলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় কিছু উঠতি বয়সী তরুণসহ বিভিন্ন মানুষ সন্ধ্যার পর নিয়মিত এখানে মাদকের আসর বাসায়। আমরা নিষেধ করলেও শুনে না। বেশি কিছু বলতে গেলে উল্টো বিপদে পড়তে হয়।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে ৩ ডিসেম্বর থেকে দারুস সালাম থানা পুলিশের একটি টিম এখানে অবস্থান করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্থানটি পরিদর্শন করেছেন। আজ ১৩ ডিসেম্বর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাকর্মী, রঙ মিস্ত্রি ও রাজমিস্ত্রিরা কাজ শেষ করে চলে যাবেন। ১৪ ডিসেম্বর আসবেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানকে ঘিরে গত নভেম্বরের ১০ তারিখ থেকে সংস্কার কাজ শুরু করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা বলেন, গত ১০ নভেম্বর থেকে বধ্যভূমি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য কাজ শুরু করি। ডিসেম্বর পর্যন্ত গাছের ডাল-পালা সাইজ করা ও ফ্লোর টাইলসের কাজ করা হয়েছে। ২ ডিসেম্বর থেকে ধুয়ে সাফ করার কাজ চলছে। পাশাপাশি রঙ ও প্রাচীরের গ্রিলে কাজ চলছে। প্রতিটি গাছের কাণ্ডে নিচের অংশ রঙ করা হবে। গ্রিলে রঙ করা হবে। এখন কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। আমরা ১৩ ডিসেম্বরে কাজ শেষ করে কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিবো।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রধান গেট দিয়ে প্রবেশ করে ডান দিকে বধ্যভূমির সীমানা প্রাচীর আর বাম দিকে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। প্রধান গেট পার হয়ে সোজা চলে গেলে বধ্যভূমিতে গণহত্যার শিকার শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ।
স্মৃতিস্তম্ভের ডান দিকের পকেট গেট দিয়ে যাওয়া যায় কুবা জামে মসজিদ ও মাজারে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আলাদা কবরস্থান। একটু সামনে যেতেই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৪ এর তত্ত্বাবধায়কের অফিস।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ১৪ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী প্রথমে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাবেন। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে স্মৃতি সৌধসহ আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সেখানে চলতি মাসের শুরু থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়ন করা হয়েছে। এছাড়া আগে থেকেই সর্বসাধারণের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৪ ডিসেম্বরের অনুষ্ঠান ঘিরে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদাপোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ পর্যাপ্ত সংখ্যক গোয়েন্দা সদস্য নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত থাকবেন। এছাড়া আশপাশের ছাদ থেকে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থাও থাকবে। তবে মাদকসেবন ও কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।