মান্না ভাই? হ্যাঁ, মান্না ভাই। আপনার কার্ড পেয়ে কল দিলাম ভাই। যাওয়া যাবে? আসেন টেকনিক্যাল চিনেন, দারুস সালাম? আসার আগে কল দিবেন। কী সেবা দেন আপনারা? সব সেবা আছে। তাদের বয়স? ১৬-১৭ আছে, ২০-২১ আছে। আবার চাইলে আপনি সঙ্গেও আনতে পারেন। সেক্ষেত্রে রুম ভাড়া ১২০০ টাকা থেকে শুরু। আসার আগে কল দিলেই হবে।
রাস্তায় যারা হেঁটে বা রিকশায় চলাচল করেন তারা মোড়ে মোড়ে পড়ে থাকা লাল-নীল হাজারো ভিজিটিং কার্ডের সঙ্গে পরিচিত। তাদেরই একজন মান্না ভাই, ব্যবসা টেকনিক্যাল এলাকায়। তথ্য নিতে তাকে কল করা হলে কোনও রাখঢাক ছাড়া তিনি কী সেবা দিতে পারবেন, গ্রহীতাকে সেজন্য কী করতে হবে সেসব বলে গেলেন।
রাস্তায় পড়ে থাকা এই কার্ড বিভিন্ন ‘ভাই’দের—যারা যৌনকর্মী ও হোটেল ভাড়া দিয়ে থাকে। কার্ডে কেবল ‘ভাই’দের নাম-ফোন নম্বর থাকে এবং শতভাগ নিরাপত্তার বিজ্ঞাপন দেওয়া থাকে। থাকে না কোনও ঠিকানা। পুলিশের নজরে পড়ে ঠিকই, কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। উল্টো এসব কার্ডের মালিকেরা দাবি করে ‘সেটিং আছে বলেই আমরা শতভাগ নিরাপত্তার বিজ্ঞাপন দেই’। পুলিশের পক্ষ থেকে বরং না চিনে ফোনে যোগাযোগ করে কোথাও গিয়ে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
‘ঢোকা যায়, বের হওয়ার পথ নাই’
কথা হয় গাবতলীর আরেক ’ভাই’-এর সঙ্গে। সাংবাদিক পরিচয় দিতে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন। পরে মিরপুর-গাবতলী-টেকনিক্যালে তারা যতজনের নামে কার্ড বিলি করেন সবাই পরস্পর জড়িত কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি আপনার সঙ্গে ফোনে এসব নিয়ে আলাপ করবো না। তবে এটুকু জেনে রাখেন— এ পথে ঢোকা যায়, বের হওয়ার পথ নেই। গাবতলী এলাকায় কোনও একদিন আসেন, কথা হবে। যদিও মিরপুর এলাকার এক ‘ভাই’য়ের অধীনে থাকা নারী বিষয়টি খুলে বলেন। তিনি গত তিন বছর যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। সীমা (ছদ্মনাম) বলেন, দুই ধরনেরই আছে। একাধিক ‘ভাই’য়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, আবার একজনের হয়ে কাজ করে- দুই ধরনের আছে। ধরাবাঁধা হলে এক ধরনের পেমেন্ট, যদি ফ্লোটিং হয় তাহলে আরেক ধরনের। জায়গাটা যতটা সহজ মনে হয় ততটা না।
ফোন টোপে ‘নিরাপদ’ আর নাবালিকা বেশি চলে
এসব কার্ডে নাম-ফোন নম্বর দিয়ে আরও লেখা থাকে— শতভাগ নিরাপদ, এসি-নন এসি রুম ভাড়া এবং আসার আগে অবশ্যই ফোন দিয়ে আসবেন। কল করে মেয়েদের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা ১৬-১৭ বছরের মেয়েরাও কাজে আছে বলে জানান। এছাড়া শিক্ষিত, ২১ থেকে ২৫ বছরের নারীদের কথাও উল্লেখ করে থাকেন।
