ঢাকা আর্ট সামিটে বৃষ্টি ও জীবনের গল্প

বাংলাদেশে শিল্পকর্ম প্রদর্শনী বিষয়ক ও চিত্রকলার অন্যতম বড় আয়োজন ঢাকা আর্ট সামিটের (ডিএএস) ষষ্ঠ দিনের আয়োজনে বৃষ্টি ও জীবনের গল্প তুলে ধরেছেন শিল্পীরা। এদিন দক্ষিণ আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার চিত্রকলায় বৃষ্টিপাতের চক্র নন্দনিকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়; যা দেখে মুগ্ধ আগত দর্শনার্থীরা।

শুক্রবার (৩ ফেব্রুয়ারি) শুরু হওয়া এবারের ষষ্ঠ সংস্করণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় প্রথমবারের মতো বাংলা প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বন্যা’। এতে অংশ নিচ্ছেন দেশি-বিদেশি ১৬০-এরও বেশি শিল্পী। তাদের শিল্পকর্মে জলবায়ু পরিবর্তন, লৈঙ্গিক সম্পর্ক, বিভিন্ন প্রজন্মের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ফুটে উঠছে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত এই আসর।

বুধবার (৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় 'বন্যা' থিম সামনে রেখে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনের প্রথম তলায় ছিল বিশেষ আয়োজন। এতে ‌শিল্পী সুমাইয়া ভ্যালি 'যারা বৃষ্টি আনে তারা জীবন আনে' ফুটিয়ে তোলেন শৈল্পিক উপস্থাপনায়। দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশীয়ার প্রচলিত চিত্রকলার আদলে প্যাভিলিনগুলো দৃষ্টি কাড়ে দর্শনার্থীর। যেখানে প্রাকৃতিক ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বৃষ্টিপাতের একটি চিত্র উঠে এসেছে।

আর্ট-সামিট-02

প্রদর্শনীতে আছে প্রাকৃতিক চক্র এবং জলবায়ু পরিস্থিতির প্রবাহ। আছে বৃষ্টিপাত, বজ্রপাতের বিষয়ও। বাদ যায়নি পানি, শব্দের প্রভাব। সব মিলিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় বৃষ্টি এবং বন্যা একাকার হয়ে ধরা দিয়েছে শৈল্পিক রূপে। এমন দৃশ্য দর্শনার্থীদের ভিন্নভাবে ভাবতে এবং চিন্তা করার খোরাক জোগাবে বলে মনে করেন অপরূপা নাজনিন নামে একজন। তিনি যাত্রাবাড়ি থেকে এসেছেন এই প্রদর্শনী দেখতে।

অপরূপার মতো আরও অনেক দর্শনার্থীকে প্রদর্শনীর নানা চিত্রকর্মী দেখতে ভিড় করতে দেখা গেছে। অনেককে শিল্পকর্মের সঙ্গে ছবি তুলতেও দেখা যায়। তবে আগম দর্শনার্থীদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল তরুণ। আয়োজকরা বলছেন, নতুন প্রজন্ম যে শিল্প-সাহিত্যের দিকে ঝুঁকছে সেই বার্তাই দিচ্ছে এই আয়োজন। তা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন এবং বন্যা নিয়েও তাদের আগ্রহের জানান দিচ্ছে প্রদর্শনীটি।

বিশ্বের নানা প্রান্তের প্রতিষ্ঠিত ও প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীদের বৈচিত্র্যময় শিল্পগুলো দর্শনার্থীদের দেখার সুযোগ করে দিতে ২০১২ সাল থেকে ঢাকা আর্ট সামিট হচ্ছে। এর আয়োজন করে আসছে সামদানী আর্ট ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে প্রতি দুই বছরে আর্ট সামিটের আয়োজন করে থাকে।

এর আগে ঢাকা আর্ট সামিটের সর্বশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২০ সালে। তবে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে এবার তিন বছর পর এই প্রদর্শনীর পর্দা উঠলো। এবারের প্রতিপাদ্য ‘বন্যা’কে ঘিরে প্রদর্শনীটি নানাভাবে সাজানো হয়েছে। আয়োজনে উঠে এসেছে যে— নদীমাতৃক বাংলাদেশে 'বন্যা শব্দরূপটি কেবলমাত্র একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; বরং এর চেয়ে বেশি কিছু এবং এ দেশে কন্যাশিশুদের নাম হিসেবেও 'বন্যা' বেশ পরিচিত।

এবারে ঢাকা আর্ট সামিটে 'বন্যা'কে উপস্থাপন করা হয়েছে ভিন্নরূপে, যে প্রশ্ন তোলে গতানুগতিক বাইনারি চিন্তাধারার বিরুদ্ধে আবশ্যকতা ও অনাবশ্যকতা, পুনর্নির্মাণ ও দুর্যোগ, শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষ বিষয়ক প্রধাণত ধারণা নিয়ে। শিল্পীরা তাদের ভাবনায় এসব সম্পর্কের বিশদ তাৎপর্যের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।

এছাড়া সামদানী আর্ট অ্যাওয়ার্ড প্রদর্শনীতে ১২ জন বাংলাদেশি শিল্পীর অংশগ্রহণের কথা জানানো হয়েছে। যাদের শিল্পকর্মে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ইস্যু প্রাধান্য পাচ্ছে। পাশাপাশি দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত শিল্প সমালোচক ও শিল্প সংগ্রাহকদের অংশগ্রহণে থাকছে ওয়ার্কশপ, পারফরম্যান্স সেমিনারসহ নানা প্রদর্শনী।

আর্ট-সামিট-03

প্রদর্শনীর জন্য ইতোমধ্যেই নান্দনিকভাবে সাজানো হয়েছে জাতীয় চিত্রশালা ভবনের পুরো আঙিনা। থাকছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও আনুসাঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা। তবে আগত দর্শনার্থীরা (৮ ইঞ্চি * ৬ ইঞ্চি)-এর চেয়ে বড় হ্যান্ডব্যাগ বহন করতে পারছেন না। আয়োজনে বিঘ্ন ঘটায় এমন কোনো ডিভাইসও নিষিদ্ধ থাকছে। পানি বা অন্যকোনো বাবার সঙ্গে নিয়ে ভেন্যুস্থলে প্রবেশ করায় বারণ রয়েছে।

আর্ট সামিটের ষষ্ঠ আসরে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন- অ্যান্টনি প্রোমলি, আসফিকা রহমান, বিনোদবিহারী মুখার্জি, ভাষা চক্রবর্তী, চিত্রপ্রসাদ, ড্যানিয়েল বৈদ্য, দামাসাস ছাড়া, ফয়সাল জামান, গাজালেই আভারজামানি, হারিক চুহেন, হাবিবা নওরোজ, জামাল আহমেদ, জয়দের রোজা, জনি রুসিকা, কবির আহমেদ মাসুম চিশতি, কামরুজ্জামান সাধন, লালা রুখ, ল্যাম্পডিয়াং সায়েন, মেরিনা পেরেজ সিমাও নাবিল আহমেদ, নাজমুন নাহার কেয়া, পল ডাবুরেট, রূপালী গুপ্তা ও প্রসাদ শেঠি, পূর্ণিমা আখতার, রফিকুন্নবী, সাইফুদ্দিন আহমেদ, সাহেজ রাহাল, তানিয়া গয়াল, ভেরোনিকা হাপচোঙা, ইয়াসমিন জাহান নূপুর, রিজভী হাসান, গণেশ পাইন প্রমুখ।