বই অমূল্য সম্পদ। এরপরও দিন দিন কমছে বইয়ের পাঠক সংখ্যা। প্রযুক্তির খাতিরে মানুষের হাতের মুঠোয় আজ চলে এসেছে গোটা পৃথিবী। মোবাইল ফোনে বন্দি হয়ে কাটছে মানুষের দিনরাত্রি। আঙুলের এক স্পর্শেই চলে আসছে পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তের যে কোনও তথ্য। প্রযুক্তির এই অগ্রগতিই মানুষকে বই বিমুখ করে তুলেছে বলে মনে করেন অনেকে। তবে সবকিছুর পরও বইয়ের আবেদন কমেনি। বইপ্রেমীরা ঠিকই খুঁজে নেন পছন্দের বই। একারণেই পেশা হিসেবে বইয়ের ব্যবসা এখনও টিকে রয়েছে।
যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দোকানের পাশাপাশি অনলাইনেও এখন বিক্রি হচ্ছে বই। আর এই অনলাইন বাজার ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে উঠছে আমাদের দেশে। এতে করে ছোট ছোট বইয়ের দোকানগুলো হারাচ্ছে তাদের স্বাভাবিক ব্যবসা। এমন পরিস্থিতিতে হয়তো অনেকেই গুটিয়ে নিয়েছেন নিজেদের। কিন্তু সামান্য পরিমাণ লাভ হবে জেনেও এখনও যারা বইয়ের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের একজন মো. হান্নান খান মুকুল। ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ‘ক্যামলট বুক স্টল’ নামে একটি বইয়ের দোকান রয়েছে তার। বইয়ের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা মুকুল কথা বলেন বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে।
তিনি বলেন, ‘আমি একদিন দোকানে না আসলে অস্থির হয়ে যাই। আমার মনে হয় যে বইয়ের গন্ধ না নিলে আমার বাঁচার উপায় নাই। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। আমি এমনভাবেই মিশে গিয়েছি বইয়ের সঙ্গে।’
‘ক্যামলট বুক স্টল’ ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনে (কমলাপুর) অবস্থিত দুটি বইয়ের দোকানের একটি। মুকুল জানান, এই দোকান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যুদ্ধের আগে। এই দোকানের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এক সময়ের ছাত্রনেতা এম. এ. সালেহ আহমেদ।
১৯৮০ সাল থেকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে বইয়ের ব্যবসা করছেন জানিয়ে মুকুল বলেন, ‘আমার ব্যবসার ৪৩ বছর চলছে। আগের মতো ব্যবসা আর নাই এখন। কোনও রকম শ্বাস-প্রশ্বাস চলার মতো চলছে। আগের তুলনায় ১০ পার্সেন্ট ব্যবসাও নাই এখন। আমরা বসে থাকি আর আশা করি কখন একটা কাস্টমার আসবে। দেখা যায় কোনোদিন একটা দুইটা বই বিক্রি হচ্ছে। আবার কোনদিন বিক্রি নাই। এমন অবস্থার মধ্যে আছি আরকি। আর এভাবে টিকতে পারবো বলে মনে হয় না।’
করোনার পরে থেকে অবস্থা খারাপ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কোনোদিন একটা, দুইটা বা পাঁচটা বই বিক্রি হয়েছে। আবার কোনোদিন একটাও বিক্রি হয় নাই। এমনও দিন গিয়েছে সারাদিনে আমি পাঁচ টাকা দামের দুইটা কলম বিক্রি করে বাসায় গিয়েছি। উপায় নাই, তবুও আছি। প্রতিদিন সকাল থেকে আশায় আশায় থাকি হয়তো কোনও এক কাস্টমার আসবে। কিন্তু কাস্টমার তো আর আসে না। আর মানুষ তো আগের মতো এখন বই পড়ে না। কোনও রকমে টিকে আছি বলতে পারেন। এখন আমি দোকানে বইয়ের পাশাপাশি বিকাশ, রকেট (মোবাইল লেনদেন) চালু করেছি। এটা করেও কিছুটা টাকা পয়সা আসে। আর এখন আমার ছেলে ভালো একটা চাকরি করে। তাই কষ্ট বেশ খানিকটা কমেছে।’
