প্রধানমন্ত্রীর সই জালিয়াতি

বিচারের জন্যই প্রস্তুত হয়নি মামলা, অভিযুক্তরা জামিনে

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সই জালিয়াতির ঘটনায় ২০২০ সালের ৫ মে তেজগাঁও থানায় একটি মামলা হয়। পরবর্তীতে পুলিশের তদন্ত শেষে জানা যায় মামলাটি দুদকের এখতিয়ারভুক্ত। পরে দুদকের মামলায় তদন্ত শেষে ২০২২ সালের ১৮ মে আদালতে আট জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়। প্রায় এক বছর পার হয়ে গেলেও মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হয়নি। এরমধ্যেই এ মামলার প্রধান আসামিসহ ৬ জন রয়েছেন জামিনে।

এ মামলার অভিযুক্তরা হলেন-নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি মো. শাহজাহান, ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সহ-সভাপতি তরিকুল ইসলাম মুমিন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো. নাজিম উদ্দিন, ডেসপাস রাইডার মো. রুবেল, এয়ার কমোডর (অবসরপ্রাপ্ত) এম আব্দুস সামাদ আজাদ, ছাত্রলীগ নেতা মো. ফরহাদ হোসেন ওরফে মোরশেদ আলম ওরফে মিকি এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সাবেক অফিস সহায়ক ফাতেমা খাতুন ও তার ছেলে রবিউল আওয়াল। এদের মধ্যে রবিউল কারাগারে আটক রয়েছে। আজাদ পলাতক। এছাড়া বাকি ৬ আসামি জামিনে।

বর্তমানে মামলাটি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। সর্বশেষ গত ১৬ এপ্রিল এ মামলার ধার্য তারিখ ছিল। ওইদিন পলাতক আসামি আজাদের সম্পত্তি ক্রোকের কোনও প্রতিবেদন দাখিল হয়নি। এ জন্য আদালত আগামী ১৪ মে দিন ধার্য করেন। এছাড়া তিন বছর ধরে কারাগারে আটক থাকা আসামি ফাতেমা, ফরহাদ ও রুবেলের জামিন মঞ্জুর করেন আদালত।

আসামি ফাতেমার আইনজীবী মশিহুর রহমান বলেন, ‘এ মামলায় প্রকৃত আসামিকে আড়াল করে ফাতেমাকে ভিকটিমাইজড করা হয়েছে। এ মামলায় সর্বোচ্চ সাজা পাঁচ বছর অথচ তিন বছর কারাভোগ করেছেন তিনি। ফাতেমা সম্পূর্ণ নির্দোষ। বিচার শেষে খালাস পাবেন।’

২০২০ সালের ৫ মে প্রধানমন্ত্রীর প্রদত্ত সই (‘টিক চিহ্ন’) জাল বা টেম্পারিং করা এবং তা সঠিক বলে ব্যবহার করার অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল আলম বাদী হয়ে রাজধানীর তেজগাঁও থানায় মামলাটি দায়ের করেন।

তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ১১ জুলাই আদালতে এ মামলার চার্জশিট দেয় পুলিশ। তবে অভিযোগ দুদকের এখতিয়ারভুক্ত হওয়ায় পরবর্তীতে কমিশনের উপপরিচালক ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারী বাদী হয়ে আট জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। অতি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নথি জালিয়াতি করার অপরাধে ২০২২ সালের ১৮ মে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০/ ৪৬৭/ ৪৬৮/ ৪৭১/ ১০৯/ ১১৪/ ১৬১/ ১৬৫ ক ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারায় চার্জশিট দাখিল করে দুদক। ওই বছরের ২১ জুলাই আদালত মামলাটির চার্জশিট আমলে নেন। ওইদিন পলাতক আসামি আজাদ ও রবিউলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পরবর্তীতে এ মামলায় রবিউল গ্রেফতার হন। তবে আজাদ পলাতক থাকায় তার সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেন আদালত।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০২০ সালে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগের জন্য ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম এনামুল হক, বুয়েটের প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুর রউফ এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের সাবেক কোষাধ্যক্ষ অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর এম আবদুস সালাম আজাদের নাম প্রস্তাব করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি সার সংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেই সংক্ষেপের নথি প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করার পর তিনি অধ্যাপক ড. এম এনামুল হকের নামের পাশে টিক চিহ্ন দেন। পরে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য নথিটি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর প্রস্তুতির আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অফিস সহায়ক ফাতেমা খাতুনের কাছে যায়। সে সময় এম আবদুস সালাম আজাদ অনুমোদন পাননি বলে ছাত্রলীগ নেতা তরিকুলকে জানান ফাতেমা।

২০২০ সালের ১ মার্চ নথিটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কৌশলে বের করে আসামিরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার (ড. এমদাদুল হকের নামের পাশে) ‘টিক চিহ্ন’ কলম দিয়ে টেম্পারিং করে সেখানে ক্রস চিহ্ন দেন। আর প্রফেসর মো. আবদুর রউফের নামের পাশে ক্রস চিহ্ন এবং এয়ার কমোডর (অব.) এম আবদুস সামাদ আজাদের নামের পাশে ‘টিক চিহ্ন’ দেওয়া হয়।

দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মোশাররফ হোসেন কাজল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ মামলার পলাতক এক আসামির সম্পত্তি ক্রোকের বিষয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য রয়েছে। প্রতিবেদন আসার পর তাকে আদালতে হাজিরের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে। এরপরেও আদালতে হাজির না হলে তার অনুপস্থিতিতে বিচার কাজ শুরু হবে। দ্রুতই বিচার কাজ শেষ করা হবে।’