ডি-রেডিক্যালাইজেশন: স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ জঙ্গিদের

জঙ্গিবাদে জড়ানোর পর যারা নিজেদের ভুল বুঝতে পারে, তাদের অনেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘ডি-রেডিক্যালাইজেশন’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। ফিরে আসতে আগ্রহীদের কর্মকাণ্ড বিচার-বিশ্লেষণ ও তথ্য পর্যালোচনা করে র‌্যাব ডি-রেডিক্যালাইজেশন প্রোগ্রামে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে। এ ধরনের ২০ জনকে এই প্রোগ্রামের আওতায় এনে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পরিবারের কাছে দেওয়া হয়েছে। পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলেও তাদের নিয়মিত নজরদারিতে রেখেছে র‌্যাব। সংস্থাটির একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখা বলছে, জঙ্গিবাদ থেকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসতে র‌্যাবের পক্ষ থেকে একটি হট লাইন চালু রয়েছে। এ পর্যন্ত শতাধিক ব্যক্তি জঙ্গিবাদ থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সেই হট লাইনে যোগাযোগ করেছে। আমরা তাদের সবকিছু বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি। অর্থাৎ, তারা কী প্রক্রিয়ায় জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে। বর্তমানে সাংগঠনের কাদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে। তারা কোনও ধরনের প্রশিক্ষণ নিয়েছে কিনা— এসব  খতিয়ে দেখা হয়। যারা রেডিক্যালাইজেশন প্রোগ্রাম শেষে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে, নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের পরিচয় জানানো হয় না। তবে এ পর্যন্ত ২০ জনকে ডি-রেডিক্যালাইজেশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে নিজ নিজ পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে।

র‌্যাবের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, জঙ্গিবাদে জড়িয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বেশকিছু তরুণ- তরুণী তথাকথিত হিজরত করতে বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান করে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়েছে। হিজরতের নামে বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়া এমন ৭ তরুণকে শনাক্তের পর তাদের জিজ্ঞাসা করা হয়। পরে র‌্যাবের ডি-রেডিক্যালাইজেশন প্রোগ্রামের আওতায় কয়েকদিন জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়ে তাদের পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তারা এ ধরনের  কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আর  যুক্ত হবে না বলে অঙ্গীকার করেছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, জঙ্গিবাদে জড়িয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পরও অনেক অভিভাবকই থানায় অভিযোগ করেন না। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ নিখোঁজ ব্যক্তিদের সম্পর্কে জানা বা তাদের খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে বর্তমানে প্রচার-প্রচারণা ও জঙ্গিবাদের কুফল সম্পর্কে আলাপ-আলোচনার কারণে অভিভাবকরা আগের চেয়ে অনেক সচেতন হয়েছেন। এখন তারা সন্তানদের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। যদি কোনও কারণে সন্তান কিছু না বলে বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ থাকে, তাহলে এলাকার থানায় তারা সাধারণ ডায়েরি করছেন। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের বিষয়ে অবহিত হচ্ছে এবং তাদের গতিবিধি সম্পর্কে জানতে পারছে।

র‌্যাবের হাতে আটক ও জঙ্গিবাদ থেকে ফিরে আসা কয়েকজন কিশোর ও তরুণ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তথ্যপ্রযুক্তি, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন টুলস ব্যবহার করে তারা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েছিল। ইসলামি বিভিন্ন ভিডিও দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। পরে মেসেঞ্জারের মাধ্যমে এক জনের সঙ্গে সমমনা আরেকজনের পরিচয় ও কথাবার্তা হয়। এক পর্যায়ে সবাই একত্রিত হয়ে হিজরত করার জন্য পাহাড়ি এলাকায় চলে যায়।

জঙ্গিবাদে জড়ানো এক তরুণের অভিভাবক বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, কোরআন হাদিসের ওপর তার কম দক্ষতা ছিল। তিনি বুঝতে পারতেন না যে, কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল। ফলে আমাকে সহজেই মোটিভেটেড করা হয়। জঙ্গিদের গ্রুপ, তাদের কর্মকাণ্ড, সংগঠনের নাম— এভরিথিং গোপন করা হয়েছিল। এখন বুঝতে পারছি, একটি ভুল বিষয়কে সুক্ষ্মভাবে আমার কাছে উপস্থাপন করা হয়েছিল, কোরআন হাদিসের রেফারেন্স দিয়ে। আমার ছেলের গৃহ শিক্ষকের মাধ্যমে আমি এবং আমার ছেলে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ি। তিনি বলেন, ‘একটি পর্যায়ে বলা হয়, আমার ছেলেকে প্রশিক্ষণে পাঠানো হচ্ছে। আমি এতটাই মোটিভেটেড ছিলাম, আমার সন্তানকে প্রশিক্ষণে পাঠানোর জন্য কোনও বাধা দিতে পারিনি। আমাকে বলা হয়েছিল, প্রশিক্ষণে গেলেও আমাদের সঙ্গে কথা বলতে পারবে। যোগাযোগ করতে পারবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও ধরনের তথ্য পাচ্ছি না।’

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-সহ বিভিন্ন মাধ্যমে আমাদের নজরদারি রয়েছে। প্রতিনিয়ত সাইবার পেট্রোলিং মনিটরিং করা হচ্ছে। জঙ্গিবাদে জড়িয়ে কেউ যদি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চায়, তাহলে আমাদের হট লাইন নম্বর চালু রয়েছে। সেখানে যোগাযোগ করে যে কেউ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ নিতে পারে। হট লাইন নম্বরে অনেকেই যোগাযোগ করে থাকে। তবে বিচার-বিশ্লেষণ করে তাদের ডি-রেডিক্যালাইজেশন প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর বিষয়গুলো অনুসন্ধান করে আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’