রাজধানীর পুরান ঢাকার কদমতলী এলাকায় কথা এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রেসে কর্মরত দুজনের রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এই হত্যায় জড়িত ১৪ জনকে চিহ্নিত করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। ১১ অভিযুক্তর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বুধবার (২ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে পিবিআইয়ের সদর দফতরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জোড়া খুনের রহস্য উদঘাটনের বিস্তারিত তুলে ধরেন পিবিআইয়ের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি বনজ কুমার মজুমদার।
নিহত সোহেল ও ইকবাল হোসেনের বাড়ি টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার ঘুনিপাড়া এলাকায়। তারা দুজন প্রতিবেশী এবং সম্পর্কে চাচা-ভাতিজা। তারা পুরান ঢাকার কদমতলীর কথা এন্টারপ্রাইজ প্রেসে কাজ করতেন।
বনজ কুমার মজুমদার জানান, ২০১৭ সালের ৬ নভেম্বর রাত ৩টার দিকে ভাতিজা সোহেলকে লোহার রড দিয়ে মাথায় আঘাত করে চাচা ইকবাল পালিয়ে যান। প্রেসের মালিক ও কর্মচারীরা সোহেলকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য পান্থপথের একটি হাসপাতালে ভর্তি করেন। এ ঘটনায় সোহেলের ছোট ভাই মো. সাইদুর রহমান (২৮) বাদী হয়ে ইকবালের (৫৫) বিরুদ্ধে কদমতলী থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা করেন। পরে ৮ নভেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোহেল মারা যান।
তিনি আরও জানান, প্রেস কর্মচারীরা থানা পুলিশ ও নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের জানিয়েছে, ৬ নভেম্বর রাত ৩টার দিকে চাচা ইকবাল নামাজ পড়তে ওঠেন। এ সময় রুমের লাইট জ্বালানো কেন্দ্র করে চাচা-ভাতিজার তর্কাতর্কি হয়। পরে লোহার রড দিয়ে ইকবাল ভাতিজা সোহেলকে আঘাত করে পালিয়ে যায়। এর পাঁচ দিন পর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বরপা এলাকায় একটি গাছের সঙ্গে গলায় গামছা পেঁচানো ইকবালের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এটাকে প্রেসের কর্মচারীরা প্রচার করেন যে নিজের অপরাধে অনুতপ্ত হয়ে ইকবাল আত্মহত্যা করেছে। এ ঘটনায় রূপগঞ্জ থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করে পুলিশ।
কদমতলী থানায় হওয়া মামলার একমাত্র আসামি ইকবালের লাশ উদ্ধার হওয়ায় ২০১৮ সালে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। এদিকে ইকবালের লাশের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে ‘হত্যা’ উল্লেখ করায় ইকবালের স্ত্রী পারভীন বেগম প্রেসের ১০ কর্মচারীর বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেন। মামলাটি রূপগঞ্জ থানা পুলিশ তদন্ত করতে গিয়ে প্রেসের ছয় কর্মচারীকে গ্রেফতার করে। কিন্তু কোনও ধরনের তথ্য উদঘাটন করতে ব্যর্থ হয় পুলিশ। পরে পুলিশ সদর দফতরের নির্দেশে মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই।
যেভাবে রহস্যের জট খোলে পিবিআই
বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ইকবাল হত্যা মামলার তদন্তে নেমে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের সূত্র ধরে কারখানায় লাশ নিয়ে যাওয়া গাড়ির খোঁজে নামেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গাড়ি ও সেই সময়ে গাড়ির চালক নূর আলম ও তার মোবাইল নম্বর শনাক্ত করেন তারা। কিন্তু নূর আলমের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি অন্য এক চালকের। নূর আলম নিজেকে আড়াল করতে অন্যের নম্বর ব্যবহার করেন।
পিবিআই প্রধান বলেন, নূর আলম পিবিআইকে জানান, ২০১৭ সালে তিনি মো. বাদল মিয়া নামের একজনের পিকআপ চালাতেন। বাদল চালক নূর আলমকে নিয়ে পিকআপসহ কারখানায় আসতেন। মামলায় বাদলকেও আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে নূর আলম ও বাদল লাশ গুম করার কথা স্বীকার করে জানান, প্রেসের কর্মচারীরাই ইকবালকে হত্যা করেন। পরে তারা লাশ গুমের কাজে সহযোগিতা করেন। এ মামলায় নূর ও বাদল আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। তাদের স্বীকারোক্তির পরেই জোড়া খুনের রহস্য উদঘাটিত হয়।
বনজ কুমার বলেন, নিহত ইকবাল নিয়মিত নামাজ পড়তেন। এ জন্য তিনি ভোরে ঘুম থেকে উঠতেন। আর কর্মচারীরা রাতভর জেগে থেকে মধ্যরাতে ঘুমাতে যেতেন। ফলে এই সময় রুমের লাইট জ্বালাতেন। এটাকে কেন্দ্র করে কর্মচারীদের সঙ্গে প্রায়ই বাগবিতণ্ডা হতো ইকবালের। ঘটনার দিন (২০১৭ সালের ৬ নভেম্বর) রাত ৩টায় প্রথমে প্রেস কর্মচারী আবদুর রহমানের সঙ্গে ঝগড়া, হাতাহাতি ও মারপিট হয়। এ সময় অন্য কর্মচারীরাও ইকবালকে মারধর করেন। দীর্ঘদিনের ক্ষোভের ফলে তারা সবাই মিলে ইকবালকে মারপিট ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এ সময় ভাতিজা সোহেল চাচা ইকবালকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে আসামিরা তাকেও লোহার রড দিয়ে এলোপাতাড়ি মেরে আহত করে। এরপর আসামি জামাল তার পূর্বপরিচিত পিকআপ চালক নূর আলম (৩৫) ও গাড়ির মালিক বাদলের সঙ্গে কথা বলে ২০ হাজার টাকায় পিকআপ ভাড়া করে। বাদল ও নূর আলম পিকআপ নিয়ে প্রেসে হাজির হন। হত্যার এক দিন পর ইকবালের লাশ গাড়িতে করে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বরপায় নিয়ে গলায় গামছা পেঁচিয়ে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখে।
কদমতলীর মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন হয়ে যাওয়ার পর মামলার পুনঃতদন্তের জন্য আদালতে আবেদন করেন রূপগঞ্জ থানায় হওয়া মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ পরিদর্শক আক্তারুজ্জমান। আদালত মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করে তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দিলে পিবিআই ঢাকা মেট্রো (দক্ষিণ) মামলাটি তদন্ত করে।
বনজ কুমার মজুমদার জানান, পিবিআই ঢাকা মেট্রো (দক্ষিণ) সোহেল হত্যা মামলায় জড়িত আসামিদের গ্রেফতার ও শোন এরেস্ট করে। দুটি মামলাতেই তদন্তে হত্যা ও লাশ গুমের সঙ্গে ১৪ জনের সংশ্লিষ্টতা পায় পিবিআই। তবে হত্যা জড়িত এক আসামি মৃত্যু ও দুজন পলাতক রয়েছে। এই দুটি মামলাতেই দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।