বইয়ের ব্যবসায় আয় কম, তবু্ও কেন এই ব্যবসায় আছেন– এমন প্রশ্নের জবাবে মুকুল বলেন, ‘নিজেকে সুস্থ রাখার জন্য নিজে বাঁচার জন্য এখনও এই ব্যবসায় আছি।’ অন্য ব্যবসা কেন করছেন না– এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার ৬৩ বছরের জীবনে আমি প্রায় ৫০ বছর বইয়ের লাইনে আছি। ১৯৭২ সাল থেকে আমি বইয়ের ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সেবা প্রকাশনী থেকে আমার ব্যবসা শুরু। এই বয়সে এসে আমি আর অন্য কিছু করতে পারবো বলে আমার মনে হয় না। আমার রুচিতে আর কোনও ব্যবসা আসে না। বইয়ের ব্যবসার সঙ্গে আমি মিশে গিয়েছি। অন্য কোনও চিন্তা আমার মাথায় আসে না।’
তিনি বলেন, ‘আমার বাবাও বইয়ের ব্যবসা করতেন। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আমাদের বইয়ের দোকান ছিল। বাবা মূলত একজন চাকরিজীবী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের আগে কে বি এস নামের একটি ল্যাবরেটরিতে চাকরি করতেন। মুক্তিযুদ্ধের পরে উনার চাকরি চলে যাওয়ায় তখন বইয়ের ব্যবসা শুরু করেন। ‘৭২ সালে যখন আমরা ঢাকা আসি তখন থেকেই আমি খেলার ছলে কিংবা স্কুল শেষ করে পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে বাবার সঙ্গে দোকানে বসে থাকতাম। আমার ভালো লাগত। হয়তো তখন থেকেই আমার ভেতর বইয়ের ব্যবসার বীজ ঢুকে গিয়েছিল। আমার চাচাও বইয়ের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন সেবা প্রকাশনীর জেনারেল ম্যানেজার।’
নিজেকে বইয়ের ব্যবসায় জড়িয়ে ফেলার স্মৃতি মনে করে মুকুল বলেন, ‘আমার বাবার কাছে ছোটবেলা থেকেই শুনেছি বইয়ের ব্যবসা ভদ্র আর সম্মানজনক ব্যবসা। ছোটবেলা থেকে ওই সম্মানজনক ভেবেই আজ এ পর্যন্ত চলে এসেছি। আমার দুই ছেলেকে প্রতিষ্ঠিত করেছি। এক ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছে। আরেক ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাকাউন্টিংয়ে পড়ছে। আমার বড় মেয়েকে অনার্স কমপ্লিট করার পর বিয়ে দিয়েছি।’
নিজেকে বইয়ের ব্যবসায়ী পরিচয়েই রাখতে চান জানিয়ে মুকুল বলেন, ‘আমি যদি সুস্থ থাকি আরও কিছুদিন এই ব্যবসা করতে চাই। আমি পড়ালেখা অনেক কম করেছি। কিন্তু আমার আত্মসম্মানবোধ আছে। এ কারণেই আমি এই বইয়ের ব্যবসা ধরে রেখেছি। যাতে নিজের এই পরিচয় দিতে পারি। যতদিন সুস্থ আছি এই ব্যবসাতেই থাকবো আশা করি।’
আধুনিক যুগের অনলাইন ব্যবসার প্রভাব তাদের ওপর কেমন পড়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনলাইন অনলাইন করতে করতে আমরা শেষ হয়ে গেলাম। আমার এখানে ভালো ভালো কিছু কাস্টমার আছে তারা আসে। তারা এসে বলে অনলাইনে এটা পাইছি ভাই, পড়ছি। কিন্তু পড়ে বলে মনে হয় না। যদি জিজ্ঞেস করি কোনটা কোনটা পড়ছেন ভাই বলেন তো, তখন বলে এখন মনে নাই।’
অভিযোগের সুরে মুকুল বলেন, ‘এখন আমাদের অবস্থা খারাপ করে ফেলছে অনলাইনে বই বিক্রি করা কোম্পানিগুলো। কিছু ব্যাপার আছে যেগুলো বইয়ের ব্যবসায়ীদের জন্য খুব লজ্জাজনক। অনলাইনে বইয়ের ব্যবসা করে এমন কিছু কিছু কোম্পানি আছে ওদের প্রচুর অর্ডার আসে। তারা কোম্পানির সঙ্গে কন্ট্রাক্ট করে ভালো ভালো বইয়ের দাম বাড়িয়ে দেয়। দুইশো টাকার একটা বই তিনশো লিখে প্রিন্ট করে নেয়। তারপর সেটা তারা অনেক বেশি কমিশনে বিক্রি করে। এমন হুবহু প্রমাণ আমি অনেক পেয়েছি। একদিন এক ক্রেতা আমার এখানে একটি বই দেখিয়ে বললো সে এটা অনলাইন থেকে কিনেছে। বইয়ের গায়ে দাম লেখা দেখলাম ৩৫০ টাকা। কিন্তু একই বই আমার এখানে আছে, যার দাম ১৮০ টাকা। তো এরকম করেই চলছে ব্যবসা।’
ছবি: প্রতিবেদক।