ঢাকায় ডেঙ্গু সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। প্রতিদিনই বাড়ছে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা। এরকম পরিস্থিতি আগেই আশঙ্কা করে দুই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নাগরিকদের সতর্ক হওয়ার কথা বলা হচ্ছিল। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সচেতনতার কোনও বালাই নেই। ঢাকার দুই সিটিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত, চিরুনি অভিযান ও ক্রাশ প্রোগ্রামের মতো কর্মসূচি চালিয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, জমা করে রাখা নির্মাণ সামগ্রীতে এবং নির্মাণাধীন অনেক ভবনে মিলছে এডিসের লার্ভা।
সোমবার (১০ জুলাই) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু নির্মাণাধীন ভবন এবং উন্নয়ন প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে জায়গায় জায়গায় পানি জমে আছে। কোনও কোনও জায়গায় খালি চোখেই মশার লার্ভার উপস্থিতি বোঝা যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের বর্ষাপূর্ব জরিপে দেখা গেছে, রাজধানীর ১৯ ভাগ নির্মাণাধীন ভবনে এডিস মশার লার্ভা রয়েছে, যা উচ্চমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) সূত্রে জানা যায়, রাজধানীতে বর্তমানে নির্মাণাধীন ভবন রয়েছে প্রায় ৪ হাজার। এ হিসাবে রাজধানীর অন্তত ৮০০টি নির্মাণাধীন ভবনে এডিসের প্রজনন হচ্ছে।
রাজধানীর লালবাগে একটি নির্মাণাধীন ভবনে দেখা গেছে, ছোট কয়েকটি চৌবাচ্চায় কয়েক দিনের পানি জমা আছে। এ ছাড়া ভবনের নিচতলায় বিভিন্ন আকারের গর্তেও রয়েছে জমা পানি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভবনটির মালিক বশির আহমেদ জানান, ঈদ উপলক্ষে গত কয়েক দিন নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল। কাল থেকে আবার কাজ শুরু হলে এসব জমা পানি থাকবে না।
পরীবাগ, ধানমন্ডি ও খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা পানি এবং আবর্জনা মিলেমিশে একাকার। আর এর থেকেই তৈরি হচ্ছে এডিসের লার্ভা। এসব ভবনের পার্শ্ববর্তী বাসিন্দারা বলছেন, নিজেরা সচেতন থাকলেও পাশের নির্মাণাধীন ভবনগুলোর কারণে ডেঙ্গু আক্রান্তের ঝুঁকিতে আছেন তারা।
পরীবাগের ময়মনসিংহ রোড এলাকার বাসিন্দা মাসুমা সুলতানা বলেন, আমি ডেঙ্গুর আতঙ্কে টবের গাছ সরিয়ে ফেলেছি, কোথাও পানি জমতে দিচ্ছি না। বাড়ির মালিকও বাসার আশপাশ পরিষ্কার করিয়েছেন। কিন্তু এই যে পাশের নির্মাণাধীন ভবনগুলোয় জমা পানি আছে, এগুলো কারা পরিষ্কার করবে। এটা তো আর আমার দ্বারা সম্ভব না।
এ প্রসঙ্গে কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার নির্মাণাধীন ভবনে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ১৯ শতাংশ নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানিতে এডিসের লার্ভা রয়েছে। এ ভবনগুলোতে এডিস মশার লার্ভা নির্বিঘ্নে উড়ন্ত মশায় পরিণত হয়। এ কারণে এ ভবনগুলোর আশপাশের বাসিন্দারা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন।
তিনি আরও বলেন, ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপের পেছনে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি মানুষের অসচেতনতাও দায়ী। দুই সিটি করপোরেশনের বহুতল ভবন এবং নির্মাণাধীন বাড়িতে সবচেয়ে বেশি এডিসের লার্ভা মিলেছে, যা অত্যন্ত ভয়াবহ। এই অবস্থায় সবার সচেতনতা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
সম্প্রতি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত নির্মাণাধীন ভবনগুলোয় অভিযান চালিয়ে অন্তত অর্ধশতাধিক ভবনে এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত করে। এসব ভবনের লার্ভা ও এডিস মশা থেকে নগরবাসীকে বাঁচাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত, চিরুনি অভিযান ও ক্রাশ প্রোগ্রামের মতো কর্মসূচি নিয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এসব অভিযানে যেসব ভবনে এডিসের লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে সেই ভবনের মালিককে জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। দুই সিটিতে চলমান চিরুনি অভিযানে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকটি নির্মাণাধীন ভবন মালিক ও ডেভেলপারকে জরিমানা করা হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফজলে শামসুল কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা একাধিকবার ক্রাশ প্রোগ্রাম করে নির্মাণাধীন ভবনগুলোর জমা পানি পরিষ্কার করেছি। চিরুনি অভিযানের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। তারপরও যেসব স্থানে লার্ভা থেকে যাচ্ছে সবাই সচেতন না হলে তা নির্মূল করা সম্ভব না।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম শফিকুর রহমান বলেন, আমরা নির্মাণাধীন ভবনের জমে থাকা পানি পরিষ্কার করতে সংশ্লিষ্ট ভবন মালিকদের বারবার অনুরোধ করেছি। তারপরও যেখানে লার্ভা পাচ্ছি, তাদের জরিমানা করছি। এ ছাড়া মানুষকে সচেতন করার জন্য মাইকিংয়ের পাশাপাশি প্রচারপত্র বিলি অব্যাহত রয়েছে।