চার বছরেও ক্ষতিপূরণ পায়নি চুড়িহাট্টার ক্ষতিগ্রস্তরা

রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির আজ ৪ বছর। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের পাশে হাজী ওয়াহেদ ম্যানশন থেকে ছড়িয়ে পড়া আগুনে মৃত্যু হয় ৭১ জনের, আহত হন অন্তত শতাধিক মানুষ।

ঘটনার চার বছর পর স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে  চুড়িহাট্টা। ওয়াহেদ ম্যানশনও মেরামত করে বাণিজ্যিকভাবে চালু করা হয়েছে। তবে  স্বজনহারা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি ক্ষত। অগ্নিকাণ্ডে সহায়-সম্বলহারা পরিবারগুলোকে প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি আজও।-5cc8eb04a79ebfc8e09ba9eb2bcecbf7

সোমবার (২০ ফেব্রুয়ারি) চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে জনজীবন। ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনার বিন্দুমাত্র রেশ বোঝার উপায় নেই। ওয়াহিদ ম্যানশনও মেরামত করা হয়েছে। নিচতলায় রয়েছে টেলিকম, খাবার, মুদি ও প্লাস্টিক দানার দোকান, দ্বিতীয় তলায় ব্যাংক, চতুর্থ তলায় বসবাসের জন্য ও তৃতীয় তলাটি এখনও ফাঁকা রয়েছে। মেরামত করা হয়েছে আশেপাশের ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোও।

এরআগে, ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ এ ঘটনায় ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গণশুনানিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ডিএসসিসি’র তৎকালীন মেয়র সাইদ খোকন বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দেন। ২০২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে থেকে ২১টি পরিবারের সদস্যকে দৈনিক মজুরিভিত্তিক মাস্টাররোল পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরি, ৪টি পরিবারের মাঝে আর্থিক ক্ষতিপূরণ বাবদ দুই লাখ টাকার চেক প্রদান ও দুইটি পরিবারকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন মার্কেটে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার জন্য কাগজ প্রদান করেন।

চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য ও চুড়িহাট্টা একতা সংঘের সাধারণ সম্পাদক আশিক উদ্দিন সৈনিক জানান, '২১টি পরিবারের সদস্যকে চাকরি দেওয়া হয়েছে। আর ৪টি পরিবারকে ২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। ২ জনকে দোকান বরাদ্দের কাগজ দেওয়া হলেও, দোকান বরাদ্দ নিতে গেলে কর্তৃপক্ষ জানায় যে, প্রতিটি দোকানের জন্য ১২ লাখ টাকা জমা দিতে হবে। মেয়রের প্রতিশ্রুত কাউকেই চাকরি দেওয়া হয়নি। এমনকি ৪টি পরিবারের বাইরে কাউকে কোনোরূপ সহায়তা বা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, 'যার যে ক্ষতি হয়েছে তা অপূরণীয়। ওইসময় গণশুনানিতে যারা উপস্থিত ছিলেন তারাই তালিকাভুক্ত হয়েছেন এবং কিছু সহায়তা পেয়েছেন—এরবাইরে কেউ কিছু পায়নি। অনেকেই ওই সময় গ্রামে বা অন্যান্য জায়গায় স্থানান্তরিত হয়ে গেছে। তারা কোনও সহযোগিতা পায়নি৷ আমরা দাবি জানাই— সরকার থেকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক। এছাড়াও ওইসময় আমরা নিউজ দেখেছি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৩০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে—এর এক টাকাও কেউ বাস্তবে পাইনি।'

তিনি আরও বলেন, 'আজ পর্যন্ত আসামিরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই রয়েছে। কারণ, আমরা দেখছি আসামিরা দেদারসে ঘুরে-ফিরে বেড়াচ্ছে। জোর দাবি জানাচ্ছি আসামিদের গ্রেফতার করে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়ার জন্য।'

ঘটনায় স্বামী হারানো ফাতেমা বলেন, 'আমার স্বামী সেদিন ওষুধ নিতে এসে মারা যান। আমার  দুইটি মেয়ে আছে। বর্তমানে আমি সিটি করপোরেশনে চাকরি করছি। এ ঘটনায় দায়ীরা এখনও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।'

প্লাস্টিক দানার দোকানের মালিক আব্দুল কাদের, ঘটনার দিন অল্পের জন্য বেঁচে যান তিনি। একই ঘটনায় মৃত্যু হয় তার এক ভাতিজার। ঘটনার সময় দোকান ছেড়ে তিনি বের হতেই, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঘটে বিস্ফোরণ। অল্পের জন্য রক্ষা পান তিনি। পরে আবার গতবছর একই জায়গায় দোকান বসিয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, 'কোনও ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা পাইনি এখনও। আমার মোট ৩৫ লাখ টাকা নষ্ট হয় এখানে। গত ৩ বছর বসেই ছিলাম। পরে গ্রামের জমি-জায়গা বেঁচে আবার দোকান বসিয়েছি। কেউ খোঁজও নেয়নি।'

এ বিষয়ে কথা বলতে এলাকার কাউন্সিলর কামাল উদ্দিন কাবুলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, 'আমি ওইসময় কাউন্সিলর ছিলাম না। ক্ষতিগ্রস্তরা আমাকে বিষয়টা জানায়নি৷ জানালে অবশ্যই কথা বলতাম। বর্তমান মেয়র খুবই আন্তরিক মানুষ, আমি বিষয়টি নিয়ে কথা বলবো।'5a204573012996c86e9a5aac7e88101c-5e4d3d0c30c82

এ বিষয়ে কথা বলতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমানকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার নাগাদ পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ে বিকট শব্দে এক বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে চুড়িহাট্টা মোড়ে। মৃত্যুপুরীতে রূপান্তরিত হয় পুরো এলাকা। আগুনের সূত্রপাত হওয়া হাজী ওয়াহিদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় থেকে বুলেটের মতো ছুটে বের হতে থাকে আমদানিকৃত বিদেশি সব সুগন্ধির (বডি স্প্রে) ধাতব বোতল। মোড়ের তিনটি সড়কের অনেকদূর পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকা রিকশা, ভ্যান পিকআপভ্যান, প্রাইভেটকার সবই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে লাগা ওই আগুন জ্বলতে থাকে পরদিন সকাল পর্যন্ত। এঘটনায় মারা যান পথচারীসহ ৭১ জন, আহত হন অন্তত শতাধিক।   

ঘটনার তদন্ত শুরু করে ফায়ার সার্ভিস, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিস্ফোরক পরিদফতর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনসহ মোট ৫টি সংস্থার তদন্ত কমিটি। তদন্ত শেষে সব প্রতিবেদনেই আগুনের সূত্রপাত হাজী ওয়াহিদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় স্প্রে (কেমিক্যাল) গোডাউন থেকে হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়।

সর্বশেষ গতবছর ১৪ ফেব্রুয়ারি, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার চার্জশিট দেয় পুলিশ।  চার্জশিটে ভবন মালিক দুই ভাই মোহাম্মদ হাসান সুলতান ও হোসেন সুলতানসহ ৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। দুই ভাই ছাড়াও চার্জশিটে রাসায়নিকের গুদাম পার্ল ইন্টারন্যাশনালের মালিক ইমতিয়াজ আহমেদ, পরিচালক মোজাম্মেল ইকবাল, ম্যানেজার মোজাফফর উদ্দিন, মোহাম্মদ জাওয়াদ আতিক, মো. নাবিল ও মোহাম্মদ কাশিফের নাম রাখা হয়।