কী অপরাধ তেলেগুদের? এই মাটিতে জন্ম নেওয়াই কি তাদের ভুল? তারা এখন যেখানে বসবাস করছেন, সেখানে আগে পা দিলে রক্ত ঝরতো। এই মাটিকে শক্ত করেছেন তারই। এখন প্রশাসন তাদের চলে যেতে বলছে। কিন্তু কোথায় যাবে তারা?
বৃহস্পতিবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এভাবেই বলছিলেন বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
সম্প্রতি ১৩০টি তেলেগু পরিবারকে ধলপুরের সুইপার কলোনি ছাড়ার নোটিশ দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। পুনর্বাসন ছাড়া এসব পরিবারকে উচ্ছেদের প্রতিবাদে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ, নিজেরা করি, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), ব্লাস্ট, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা), আইন ও সালিশ কেন্দ্র, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) ও ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠী।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এএলআরডি’র প্রোগ্রাম ম্যানেজার অ্যাডভোকেট রফিক আহমেদ সিরাজী বলেন, ‘প্রায় ২০০ বছর আগে রেলওয়েতে কাজের জন্য নানান সুযোগ-সুবিধার কথা বলে দক্ষিণ ভারতীয় তেলেগু সম্প্রদায়কে এই দেশে আনেন ব্রিটিশরা। সেই থেকে তারা সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় বসবাস করছেন। শহর পরিচ্ছন্নতার কাজ করে আসছেন। স্বাধীনতার পর ১৯৮২ সালে একটি এনজিওর মাধ্যমে রাজধানীর টিকাটুলি থেকে সায়েদাবাদ হুজুরবাড়ি এলাকায় আনা হয় তেলেগুদের। পরে ১৯৯০ সালে তাদের সরকারিভাবে ধলপুরে আনা হয়।’
তিনি বলেন, ‘এই তেলেগু কলোনিতে বর্তমানে একটি শিবমন্দির, দুটি চার্চ ও আউটফল তেলেগু কমিউনিটি স্কুল রয়েছে। যেখানে ওই সম্প্রদায়ের শিশুরা তেলেগু ও বাংলা ভাষায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করছে। এছাড়া বর্তমানে সিটি করপোরেশনে কাজ করা এবং না করা প্রায় ২৫০ পরিবার ওই কলোনিতে বসবাস করছে। এরমধ্যে সিটি করপোরেশনে কাজ করা ১২০ পরিবার শিমুল ও মুকুল নামে দুটি ভবনে বাস করে। বাকি ১৩০ পরিবার সিটি করপোরেশনে কাজ না করলেও ব্যক্তিগতভাবে সুইপারের কাজ করে নগরীর বিভিন্ন এলাকায়।
অ্যাডভোকেট রফিক আহমেদ সিরাজী আরও বলেন, ‘সম্প্রতি ডিএসসিসি তেলেগু কলোনি উচ্ছেদ ও সুইপারদের পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নেয়। পুনর্বাসনের আগে কলোনি না ভাঙারও প্রতিশ্রুতি দেন ডিএসসিসির মেয়র ফজলে নূর তাপস। কিন্তু গত ৯ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ এখানকার বাসিন্দাদের দুই দিনের মধ্যে এলাকা খালি করার নির্দেশ দেয় ডিএসসিসি, স্থানীয় কাউন্সিলর ও সংশ্লিষ্ট থানা।’
চাইলেই মানুষকে উচ্ছেদ করা যায় না জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, ‘কাউকে এক মাসের নোটিশেও উচ্ছেদ করা যায় না। চারবার উঠানো হয়েছে, এবার আর না। আপনাদের পুনর্বাসন করে কাগজ দিতে হবে, গির্জা-মন্দির দিতে হবে। দেওয়ার ছয় মাস পরে আপনারা ভাববেন সেখানে থাকতে পারেন কী পারেন না– তারপর সেখানে যাবেন। এই যে রোহিঙ্গাদের থাকার জায়গা দেওয়া হয়েছে, তারা আগে একদল গিয়ে দেখেছে থাকা যায় কিনা।’
সংবাদ সম্মেলন থেকে ভুক্তভোগী পরিবার ও নাগরিক সংগঠনগুলো সাতটি দাবি জানায়। সেগুলো হলো– পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ বন্ধ করা; স্থায়ী পুনর্বাসন করা হলে তার বৈধ কাগজপত্র দেওয়া; তাদের উপাসনালয়ের সুরক্ষা, চাকরির নিশ্চয়তা, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরি না থাকলে উচ্ছেদ না করা; উচ্ছেদের হুমকি ও হয়রানি বন্ধ করা এবং তাদের জন্য বাসযোগ্য আবাসনের ব্যবস্থা করা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও ছিলেন– হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সভাপতি কাজল দেবনাথ, বেলার হেড অব প্রোগ্রাম ফিরোজুল ইসলাম, ব্লাস্টের প্রতিনিধি তাজুল ইসলাম, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি অ্যাডভোকেট নাহিদ শামস প্রমুখ।