কলের সময় বা ঠিকানা চাইলে তারা কেউই ঠিকানা না জানিয়ে আশপাশের পরিচিত কোনও স্থানের নাম বলে সেখানে আসতে বলেন। এবং সেখান থেকে কীভাবে তাদের হোটেল কক্ষে নেওয়া হবে সেটাও জানিয়ে দেন। মেয়েদের ছবি দেওয়া বা বাছাইয়ের কোনও সুযোগ আছে কিনা প্রশ্নে দারুস সালামের আরেক ‘ভাই’ বলেন, আমাদের এখানে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরাও আছে। এখানে এলে দেখে বাছাই করে নেওয়ার সুযোগ আছে। কেন নিরাপত্তার বিষয়ে এত জোর দেওয়া হয় প্রশ্নে তিনি বলেন, সম্পূর্ণ অপরিচিত জায়গায় আসাটা নিরাপদ হবে কিনা সেজন্যই এটাকে সবার আগে বলা হয়।
পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করতে হয়
শতভাগ নিরাপত্তা কীভাবে দিচ্ছেন, এলাকার পুলিশ কিছু বলে না প্রশ্নে কাওরানবাজার এলাকায় সক্রিয় গোষ্ঠীর এক সদস্য বলেন, এসব পুলিশ জানে না তা নয়। মাঝে মাঝে অভিযান চালায়, তখন ম্যানেজ করতে হয়। পুরো কাজটাই রিস্কের ওপর। ফোনে কে যোগাযোগ করছে সেটাও আমরা জানছি না। আসার পরে কোনও ঝামেলা করে কিনা সেটাও জানি না। ফলে থানায় যোগাযোগ রাখতে হয়। যদিও তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি ) অপূর্ব হাসান এই বক্তব্য অস্বীকার করে বলেন, কাকে ম্যানেজ করতে হয় নাম বলতে বলেন। পড়ে থাকা এসব কার্ড চোখে পড়েনি কখনও তা না, তবে এসব নিয়ে কোনও মাথা ঘামানো হয়নি। এই কার্ডগুলো যারা রাস্তায় ছিটায় এবং যারা তুলে নিয়ে কল করে, তারা একই কাতারের লোক বলে আমি মনে করি।
এলাকায় এলাকায় এ ধরনের ব্যবসা কীভাবে নিরাপদে চলছে প্রশ্নে দারুস সালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ আমিনুল বাশার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের নজরে যখনই পড়ছে আমরা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি, আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। কিন্তু তারা জামিনে ছাড়া পেয়ে এসে স্থান পরিবর্তন করে আবারও কাজ শুরু করছে। দারুস সালামের একাধিক ‘ভাই’য়ের কার্ড পাওয়া যায় রাস্তায়, সেক্ষেত্রে এই এলাকায় কত সিন্ডিকেট কাজ করে প্রশ্নে তিনি বলেন, ঠিক কতগুলো সিন্ডিকেট সক্রিয় তা আমরা জানি না। তবে আমরা খবর পেলেই হোটেলগুলোতে অভিযান চালিয়ে তাদের আদালতে সোপর্দ করি। এটা চলমান প্রক্রিয়া।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) হারুন অর রশিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কোনও মাধ্যমে ফোন নাম্বার পেয়ে সেই নম্বরের সূত্র ধরে কোনও বাসাবাড়ি বা হোটেলে গিয়ে অনেকেই ব্ল্যাকমেইলের শিকার হচ্ছেন। ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে অনেকে টাকা-পয়সা দিচ্ছেন, কিন্তু যারা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হচ্ছেন তারা এসব বিষয় থানা পুলিশকে অবহিত করছেন না। থানায় এসে অভিযোগ বা মামলা করলে আমরা সেসব বিষয় তদন্ত করে অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারি। তবে অপরিচিত কারও সঙ্গে দেখা বা কারও আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাসাবাড়ি বা হোটেলে না যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।