শিল্পী ও শিল্পকে আলাদাভাবে দেখতে হবে: চন্দ্রিল

শিল্পী এবং শিল্পকে আলাদাভাবে দেখা উচিত বলে মনে করেন ভারতের কলকাতার কবি ও চলচ্চিত্র পরিচালক চন্দ্রিল ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘শিল্পী এবং শিল্পকে আলাদাভাবে দেখতে হবে। অনেক মানুষ মনে করেন— একজন মানুষ যদি অপরাধ করেন, তার শিল্প গ্রহণ করবো না। আমরাতো জানি না, কালিদাশ কেমন লোক ছিলেন, হয়তো বাজে লোক ছিলেন। আবার যদি পিকাসোর জীবন পড়েন— তিনি মোটেই ভালো লোক ছিলেন না। কিন্তু তার চিত্রকর্মের তো তুলনা হয় না। পিকাসোর ছবি না দেখলে মানুষই বঞ্চিত হবে। তাই শিল্পটাকেই দেখা উচিত। যদি তার শাস্তি প্রাপ্ত হয় তা দিতে হবে, তার শিল্পকর্ম অসামান্য হলে সেই শিল্পকর্ম দেখতে হবে।’

শনিবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর বাংলামোটরে  বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ‘সিলন চা সময়ের আড্ডা’য় এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন রাজীব হাসান।

চন্দ্রিল ভট্টাচার্যঢাকায় তার অভিজ্ঞতা নিয়ে চন্দ্রিল বলেন, ‘এর আগে একবার আসছি, তখন ঢাকা দেখা হয়নি। এবার ঢাকা দেখা হচ্ছে। এটা দেখে স্তম্ভিত হয়েছি যে, এত রিকশা চলতে পারে একটা শহরে! রিকশা একজনকে ধাক্কা দিলে কেউ ঘুরে দেখছে না, রিকশাকে কেউ ধাক্কা দিলেও রিকশা ঘুরে দেখছে না।’

চন্দ্রবিন্দুতে তার লেখা গান নিয়ে সঞ্চালকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যখন চন্দ্রবিন্দুতে গান লেখা শুরু করলাম, তখন লিখতে গিয়ে দেখলাম— গানগুলো মজাকেন্দ্রিক হয়ে গেলো। অ্যালবাম প্রকাশের পর সবাই— গানে সমাজচেতনা থাকবে, মানুষের দুঃখের কথা থাকবে। বাঙালির যে শিল্প ধারণা, সবকিছুর দায় নিয়ে শিল্প করতে হবে। মজা করে শিল্প করা মানে ক্যাসেটের জায়গা নষ্ট করা। তোরা জীবনমুখী গান করবি কিনা, ক্যান্টিনমুখী গান করলি। সব জায়গায় বলা হলো— চন্দ্রবিন্দু মজা করে, তবে একটু নাম করেছে। তবে আমরা কখনও ভাবিনি— মজা বা ফাজলামো করছি।’

তার গানে কৌতুকবোধ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, কোনও বাঙালির মধ্যে যদি কৌতুকবোধ থাকে, তাহলে কোথাও না কোথাও সে সুকুমারের কাছে ঋণী। সুকুমার না পড়লেও কৌতুকবোধ থাকবে, সুকুমার পড়লে সে বুঝতে পারে— কৌতুকবোধটা কোন স্তরে যেতে পারে। তবে এটা ঠিক ননসেন্স ছড়ার আমাদের গানে প্রভাব আছে।’

চন্দ্রিল ভট্টাচার্যপ্রেম নিয়ে চন্দ্রিল বলেন, ‘একটা বয়সের পর গান লিখে শেষ না হলেও অন্য দিক দিয়ে শেষ হয়। একটা লোক রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে, টিভির পর্দায় যাকে দেখলো তার প্রেমে পড়লো, এভাবে একজীবনে ৭ হাজার জনের প্রেমে পড়লো। কিন্ত যার প্রেমে পড়লো সে প্রেমে পড়লো না। মজার বিষয়— এতগুলো লোকের মধ্যে আমি একটা লোককে ভালো বাসলাম, সেও আমাকে ভালো বাসলো। এটা হতে পারে না, তাও হচ্ছে। আসলে সিরিজ প্রেমের শেষ হয় না।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনুপস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়া জিনিসটা আমার অপছন্দ। আমার ভিড় জিনিসটা অপছন্দ,  যেখানে সবাই এতকিছু বলছে, সে জায়গাটা আমার জন্য অস্বস্তির। একটা জিনিস ভালো হতে পারে। তবে সে জিনিস আমার না। যেমন আমার চিংড়ি মাছে এলার্জি আছে, তাতেতো আমি চিংড়িকে দোষ দিতে পারি না।’

চন্দ্রিল ভট্টাচার্যচন্দ্রিলের প্রবন্ধ ‘অন্য মানে বন্য’ তে তিনি দেশপ্রেম যেভাবে দেখিয়েছেন সেটা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দেশপ্রেমের সংঙ্গা হলো— আমার দেশ সবচেয়ে ভালো। কারণ, আমি সেখানে জন্মেছি। এটা সবচেয়ে সরল সংঙ্গা। এখন সবদেশ একসঙ্গেতো ভালো হতে পারে না।  একটা দেশ ভালো হবে, আরেকটা কম ভালো হবে। আমরা বলাটাকে এমন জায়গায় নিয়ে যায়— যদি আমার দেশ অন্য দেশের সঙ্গে অন্যায় করি, সেটাও ভালো।'

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেব, ‘বাঙালিরা সাংস্কৃতিকভাবে খুবই সংকীর্ণ জাতি। কোনোরকম উদরতা এদের নেই। যেকোনও রকম নতুন কিছু আসলে প্রথমেই বাধা দেয়। আগে দেখবো, তারপর বিচার করবো, তারপর মন্তব্য করবো। ফলে যে প্রজন্মই আসে— বলে এটা হচ্ছে না। আমার যৌবন-কৈশরে যে জিনিস আমাকে সবচেয়ে আনন্দ দেয়, সেটাই শিল্পের সর্বোৎকৃষ্ট, বাঙালিদের মধ্যে এটা বেশি আছে, নতুন কিছুকে বাঙালি ভয় পায়।’

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন