‘বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের’ বিরুদ্ধে মানবপাচারের অভিযোগ

‘বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন’ নামের একটি সংগঠনের বিরুদ্ধে নানা প্রতারণার অভিযোগ এনেছে রাষ্ট্রীয় সংস্থা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। এ নিয়ে কথিত ওই সংস্থাটির বিরুদ্ধে রাজধানীর তেজগাঁও থানায় প্রতারণা ও মানবপাচারের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি। এ মামলায় বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের মহাসচিব সাইফুল ইসলাম দিলদারসহ সাত জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

তেজগাঁও থানার সাব ইন্সপেক্টর অপূর্ব কুমার বর্মণ মঙ্গলবার (১৩ জুন) জানিয়েছেন, গত রবিবার   বিকালে তাদেরকে মালিবাগের কার্যালয় থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আদালতের মাধ্যমে তাদের  জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় সংস্থা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নানা প্রতারণার অভিযোগে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের মহাসচিব সাইফুল ইসলাম দিলদারসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে রাজধানীর তেজগাঁও থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন’ নামে একটি বেসরকারি সংস্থার মহাসচিব সাইফুল ইসলাম দিলদার ও তার লোকজন দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করা ও এর বিচার করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া, ব্যক্তিগত আক্রোশের জেরে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠানো, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন কর্তৃক নিবন্ধিত বলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সদস্য সংগ্রহ, কমিটি গঠন, যুক্তরাজ্যে মানবাধিকার কনভেনশনের নামে মানবপাচার কাজে উদ্বুদ্ধ করাসহ নানা অপতৎপরতা চালিয়ে জনসাধারণের সঙ্গে প্রতারণা করছে। অথচ ‘কমিশন’ শব্দটি এবং নামের সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে ‘বিএইচআরসি’ শব্দটি ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং প্রিন্ট মিডিয়া কোথাও ব্যবহার করতে পারবে না বলে হাইকোর্ট তাদের বিরুদ্ধে রুল জারি ও নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেন। যা আপিল বিভাগেও বহাল রয়েছে।  ফলে কথিত ‘বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন’ নামে যেকোনও কার্যক্রম অবৈধ হবে।

এছাড়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নামে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা ও অর্থ আদায় করছে ‘বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন’ নামের এই বেআইনি সংস্থা। মানবাধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়নের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯’ অনুসারে একটি সংবিধিবদ্ধ স্বাধীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ওই আইনের ২ (ক) ধারা মতে, ‘কমিশন’ অর্থ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। তবে ‘বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন’ নামের একটি বেসরকারি সংস্থার লোকজন তাদের সংস্থার নামের সঙ্গে ‘কমিশন’ শব্দটি ব্যবহার করে দেশে-বিদেশে, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার কাছে তাদের সংস্থাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংস্থা বলে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছে। দেশের জনসাধারণ এমনকি সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, এমনকি গণমাধ্যমও নামসর্বস্ব ভুঁইফোড় মানবাধিকার সংগঠনটির মাধ্যমে  প্রভাবিত হচ্ছে। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

মঙ্গলবার (১৩ জুন) দুপুরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সম্মেলন কক্ষে বেসরকারি ওই সংগঠনের প্রতারণার বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন থেকে বেসরকারি সংস্থা কথিত বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের নিবন্ধনকারী সংস্থা এনজিও বিষয়ক ব্যুরো, যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদফতর ও সমাজসেবা অধিদফতরকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ প্রদান দেওয়া হয়। ২০২০ সালের ২ জুলাই এনজিও-বিষয়ক ব্যুরো, একই বছরের ৮ জুন যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদফতর কথিত বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের নিবন্ধন বাতিল করে। এছাড়া ২০২০ সালের ৫ নভেম্বর সমাজসেবা অধিদফতর বেসরকারি সংস্থার নামের শেষে কমিশন বা কাউন্সিল ইত্যাদি শব্দ থাকলে, তা বাদ দেওয়ার নির্দেশনা প্রদান করে।

তিনি আরও জানান, আদালত সংস্থাটির নামের শেষে ‘কমিশন’ ও সংক্ষেপে ‘বিএইচআরসি’ শব্দ দুটি কোথাও ব্যবহার করতে পারবে না বলে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা হয়। তা সত্ত্বেও এই আদেশ অমান্য করে ক্রমাগত তারা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওয়েবসাইট (www.nhrc.org.bd) এর আদলে (www.bhrc.bd.org) ওয়েব সাইট তৈরি করে ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করে যাচ্ছে। এছাড়া, তারা (www.bhrc.bd.org) ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে। এতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বেসরকারি ওই সংগঠনের মহাসচিব সাইফুল ইসলাম দিলদার তাদের নিজস্ব ফেসবুক পেজ ও ওয়েব সাইটে ‘যুক্তরাজ্য মানবাধিকার কনভেনশন ২০২৩’ নামে একটি গণবিজ্ঞাপন প্রচার করে যুক্তরাজ্যে প্রতিনিধি পাঠানো হবে বলে লোক সংগ্রহ করছে। এছাড়া সংগঠনটির সদস্যরা তাদের ব্যবহৃত গাড়িতে পতাকা স্ট্যান্ড ও বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত সোনালী রঙের  প্রতীক, যার ভেতরে ‘প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন’ ও সংক্ষেপে ‘বিএইচআরসি’ শব্দ ব্যবহার করে নিজেদেরকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জাতীয় মানবাধিকার কমিশন হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। সাইফুল ইসলাম দিলদার ও তাদের সহযোগীরা ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক প্রতারণার মাধ্যমে ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইটে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জনসাধারণকে প্রতারণাপূর্বক ক্ষতিসাধনের লক্ষ্যে, মানবপাচারের উদ্দেশ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রেসিডেন্ট, মহাসচিব, সচিব হিসেবে কর্মকাণ্ড করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। ওই বিজ্ঞাপন গত ৪ জুন (২০২৩) কমিশনের নজরে আসে। পরে অপরাধ সংঘটনে প্ররোচণা ও প্রচেষ্টা চালানোর অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মানবপাচার আইনে মামলা দায়ের করা হয়। মামলা দায়েরের পর কথিত বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের মালিবাগ অফিসে অভিযান চালিয়ে মহাসচিব সাইফুল ইসলাম দিলদার ছাড়াও তার ছয় জন সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।