ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে প্লাস্টিক নিষিদ্ধের দাবি

একসময় পাটের ব্যাগ ব্যবহার করা হতে। পরে বাজার দখল করে নেয় প্লাস্টিক। সেই প্লাস্টিক আজ পরিবেশের জন্য ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে প্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধের দাবি তোলেন পরিবেশবাদীরা।

রবিবার (২৫ জুলাই) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) আয়োজিত ‌‘পলিথিন-প্লাস্টিক দূষণে বিপন্ন বাংলাদেশ: করণীয় ও প্রতিকার’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় সংগঠনের নেতারা এসব কথা বলেন।

সভায় বাপার যুগ্ম সম্পাদক মিহির বিশ্বাস বলেন, ১৯০৭ সালে প্লাস্টিক আবিষ্কার হলেও এর ব্যবহার বাড়তে থাকে ১৯৫০ সাল থেকে। এখন এর আগ্রাসন প্রকৃতিতে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইউএনইপির তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ৯ দশমিক ২ বিলিয়ন টন প্লাস্টিক উৎপাদন হয়েছে। পরিবেশ অধিদফতরের মতে, প্রতিবছর দেশে ১০ লাখ ৯৫ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হয়।

তিনি বলেন, প্রকৃতিতে মিশে প্লাস্টিক খাদ্যচক্রের মাধ্যমে উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষের দেহে চলে এসেছে, যা জনস্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। প্লাস্টিক সমস্যার সমাধান না করলে প্রাণী ও মানবসমাজ অস্তিত্ব-সংকটে পড়বে।

এ সময় প্লাস্টিক-পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধে সমন্বয় সেল গঠনসহ ১৫ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন। তাদের দাবিগুলো হলো :

১. প্লাস্টিক ও পলিথিনজাত পণ্যের নিয়ন্ত্রণ ও নিষিদ্ধকরণ আইনের সঠিক, দ্রুত, নির্মোহ ও কঠোর বাস্তবায়ন করতে হবে।

২. পলিথিন শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ আইনের সফল প্রয়োগের জন্য সরকারি ও বেসরকারি সমন্বয়ে সেল গঠন করতে হবে।

৩. চকচকে প্যাকেটজাত খাদ্যসহ বিভিন্ন দ্রব্যাদি প্যাকেটজাতকরণে পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহারের ওপর উচ্চ কর আরোপের বিধান প্রবর্তন করা।

৪. চক্রাকার অর্থনীতির অধীনে উৎপাদককেই বর্জ্য আহরণের প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত করার বিষয়ে বাধ্য বা প্রণোদিত করা।

৫. দূষণকারীর জরিমানার ধারণা কার্যকরের পাশাপাশি উৎপাদকের বেপরোয়া পলিথিন-প্লাস্টিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে সংযত আচরণও নিশ্চিত হবে।

৬. অবৈধ্য টিস্যু পলিথিন ও শপিং ব্যাগ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে অবিলম্বে তাদের কারখানা বন্ধ করার জন্য সরকারি আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। কোনও যুক্তিতেই আর কোনও পলিথিন শপিং ব্যাগের উৎপাদনের জন্য অনুমতি দেওয়া যাবে না।

৭. পলিব্যাগ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাট, কাপড়জাত সামগ্রীর উৎপাদনে সহযোগিতা ও উৎসাহী করতে হবে।

৮. পণ্য বাজারজাতকরণে প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে এবং প্লাস্টিক ও পলিথিনের কাঁচামাল অপব্যবহার রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্লাস্টিকের কাঁচামালের ওপর আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি ও প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধাননির্ভর সামগ্রী বা কাঁচামালের ওপর শুল্ক হ্রাস করতে হবে।

৯. পানি ও কোমল পানীয় বাজারজাতকরণে প্লাস্টিক বোতল নিষিদ্ধ করে কাঁচের বোতল ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। প্লাস্টিক পাত্রের ব্যবহার বন্ধ করে দেশীয় মাটি, কাঁচ ও সিরামিকের পাত্র ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

১০. পলিথিনের বিকল্প পরিবেশবান্ধব কাগজ, চট ও কাপড়ের শপিং ব্যাগ ব্যবহারে সরকারি ও বেসরকারি জনসচেতনতামূলক প্রচার নিয়মিতকরণ ও বৃদ্ধির জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে।

১১. চিকিৎসা সরঞ্জাম ছাড়া একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধ নিশ্চিত করতে হবে।

১৩. প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যাগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সরাসরি আইনের আশ্রয় নেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

১৪. দেশের ঐতিহ্যবাহী পাটশিল্প পুনর্জীবিত করতে হবে এবং পাটশিল্প বিকাশে আরও উদ্যোগ নিতে হবে।

১৫. যত্রতত্র প্লাস্টিক বা পলিথিন জাতীয় বর্জ্য বা আবর্জনা ফেলার ক্ষেত্রে কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

১৬. রিডিউস, রিইউজ, রিসাইকেলের প্রতি জোর দিতে হবে এবং প্লাস্টিক জাতীয় বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য এ সংক্রান্ত অ্যাকশন প্ল্যানের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

বাপার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক এম ফিরোজ আহমেদ। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বাপার নির্বাহী সদস্য ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবাইলোজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুব হোসেন, এসডু’র হেড অব প্রোগ্রাম মনোয়ারুল ইসলাম, স্থপতি ইকবাল হাবিব প্রমুখ।