টিপু হত্যা মামলার পলাতক আসামিরা অধরা, বাদী কাউন্সিলর ডলিকে হুমকি

আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপুসহ জোড়া খুনের ঘটনায় এখনও পলাতক ৯ আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। আসামিরা পুলিশের ধরা-ছোঁয়ার মধ্যে ঘুরলেও রাজনৈতিক কারণে তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে পুলিশ বলছে, পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে। এদিকে টিপু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চার্জশিটভুক্ত আসামিরা বাদী সংরক্ষিত নারী আসনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফারজানা ইসলাম ডলিকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে। গত সোমবার (৩১ জুলাই) শাজাহানপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নম্বর ১৩৪১) দায়ের করেছেন ওই কাউন্সিলর।

ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার শাজাহানপুর থানার ওসি মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমারা তাকে হুমকির বিষয়টি অনুসন্ধানের পাশাপাশি টিপু হত্যাকাণ্ডে পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চালাচ্ছি। ইতোমধ্যে কয়েকজনের বাসায় অভিযান চালানো হয়েছে। তবে তাদের পাওয়া যায়নি। ওয়ারেন্ট তামিল করা আমাদের নিয়মিত কাজের অংশ। পলাতক আসামিদের খুব দ্রুত খুঁজে বের করে গ্রেফতার করা হবে।’

২০২২ সালের ২৪ মার্চ রাত সোয়া ১০টার দিকে শাহজাহানপুরে ইসলামী ব্যাংকের পাশে বাটার শোরুমের সামনে আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপুকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এসময় গাড়ির পাশে রিকশায় থাকা সামিয়া আফরান প্রীতি (১৯) নামে এক কলেজছাত্রীও নিহত হন। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের পর ওইদিন রাতেই শাহজাহানপুর থানায় নিহত টিপুর স্ত্রী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সংরক্ষিত কাউন্সিলর ফারহানা ইসলাম ডলি বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ৫ জুন ৩৩ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের খিলগাঁও জোনাল টিম।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২০ জুন আদালত চার্জশিটে অভিযুক্ত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর ৯ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। কিন্তু প্রায় দেড় মাস পার হলেও পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

আদালত সূত্র জানায়, গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামিরা হলেন— ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা গোলাম আশরাফ তালুকদার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মারুফ আহমেদ মনসুর, রিফাত হোসেন, সোহেল রানা, ওয়ার্ড যুবলীগের সাবেক নেতা আমিনুল, সামসুল হায়দার উজ্জ্বল, ১১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সভাপতি কামরুজ্জামান বাবুল, শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ মন্ডি ও জাফর আহমেদ মানিক ওরফে ফ্রিডম মানিক।

জানা গেছে, পরোয়ানাভুক্ত আসামিরা ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। একারণে রাজধানী ঢাকা শহরে তারা ঘোরাফেরা করলেও তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। আদালতে চার্জশিট দেওয়ার পর গোলাম আশরাফ তালুকদার ও মনসুরকে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু পলাতক থেকেই তারা বাদীকে নানাভাবে ভয়-ভীতি ও হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ করেছেন ফারহানা আক্তার ডলি।

ফারহানা আক্তার ডলি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, টিপু হত্যাকাণ্ডের অন্যতম দুই আসামি রাকিব ও কাইল্যা পলাশ উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছিল। তিনি এই জামিন বাতিলের জন্য আপিল করেছেন। আপিল শুনানির বিষয়ে তিনি গত সোমবার উচ্চ আদালতে যান। ওই দিন দুপুর একটার দিকে বিদেশি একটি মোবাইল নাম্বার (+৫৫৫৮৭৭) থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি নিজেকে আশিক নামে পরিচয় দিয়ে তাকে ভয়-ভীতি ও হত্যার হুমকি দেন।

ফারহানা আক্তার ডলি বলেন, ‘আশিক নামে ওই ব্যক্তি ফোন করে বলেন— কাইল্যা পলাশ, গোলাম আশরাফ তালুকদার, সোহেল শাহরিয়ার, সাগর, মনসুর তার ছোট ভাই। তাদের জামিনের ব্যাপারে কোনও প্রকার বাধা সৃষ্টি করলে আমার ক্ষতি হবে। আমি হুমকি দেই না, আমি কাজ করে দেখাই।’

আলোচিত এই হত্যা মামলার বাদী বলেন, আমি জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমার বাসায় পুলিশ পাহারা দিচ্ছে। কিন্তু তারপরও আমার দুই সন্তানকে নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। যে কোনও সময় এই আসামিরা আমার ক্ষতি করতে পারে। এজন্য আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রথম থেকেই মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা আশরাফ তালুকদার ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর মনসুরের সম্পৃক্ততা পেলেও তাদের গ্রেফতার না করতে বিভিন্ন জায়গা থেকে তদবির আসতে থাকে। এছাড়া সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সোহেল শাহরিয়ারকে গ্রেফতার না করতেও উচ্চ পর্যায়ের তদবির করা হয়। অবশ্য সোহেল শাহরিয়ারকে শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হলেও আশরাফ তালুকদার ও মনসুরকে শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়নি।