সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার বিচারের অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে। মামলাটির পুলিশ প্রতিবেদন দাখিলে প্রায় ১১ বছরে শতবারের মতো সময় নেওয়া হয়েছে, পরিবর্তন হয়েছে ৬ জন তদন্ত কর্মকর্তা। দেশে বিচার বিলম্বের ক্ষেত্রে এটিই একমাত্র মামলা, যার প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সময় নেওয়া হয়েছে শতবার। তাই প্রশ্ন উঠেছে, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা সত্ত্বেও এই সাংবাদিক দম্পতির পরিবার কি বিচারহীনতার উদাহরণ হয়ে থাকবে?
সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী এবং ৩১ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের আইনের আশ্রয়লাভের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে ফৌজদারি আইন অনুসারে একটি মামলার তদন্তভার ১২০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে। যার কোনটাই সাগর-রুনি হত্যা মামলায় প্রতিফলিত হয়নি বলে মনে করছেন অনেকে।
সোমবার (৭ আগস্ট) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শফি উদ্দিনের আদালতে মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। তবে পুনরায় সময় নেওয়ার মধ্য দিয়ে এই মামলার প্রতিবেদন দাখিলে শতবার সময় পেছালো।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. জেআর খান রবিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সংবিধান অনুসারে মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সেই হিসাবে যেকোনও ফৌজদারি মামলায় বাদী হিসেবে রাষ্ট্রপক্ষই ভূমিকা পালন করে থাকে। যেকোনও ফৌজদারি মামলার আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে থানায় এজাহার দায়ের হলে সংশ্লিষ্ট ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ১৫৪ ধারায় মামলা আমলে নেন। এরপর ১৫৬(১) ধারায় তদন্তকার্য শুরু করেন। তবে ৬১ ধারাবলে তদন্ত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করা না গেলে তখন ১৬৭ (৫) ধারা অনুসারে ১২০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
যেকোনও ফৌজদারি মামলায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর ভূমিকা অপরিসীম। কারণ, কোনও ফৌজদারি মামলায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় পুলিশ প্রতিবেদনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়, নয়তো প্রতিবেদনের অভাবে মামলা থেমে থাকে। এক্ষেত্রে কোনও ফৌজদারি মামলার তদন্তকার্য বিলম্বিত হলে মামলার অনেক আলামত বিনষ্ট হতে পারে। যা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্তরায়। সুতরাং কোনও ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা জরুরি। নয়তো এর দায় কোনভাবেই রাষ্ট্র এড়িয়ে যেতে পারে না বলে মনে করেন তিনি।
সাগর-রুনি হত্যা মামলাটির তদন্তভার পাওয়া র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র্যাবের বক্তব্য হলো— সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত অপরাধীকে ধরতে তারা কাজ করছেন। আমেরিকা থেকে ডিএনএ টেস্টের যে রিপোর্ট এসেছে, সেখানে দুজন অপরাধীর বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের শনাক্তে কাজ চলছে।
শঙ্কা প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়টি শুধু ১০০ বার কেন ৫০০ বারের জন্যও পেছাতে পারে। ন্যায়বিচার না পাওয়ার ক্ষেত্রে এই মামলাটি একটি উদাহরণ হয়ে থাকতে পারে।
মামলাটির তদন্তের বিষয়ে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ তার একটি প্রস্তাব রেখে বলেন, এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে আমার প্রস্তাব হলো, এখনতো সবই আধুনিক। যারা তদন্তে আছেন তারা চাইলে চাইলে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে গুগলকে ব্যবহার করে ওইদিন কোন ব্যক্তি বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল তাকে শনাক্ত করতে পারে। তাতে হয়তো কয়েকজনকে সন্দেহের তালিকায় রাখতে পারতো, তাদের মধ্যে থেকে আসল অপরাধীকে বের করতে পারতো। কিন্তু তারা যেভাবে বলছে তাতে তো সারাদেশের মানুষের ডিএনএ শনাক্ত করতে হয়, যা কখনোই সম্ভব না। তারা চাইলে এটা (স্যাটেলাইটের সহযোগিতা নেওয়া) সহজেই করতে পারে। কিন্তু এটা কেন করছে না তা জানিনা।