রিকশায় করে বোনের বাসা থেকে ফেরার পথে খুন হন বাবলু হোসেন। ২০২১ সালের ১৭ এপ্রিল এই ঘটনা ঘটে। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও দুই গ্রুপের ক্ষমতার আধিপত্যকে কেন্দ্র করে তাকে খুন করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। ৯ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে দাখিল করা চার্জশিটে এই তথ্য উল্লেখ করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ওয়ারী ডিবি পুলিশের উপপরিদর্শক মিন্টু চন্দ্র বণিক।
যাত্রাবাড়ী এলাকায় ‘হোন্ডা আরিফ’ ও ‘গ্লাস সুমন’ গ্রুপের মধ্যে চাঁদা তোলা নিয়ে বিরোধ ছিল। ভিকটিম বাবলু হোসেন হলেন গ্লাস সুমনের ভাই। হত্যাকাণ্ডের পর ২০২১ সালের ১৮ এপ্রিল নিহত বাবলু হোসেনের বোন মাকছুদা ফারহানা যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্ত করে পুলিশ বলছে, পূর্ব পরিকল্পিতভাবে বাবুলের কাছে চাঁদা দাবি করে তাকে হত্যা করা হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে পেনাল কোড-১৮৬০ এর ৩৮৫/৩০২/৩৪ ধারার অপরাধ তদন্তে প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।
মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হলেন- রতন মিনা (২৪), সুজন মিনা (৩০), মানিক মিনা (২৩), আরিফ মাহমুদ ওরফে ডিজিটাল আরিফ (৩৪), মাইনউদ্দিন ওরফে কাকন (৩২), টেগরা সুমন (২৬), রাজিব চন্দ্র দাস (৩২), মো. আরিফ গোলদার ওরফে তোতলা আরিফ (৩০) ও হোন্ডা আরিফ (৪২)।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ওয়ারী ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক মিন্টু চন্দ্র বণিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চাঁদাবাজির জন্য দুই গ্রুপের ক্ষমতার আধিপত্যকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড। হোন্ডা আরিফ ও গ্লাস সুমন গ্রুপের চাঁদা তোলা নিয়ে বিরোধ ছিল। গ্লাস সুমনের সঙ্গে তার ভাই ভিকটিম বাবলু থাকতো। তার সঙ্গে থাকার কারণে এবং চাঁদা তোলা নিয়ে বিবাদের জের ধরে বাবলুকে হত্যা করে আসামিরা। মামলা তদন্ত করে ৯ জন অভিযুক্ত করে আসামি করা হয়েছে।
চার্জশিটে বলা হয়, যাত্রাবাড়ী এলাকার বিভিন্ন ফুটপাত হোন্ডা আরিফের লোকজন দেখাশুনা করত। অপরদিকে গ্লাস সুমন (নিহত বাবলুর ভাই) হকার্স লীগের পরিচয় দিয়ে ফুটপাতের বিভিন্ন দোকান থেকে টাকা তুলত। ঘটনার আগে হোন্ডা আরিফ লোকজন দিয়ে গ্লাস সুমনকে তার অফিসে ডেকে পাঠায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উভয়ের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
মামলার ভিকটিম বাবলু হোসেন (৩২) ছিলেন স্টিল ফার্নিচার ব্যবসায়ী। তিনি যাত্রাবাড়ী থানাধীন জেলেপাড়া সংলগ্ন মন্দিরের গলি এলাকায় নির্মাণাধীন একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় কাজ করছিলেন। বাবলু তার ভাই গ্লাস সুমনের সব কাজে থাকতেন। সুমন নিজেকে এলাকার এমপির ঘনিষ্ঠ দাবি করত। অপরদিকে এজাহারনামীয় আসামিদের স্থানীয় যুবলীগের সব কর্মকাণ্ডে দেখা যেত। হোন্ডা আরিফ তাদের সব কাজে নেতৃত্ব দিত। যাত্রাবাড়ী থানা যুবলীগের সভাপতি সায়েম খন্দকার মারা যাওয়ার পর থেকে হোন্ডা আরিফ নিজেকে যুবলীগের সভাপতির পরিচয় দিয়ে আসছিল।
আরিফ ওরফে হোন্ডা আরিফ এজাহারনামীয় আসামিদের দিয়ে যাত্রাবাড়ী থানার শহীদ ফারুক সড়ক ও এর আশপাশ এলাকার ফুটপাত ও এলাকায় যারা বিভিন্ন কাজকর্ম করত তাদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে আসছিল। ঘটনার ২০/২৫ দিন আগে গ্লাস সুমন হোন্ডা আরিফকে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির বিষয়কে কেন্দ্র করে গালিগালাজ করে। ঘটনার ৩/৪ দিন আগে গ্লাস সুমন হকার্স লীগের পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন দোকানে চাঁদা দাবি করে। প্রতিদিন ১০ টাকা করে চাঁদা দেওয়ার জন্য স্থানীয় হকারদের বলে সে।
চার্জশিটে আরও বলা হয়, স্থানীয়ভাবে মামলার তদন্তকালে প্রাপ্ত তথ্য, সংগৃহীত সাক্ষ্যপ্রমাণ, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা ও ময়না তদন্ত রিপোর্ট পর্যালোচনায় জানা যায় এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
পরিকল্পনা অনুযায়ী এজাহারনামীয় আসামিরা ঘটনাস্থলে গিয়ে অবস্থান করে। ঘটনার দিন রাত প্রায় ১০টায় যাত্রাবাড়ী থানাধীন শহীদ ফারুক সড়ক রোডের ১২নম্বর গলির মুখে অল্পা হোটেলের বিপরীত রাস্তায় ভিকটিম বাবুল পৌঁছা মাত্রই তার রিকশা ব্যারিকেড দিয়ে আটকায়। একপর্যায়ে তারা বাবুলের ওপর অতর্কিত হামলা শুরু করে। আসামি সুজন চাকু দিয়ে বাবুলের কপালে আঘাত করে। বাবুল রিকশা থেকে পড়ে যায়। তখন অন্য আসামিরা তাকে রাস্তার কিনারায় নিয়ে যায় এবং রতনের হাতে থাকা গিয়ার চাকু দিয়ে তাকে আঘাত করে গুরুতর জখম করে।
বাবুলের চিৎকারে আশেপাশের লোকজন এগিয়ে আসলে আসামিরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়। পরে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাসায় পাঠান। বাসায় গিয়ে অসুস্থ বোধ করলে তাকে আবার ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কর্তব্যরত ডাক্তার বাবুলকে মৃত ঘোষণা করেন।
মামলার বাদী মাকছুদা ফারহানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমার ভাই বাবলু নিরীহ মানুষ। আমার স্বামীর ৫ তলা নির্মাণাধীন ভবন দেখাশোনা করতো। আসামিরা তার কাছে চাঁদা চায়। সেটা না দেওয়ায় হত্যা করেছে। আমার আরেক ভাই সুমন চাঁদা নেওয়ার ক্ষেত্রে জড়িত না। জড়িত থাকলে বড় ভাই বাবলু তো দোষ করেনি। তাকে চাঁদার টাকা না পেয়ে হত্যা করেছে। আমি আমার ভাই হত্যার বিচার চাই।