বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া ৫৩ ব্যক্তির বিষয়ে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করেছে পুলিশ। বিশেষ করে তাদের সর্বশেষ তথ্য হালনাগাদসহ কারা তুলে নিয়েছিল, ওইসব ঘটনায় মামলা বা জিডির সর্বশেষ অবস্থার বিষয়ে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। নিখোঁজ এসব ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর বেশ কয়েকজন ফিরে এসেছেন। অনেককেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়েছেন। কারো কারো বিরুদ্ধে জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত থাকারও অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন থেকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়া এই ৫৩ জনের বিষয়ে একটি তালিকা পাঠানো হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে ওই তালিকা পুলিশ সদর দফতরে পাঠানো হয়। পুলিশ সদর দফতর রাজধানী থেকে নিখোঁজদের বিষয়ে আদ্যোপান্ত জানতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। সেই তালিকার সূত্র ধরে কাজ শুরু করেছে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একটি সূত্র জানায়, পুলিশ সদর দফতর থেকে চিঠি পাওয়ার পর গত ৯ মে ঢাকা মেট্রোপলিটন থেকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য জানানোর জন্য সকল অপরাধ বিভাগ ও গোয়েন্দা বিভাগে একটি চিঠি পাঠানো হয়। চিঠির সংযুক্তিতে তালিকাসহ ওই ব্যক্তিরা কিভাবে নিখোঁজ হয়েছেন সে বিষয়েও বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নিখোঁজ এই ৫৩ জনের মধ্যে ৪৬ জনকে র্যাব পরিচয়ে তুলে নিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একজনকে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়েছিল। বাকিদের কারা তুলে নিয়েছে সে সম্পর্কে বিস্তারিত কোনও তথ্য দেওয়া নেই।
পুলিশ সদর দফতরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মো. মনজুর রহমান জানান, নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে খোঁজ-খবর রাখা ও তথ্য হালনাগাদ করা পুলিশের একটি চলমান কাজ। এরই ধারাবাহিকতায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে খোঁজ-খবর করা হচ্ছে।’
এর আগেও জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের গুমবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশে ‘জোরপূর্বক গুম’ শিকার হওয়া ৭৬ জনের একটি তালিকা দিয়েছিল। এছাড়া অপর এক চিঠিতে ৩৪ জনের তালিকা দিয়ে তাদের অবস্থান ও ভাগ্য জানতে চেয়েছিল ওয়ার্কিং গ্রুপ। পরবর্তীতে গুম হওয়াদের মধ্যে থেকে ১০ জনকে খুঁজে পাওয়া গেছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনকে জানানো হয়।
সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, মাঝে মধ্যেই জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনসহ বিভিন্ন কমিটি থেকে এ ধরনের চিঠি আসে। আমরা তা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসন্ধান ও অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য তাদের জানিয়ে থাকি। যেমন এই তালিকার অনেকেই ফিরে এসেছেন বা পুলিশ তাদের গ্রেফতার করেছে। অনেকের বিরুদ্ধে জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন সময়ে অপরাধে জড়িত থাকা ব্যক্তিরাও নিজেরা আত্মগোপনে থেকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থায় গুম হওয়ার অভিযোগ করেন। এ জন্যই কোনও তালিকা আসলে পুলিশের পক্ষ থেকে যাচাইবাছাই করে তা সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে জানানো হয়।
ডিএমপির অপরাধ বিভাগের উপকমিশনার শচীন চাকমা জানান, পুলিশ সদর দফতর থেকে তালিকা ও ছকসহ নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল। আমরা বিষয়টি খোঁজ-খবর করে পুলিশ সদর দফতরে প্রতিবেদন পাঠিয়ে দেবো।
নিখোঁজের তালিকায় থাকা ব্যক্তিরা হলেন–২০১০ সালের ২৪ মার্চে ফার্মগেটের একটি রেস্টুরেন্ট থেকে র্যাব ২ এর পরিচয় দিয়ে তুলে নেওয়া ইউসুফ আলম সুজন, একই বছরের ১৭ মার্চ ভোরে মিরপুরে ১১ নম্বর সেকশনের ভাড়া বাসা থেকে তুলে নেওয়া মোহাম্মাদ জালাল, একই কায়দায় ২০০৯ সালে জহির রায়হান হিরন ও মাহমুদুল হক রনি, ২০১০ সালে আয়ুব আলী সরদার, মোহাম্মাদ লাল বাবু, তারিক উদ্দিন আহমেদ, ফোরকান ও আবুল হায়দারকে বিভিন্ন জায়গা থেকে তুলে নেওয়া হয়। ২০১১ সালে তৌফিকুল আহমেদ হাসান, সাগর আহমেদ লিটন, মোহাম্মাদ জামাল আহমেদ, আলিফ, আল আমিন, ইসমাইল বাবু। ২০১২ সালে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলি, তার গাড়ি চালক আসনার আলি, মোহাম্মাদ ইমাম হাসান ইলিয়াস বাদল; ২০১৪ সালে সামসুল ইসলাম সোলাইম, সোহেল রানা, রহমত উল্লাহ সেন্টু, সফিকুল ইসলাম শফিক, জাহিদুল ইসলাম সোহেল।
তালিকায় বলা হয়েছে, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাকে পুলিশ পরিচয়ে ২০১৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তুলে নেওয়া হয়। একদিন পরে গুলশান থানা পুলিশ তাকে গ্রেফতারের কথা জানায়। নিখোঁজের তালিকায় তার নাম থাকলেও বর্তমানে তিনি পরিবারের সঙ্গেই রয়েছেন এবং রাজনীতিতে সক্রিয়। একই বছর মতিউর রহমান, ওয়াকিলুর রহমান, খোকন, শফিকুল, আনিসুর রহমান, ওসমান গণি এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদের নামও নিখোঁজের তালিকায় রয়েছে। নথিতে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের ৩ মার্চ উত্তরা তিন নম্বর সেক্টর থেকে সালাউদ্দিন আহমেদকে তুলে নেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি ভারতের শিলংয়ে অবস্থান করছেন।
এই তালিকায় আরও আছেন–আমিনুল মল্লিক, সাদেক আলি মিঠু, তৌহিদুর রহমান, তোফায়েল আহমেদ মিলন। মল্লিক, মিঠু ও তৌহিদুরের বিরুদ্ধে জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত থাকার অভিযোগে পুলিশ তাদের বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার দেখিয়েছে।
তালিকার তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সালে নিখোঁজ হয়েছেন রাজিবুল ইসলাম, নাজিম উদ্দিন, আশফাক আযম আপেল, কামরুজ্জামান সাগর, রাশিদ গাজী, ইয়াসিন তালুকদার। ২০১৭ সালে রিশাদ এলাহী চৌধুরী, মিনহাজ ইয়ামিন জিবরান। ২০১৮ সালে মাহমুদা হাবিবা, কামাল আহমেদ, ইসমাইল হোসেন মানিক। ২০১৯ সালে হাসান মামুন, জহিরুল হক খন্দকার, খোরশেদ আলম পাটোয়ারি, সৈয়দ আকিদুল আলি, মুকুল হোসেন, মিনহাজ ইয়ামিন জিবরান এবং ২০২০ সালে দীপক ভৌমিক। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীপক ভৌমিককে র্যাব পরিচয়ে তুলে নেওয়ার একদিন পর ছেড়ে দেওয়া হয়।