ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে ব্যাটারি ও সিএনজি চালিত অটোরিকশার ‘বয়স্ক ও দুর্বল চালকরা’ এখন ছিনতাই চক্রের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছিনতাইকারীরা অটোরিকশা ছিনতাইয়ের আগে চালককে মারধর, এমনকি গলা কেটে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটাচ্ছে। সম্প্রতি এমন কয়েকটি ঘটনায় ছিনতাইকারী চক্রের কয়েকজনকে গ্রেফতারও করেছে র্যাব ও পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গ্রেফতারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানিয়েছেন। তারা আরও বলছেন, এসব ঘটনার সঙ্গে কিছু গ্যারেজ মালিকও জড়িত; যাদের তথ্য এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ছিনতাইকারী চক্রটি প্রথমে বয়স্ক ও দুর্বল অটোরিকশা চালককে টার্গেট করে ভাড়ায় তাদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়। পরে তারা চালকের কাছ থেকে নগদ টাকা-পয়সা ও মোবাইল হাতিয়ে নেয়। এরপর চালককে মারধর করে, অনেকসময় নির্মমভাবে ছুরিকাঘাত ও গলা কেটে হত্যার পর লাশ ফেলে অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যায়।
গত ১৯ জানুয়ারি রাত আনুমানিক ২টার দিকে সিএনজি চালিত অটোরিকশার চালক আলী হোসেন (৬০) যাত্রী পরিবহনের জন্য মুন্সীগঞ্জ জেলার মোক্তারপুর ব্রিজ এলাকায় অবস্থান করছিলেন। এ সময় চার ছিনতাইকারী যাত্রীবেশে কদমতলী থানাধীন মাতুয়াইল সাদ্দাম মার্কেটের সামনে যাওয়ার কথা বলে ভাড়া নির্ধারণ করে। মাতুয়াইল যাওয়ার পথে রাত আনুমানিক ২টায় রাজধানীর ডেমরা থানার সাইনবোর্ড মদিনা চত্বর এলাকায় পৌঁছালে ছিনতাইকারীরা সিএনজি অটোরিকশার চালক আলী হোসেনকে এলোপাতারি মারধর শুরু করে। পরে সিএনজি চালকের ডাক-চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসার আগেই ছিনতাইকারীরা সিএনজি চালক আলী হোসেনকে হত্যা করে অটোরিকশাটি নিয়ে পালিয়ে যায়।
পরদিন ২০ জানুয়ারি দিবাগত রাতে পৃথক দুইটি অভিযান চালিয়ে রাজধানী শনিরআখড়া এবং রূপগঞ্জ থানার তারাবো এলাকা থেকে এ চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করে র্যাব-১০ এর একটি দল।
গত ডিসেম্বর (২০২২) মাসের ৮ ও ২৫ তারিখ একই কায়দায় রাজধানীর দক্ষিণখান এলাকার বাসিন্দা অটোরিকশা চালক মো. মোস্তফা (৩৫) ও জিহাদ (১৫) নামের দুই চালকের রিকশায় ভাড়া করেন মো. টিপু, হাসান ও শুভ। পরবর্তী সময়ে মোস্তফাকে আশিয়ান সিটি ও জিহাদকে পূর্বাচল এলাকায় নিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যা শেষে একইভাবে দুজনের মরদেহ নির্জন এলাকায় ফেলে দেওয়া হয়। শুক্রবার (১৩ জানুয়ারি) রাজধানী বিভিন্ন এলাকা ও মৌলভীবাজারে অভিযান চালিয়ে এ চক্রের ছয় জনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
ঢাকা ও ঢাকার বাইরে পুরো দেশজুড়েই এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। এদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকলেও কোনভাবেই এ চক্রটিকে থামানো যাচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে র্যাব-১০ এর অধিনায়ক (সিও) অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সারা দেশেই এসব ঘটনার পেছনে বড় একটি চক্র কাজ করছে। এ চক্রগুলো বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে আছে। ছিনতাই করা এসব অটোরিকশা, সিএনজি যেখানে কেনাবেচা করা হচ্ছে, এর সন্ধানও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে এসেছে। কিছু গ্যারেজ মালিক-কর্মচারীরার সম্পৃক্ততাও আমরা পেয়েছি।’
গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ‘এসব যানবাহনের সংখ্যা এখন বেড়েছে এবং মানুষের একটি বড় অংশ এসব যানবাহনে চলাচল করে আসছে। তারা ছিনতাইয়ের জন্য এই সেক্টরটিকে নিরাপদ হিসেবে বেছে নিয়েছে। তাদের টার্গেট থাকে যাত্রীবেশে উঠবে, পরে নির্জন স্থানে নিয়ে গাড়িটি ছিনতাই করে নিয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে চালক গাড়ি দিতে রাজি না হলে কিংবা কোনও জবরদস্তি করলে চালককে হত্যা করতেও তারা দ্বিধাবোধ করে না। অপরাধের কোনও আলামত বা প্রমাণ তারা অনেক ক্ষেত্রে নষ্ট করারও চেষ্টা করে এই চক্রটি।’
র্যাবের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘শুধু রাজধানীর আশপাশে না, রাজধানীর বাইরেও এ চক্রটি দেশের বিভিন্ন জায়গায় এসব ভয়ংকর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সড়কে-মহাসড়কে যে আমরা প্রায়ই অজ্ঞাত মৃতদেহগুলো পাচ্ছি এসবের ঘটনা অনেকগুলো এইরকম। বিশেষ করে শহরতলীতে এসব ঘটনা বেশি ঘটছে।’
চালকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে র্যাবের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘চালকরা যেন নিজেদের নিরাপত্তার কথা খেয়াল রাখে। একেবারে গভীর রাতে যেন এসব জায়গায় না বের হোন। নির্জর জায়গায় অপরিচিত যাত্রী নিয়ে যেন না যায়। এছাড়া রাতের বেলায় যদি কোনও যাত্রী নিয়ে কোথাও যায়, তাহলে চালককে তার লুকিং গ্লাসে নজর রাখতে হবে। যেন পেছনে যাত্রীর গতিবিধি খেয়াল রাখা যায়।’
র্যাবের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ছিনতাইকারীদের সঙ্গে কিছু লোক কাজ করছে। রিকশাটি চুরি ছিনতাই কিংবা ডাকাতি করার পর এসব বিক্রয় করার জন্য তো জায়গা লাগে যাদের কাছে অটোরিকশা সিএনজিগুলো বিক্রি করছে তাদের সন্ধান আমরা পেয়েছি। তদন্তের স্বার্থে আমরা এসব এখন বলছি না। যেখানে তাদের সম্পর্ক ভালো সেখানে রেখে সেখান থেকে আস্তে আস্তে বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করে ছিনতাই করা অটোরিকশাগুলো। দুই মাস আগে আমরা একটি গ্যারেজ থেকে সাতটি অটোরিকশা উদ্ধার করেছি। যারা জড়িত তাদেরও আমরা যেকোনও সময় গ্রেফতার করতে পারি। যেমন, আব্দুল্লাহপুর থেকে ছিনতাই হয়েছে। আমরা সেটা ময়মনসিংহ থেকে উদ্ধার করেছি। চক্রটি সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
ডিএমপির গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ বলেন, একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে চালকদের হত্যা করে অটোরিকশা ছিনতাই করে আসছিল। গত ডিসেম্বরে পরপর একই কায়দায় দক্ষিণখান এলাকার দুই অটোরিকশা চালককে হত্যার পরে গাড়ি ছিনতাই করে চক্রটি। ভুক্তভোগী পরিবারের দায়ের করা মামলার ছায়াতদন্তে নেমে ভয়ঙ্কর এই চক্রের সন্ধান পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তরা বিভাগ। গত ডিসেম্বর মাসে পরপর দুই চালককে হত্যা করে অটোরিকশা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় আমরা ছয় জনকে গ্রেফতার করেছি।
এ চক্রের সঙ্গে যারাই জড়িত প্রত্যেকে আইনের আওতায় আনা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যেখানেই এসব ঘটনার খবর পাওয়া যাবে কিংবা অপরাধীরা যেখানেই অবস্থান করুক না কেন; আমরা জানতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’