মানিকগঞ্জের সেই পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্তের নির্দেশ স্থগিত, তদন্ত চলবে

মানিকগঞ্জ সদরের কৈতরা গ্রামের মো. রুবেল (২২) হত্যার ঘটনায় মরদেহ উদ্ধার থেকে অভিযোগপত্র, ৪২ ঘণ্টার অবিশ্বাস্য তদন্তের ঘটনায় পুলিশের উপপরিদর্শক মো. মাসুদুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ ৮ সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেছেন চেম্বার আদালত। তবে রুবেল হত্যা মামলা পিবিআই প্রধানকে পুনঃতদন্তের নির্দেশ বহাল রেখেছেন আদালত।

হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের শুনানি নিয়ে বৃহস্পতিবার (৬ এপ্রিল) আপিল বিভাগের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন চেম্বার জজ আদালত এ আদেশ দেন।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুজিত চ্যাটার্জি বাপ্পী। রিটের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।

এর আগে গত ৩ এপ্রিল মানিকগঞ্জ সদরের মো. রুবেল হত্যা মামলার ‘লাশ উদ্ধার থেকে অভিযোগপত্র দাখিলের মাধ্যমে ৪২ ঘণ্টায় অবিশ্বাস্যভাবে তদন্তের ঘটনাটি  পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধানকে তদন্তের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে পুলিশ সুপারের নিচে নয়— এমন কর্মকর্তা দিয়ে ৬০ দিনের মধ্যে এ ঘটনা এবং মামলাটির পুনঃতদন্ত করতে বলা হয়। আর এই সময়ে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা মানিকগঞ্জ সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করতে জেলা পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। মামলার কেস ডকেটসহ ওই পুলিশ কর্মকর্তা আদালতে হাজির হওয়ার পর বিচারপতি মো. বদরুজ্জামান ও বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসাইন দোলনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

আদালতে আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুজিত চ্যাটার্জি বাপ্পী ও অপূর্ব কুমার ভট্টাচার্য।

এর আগে ‘লাশ উদ্ধার থেকে অভিযোগপত্র, ৪২ ঘণ্টার অবিশ্বাস্য তদন্ত’ শিরোনামে ২ মার্চ প্রথম আলোতে প্রতিবেদন ছাপা হয়। প্রতিবেদনটি যুক্ত করে ওই মামলার নথি তলবের নির্দেশনা চেয়ে আসামি সোহেল ওরফে নুরুন্নবী ও বাদী চম্পা আক্তার ওরফে অঞ্জনা ৫ মার্চ ওই আবেদন করেন। সোহেল ও চম্পা সম্পর্কে ভাই–বোন। আর নিহত রুবেল সোহেলের ভগ্নিপতি।

আবেদনের শুনানি নিয়ে ১৫ মার্চ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মানিকগঞ্জ সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাকসুদুর রহমানকে কেস ডকেটসহ গত ৩ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টায় আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

সে অনুসারে তিনি তদন্ত কর্মকর্তা হাইকোর্টে হাজির হন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পর্যালোচনা করে আদালত আদেশ দেন।

আদেশের পর শিশির মনির জানান, আদালতের সামনে মিথ্যা তথ্য ও ত্রুটিযুক্ত তদন্ত করার জন্য মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছেন তাকে সাসপেন্ড করার জন্য, যতদিন পর্যন্ত পরবর্তী আদেশ না দেওয়া হয়। পুলিশ সুপারের নিচে নয়, এমন একজন কর্মকর্তা দিয়ে ৬০ দিনের মামলাটি পুনতদন্ত করতে পিবিআই হেডকোয়ার্টার্সকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুনঃতদন্ত করে উচ্চ আদালতে রিপোর্ট দাখিল করতে হবে। পরবর্তী আদেশের জন্য আগামী ৫ জুন তারিখ রাখা হয়েছে। 

প্রসঙ্গত, গত ১৪ মার্চ মানিকগঞ্জ সদরের কৈতরা গ্রামের মো. রুবেল (২২) হত্যার ঘটনায় মরদেহ উদ্ধার থেকে অভিযোগপত্র ৪২ ঘণ্টার অবিশ্বাস্য তদন্ত কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে রুবেল হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মানিকগঞ্জ সদর থানার পুলিশের উপ-পরিদর্শক মো. মাসুদ রানাকে কেস ডকেটসহ আদালতে হাজির হতে বলা হয়।

এক রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে বিচারপতি মো. বদরুজ্জামান ও বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসেন দোলনের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

গত ১ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে ‘লাশ উদ্ধার থেকে অভিযোগপত্র, ৪২ ঘণ্টার অবিশ্বাস্য তদন্ত’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদন সংযুক্ত করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়।

ওই প্রতিবেদনের একাংশে বলা হয়, মরদেহ রাত দেড়টায় উদ্ধারের পর সুরতহাল করেছে পুলিশ। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠানো হয়েছে হাসপাতালে। এরপর মামলা, আসামি গ্রেফতার, ঘটনাস্থল পরিদর্শন, মানচিত্র তৈরি, সাক্ষ্য গ্রহণসহ একে একে অন্তত ৯টি ধাপ পেরিয়ে হত্যা মামলার তদন্ত শেষ মাত্র ২২ ঘণ্টায়। পরবর্তী ২০ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে আদালতে হাজির, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায়সহ তদন্তের সব প্রক্রিয়া শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। অর্থাৎ, মরদেহ উদ্ধার থেকে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিতে পুলিশের সময় লেগেছে মাত্র ৪২ ঘণ্টা।

একটি খুনের মামলার তদন্তে এমন ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায়। দুই দিনের কম সময়ে খুনের মামলার তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দেওয়ার ঘটনায় অনেকে প্রশংসা করলেও প্রশ্ন তুলেছেন আইন ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তারা বলছেন, মামলাটির তদন্ত শেষ হয়েছে রকেটের চেয়েও দ্রুতগতিতে। এটা ব্যতিক্রমী ও আশ্চর্যজনক ঘটনা। পুলিশের এমন তদন্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যেরাও।

২০২২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে মানিকগঞ্জ সদরের কৈতরা গ্রামের একটি হ্যাচারিতে খুন হন মো. রুবেল (২২)। পরদিন নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে সোহেল নামের একজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে আসামিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনি এখন কারাগারে রয়েছেন।