তিন বছর পর ভাষার মাসের প্রথম দিনে শুরু হওয়া বইমেলার উদ্বোধনী দিনটা কিছুটা এলোমেলো হলেও দ্বিতীয় দিন থেকে পূর্ণ প্রস্তুতিতে জমে ওঠে। এবারের মেলার আয়োজন নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট প্রকাশক, বিক্রয়কর্মী, লেখক, পাঠক ও দর্শনার্থীরা। তারা বলছেন, এমন গোছানো মেলা আগে কখনও হয়নি।
গ্রন্থরাজ্যের প্রকাশক রাজিব দত্ত বললেন, ‘অন্য যেকোনও সময়ের চাইতে এবারের বইমেলা ছিল গোছানো ও সুবিন্যস্ত। গত দুই মেলার চেয়ে এবার লোক সমাগমও ভালো ছিলো। বিক্রিও হয়েছে ভালো।
লেখক উজ্জ্বল জিসান বলেন, ‘বলতে দ্বিধা নেই এবারের বইমেলা আগের যেকোনও মেলার চাইতে ভালো ছিল। সব কিছু সুন্দর ও গোছানো ছিল। এর আগে কখনো এমন দেখা যায়নি।‘
অনন্যা প্রকাশের বিক্রয়কর্মী নাহিদ হাসন বলেন, ‘আমি গত চার বছর ধরে বইমেলায় কাজ করছি। কিন্তু এমন সুন্দর মেলা এবারই প্রথম। আশা করছি সামনে আরও ভালো হবে।’
আজিমপুর থেকে মেলায় আসা শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘এবারের বইমেলা সত্যিই সুন্দর ছিল সব মিলিয়ে। ধুলোবালি, ময়লা আবর্জনা এবার দেখতে হয়নি। তাছাড়াও এবার মেলার অন্যতম সৌন্দর্য ছিল দর্শনার্থীদের বসার ব্যবস্থা। সামনে মেলা আরও সুন্দর হবে এটাই প্রত্যাশা।’
নতুন বই
২৬ ফেব্রুয়ারি মেলায় নতুন বই এসেছে ১৫৫টি। এরমধ্যে গল্পের বই ১০টি, উপন্যাস ২৭, প্রবন্ধ ১৫, কবিতা ৬৮, গবেষণা ১, ছড়া ২, শিশুসাহিত্য ১, জীবনী ৩, মুক্তিযু্দ্ধ ৩, নাটক ১, বিজ্ঞান ১, ভ্রমণ ১, ইতিহাস ১, চিকিৎসা ১, বঙ্গবন্ধু ২, অনুবাদ ২ এবং অন্যান্য ১৬টি।
আলোচনা অনুষ্ঠান
বিকাল ৪টায় বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় স্থানীয় সাহিত্যের বৈভব ও জেলা সাহিত্যমেলা শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাইমন জাকারিয়া। আলোচনায় অংশ নেন মুন্সি আবু সাইফ, সাহেদ মন্তাজ এবং মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক। সভাপতিত্ব করেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন।
প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সাইমন জাকারিয়া বলেন, ‘বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির বহুমাত্রিক ধারা-উপধারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কিন্তু ঢাকার বাইরে চর্চিত সাহিত্যের সৃষ্টিশীল বৈভবকে পর্যবেক্ষণ ও সংকলন করার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ অতীতে কখনও গৃহীত হয়নি। স্থানীয় সাহিত্য স্রষ্টাদের সৃষ্টিকর্মকে মূল্যায়ন ছাড়া সামগ্রিকভাবে দেশের সাহিত্যের ইতিহাস রচনা করা সম্ভব নয়। এসব দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে নিয়েই বাংলা একাডেমি জেলা সাহিত্যমেলার রূপরেখা প্রণয়ন করে এবং তা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রতিটি অঞ্চলের জেলা প্রশাসনকে প্রেরণ করে।’
আলোচকবৃন্দ বলেন, সাহিত্য মানুষের কথা বলে। স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে আমাদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে হবে। এ জন্য জেলা সাহিত্যমেলা বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। জেলা সাহিত্যমেলায় অংশ নিয়ে স্থানীয় লেখক, সাহিত্যিকগণ নিজেদের মধ্যে আন্তঃসংযোগ স্থাপন করতে পারেন। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে সাহিত্য উপকরণাদি সংরক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। জেলা সাহিত্যমেলার নিয়মিত আয়োজন দেশের শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চাকে বেগবান করবে।
সভাপতির বক্তব্যে সেলিনা হোসেন বলেন, ‘আঞ্চলিকতাকে অবলম্বন করেই বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে। তাই স্থানীয় সাহিত্যকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এ লক্ষ্যে আয়োজিত জেলা সাহিত্যমেলা আমাদের সাহিত্যের দিগন্ত প্রসারিত করবে।’
লেখক বলছি
লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন সোহেল আমিন বাবু, হরষিত বালা, আসাদুজ্জামান, আসাদ, মাহফুজা অনন্যা এবং মোহাম্মদ আলমগীর আলম।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন মালেক মাহমুদ, সালাউদ্দিন বাদল, শাহ মোহাম্মদ সানাউল হক এবং আলমগীর আলম। আবৃত্তি পরিবেশন করেন ম. ম. জুয়েল, সাফিয়া খন্দকার রেখা, ফয়জুল আলম পাপ্পু, শামস মিঠু এবং ফারজানা ইসলাম। এছাড়া ছিল দিলরুবা খানমের পরিচালনায় আবৃত্তি সংগঠন 'শব্দনোঙর', ফরিদা পারভীনের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘অচিন পাখি', অনিকেত আচার্যের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন 'কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর ড. শামীম মতিন চৌধুরীর পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন 'বিউটিফুল মাইন্ড'-এর পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করেন কাদেরী কিবরিয়া, ফেরদৌস আরা, জেরিন তাবাসসুম হক, নয়ন বাউল, দেলোয়ার হোসেন বয়াতি এবং আমজাদ দেওয়ান।
২৭তম দিনের অনুষ্ঠানসূচি
২৭ ফেব্রুয়ারি (সোমবার) অমর একুশে বইমেলার ২৭তম দিন। মেলা চলবে বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকাল ৪টায় মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্ব বাঙালির সাহিত্য শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন আলম খোরশেদ। আলোচনায় অংশ নেবেন এ এফ এম হায়াতুল্লাহ, আ-আল মামুন, জসিম মল্লিক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম।