ডাকাতি করা স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার কম দামে কিনে পরে গলিয়ে পাত আকারে বিক্রি করছে তাঁতীবাজারের অসাধু স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা। একাধিক ডাকাতি মামলা তদন্ত করতে গিয়ে এমনই তথ্য পেয়েছে ঢাকা জেলা পুলিশ। সরাসরি এসব স্বর্ণ বিক্রি করতে গেলে ধরা পড়ার আশঙ্কা থাকায় স্বর্ণগুলো গলিয়ে পরে বিভিন্নভাবে তা বিক্রি করে আসছিল এসব ব্যবসায়ী। এরইমধ্যে স্বর্ণ ডাকাতির সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ৯ জনকে গ্রেফতার করা গেলেও যার মাধ্যমে সেগুলো তাঁতীবাজারে বিক্রি করা হয়েছে, তাকে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
কেরানীগঞ্জের জৈনপুরে র্যাব পরিচয়ে স্বর্ণ ডাকাতির অভিযোগে পেশাদার ডাকাত দলের ৯ সদস্যকে গ্রেফতার করে ঢাকা জেলা পুলিশ। গত মঙ্গলবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আশপাশে এবং রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করে এদের গ্রেফতার করা হয়। এরা হলো—বাদল মুন্সি ওরফে সার্জেন্ট বাদল (৪৫), শহিদুল শেখ ওরফে র্যাব শহিদ (৪০), অলিউর রহমান ওরফে ক্যাপ্টেন ওলি (৪২), সাইদ মনির আল মাহমুদ ওরফে সোর্স মনির (৩৭), সবুজ খাঁন (৫২), ড্রাইভার ইব্রাহিম ওরফে ডাক্তার (৩৬), লাবু শরীফ ওরফে বাবুল শরীফ ওরফে বাবলু (৪৮), রুবেল (২৭), ড্রাইভার মোশারফ হোসেন (৩৯) ।
ড্রাইভার মোশারফের কাছ থেকে একটি এলিয়ন প্রাইভেটকার (ঢাকা মেট্রো গ-২২-২৪৬৭) এবং ড্রাইভার ইব্রাহিম ওরফে ডাক্তারের হেফাজত থেকে একটি নোয়া মাইক্রোবাস (ঢাকা মেট্রো-চ-৫৩-৫১৯৭) ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়।
ঢাকা জেলা পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রাইভেটকার এবং মাইক্রোবাসে র্যাব এবং পুলিশের স্টিকার ব্যবহার করে কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গায় ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। যখনই ঘটনা ঘটছে তখনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর থেকে ঘটনার রহস্য উন্মোচন করছে। প্রতিটি ঘটনা ঘটলে শুরুতেই ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়। বড় ধরনের স্বর্ণ কিংবা টাকা-পয়সা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেন কর্মকর্তারা।
ঢাকা জেলা পুলিশ সূত্র বলছে, ডাকাতি, চুরি কিংবা লুণ্ঠন হওয়া বিভিন্ন ধরনের স্বর্ণালংকার কম দামে কেনে তাঁতীবাজার এবং আশপাশের অসাধু ব্যবসায়ীরা। গত ৪ সেপ্টেম্বর কেরানীগঞ্জের জৈনপুর বাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ী সুনীল মণ্ডল তার দোকান (পায়েল জুয়েলার্স) বন্ধ করে ব্যাগ নিয়ে বাসায় ফেরার পথে তাকে বহন করা মাইক্রোবাস থামায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে একটি দল। এ সময় তার কাছে থাকা ব্যাগটি ছিনিয়ে নেয় তারা। ব্যাগে ৩৪ ভরি বিভিন্ন ধরনের স্বর্ণালংকার ছিল। এরমধ্যে ২৮ ভরি স্বর্ণের আনুমানিক দাম ৩৪ লাখ টাকা ও ২২ ভরি রুপার আনুমানিক দাম ২৮ আটাশ হাজার টাকা। তাছাড়া নগদ আশি হাজার টাকা, চেকবই ও বিভিন্ন হিসাবের রেজিস্টার নিয়ে যায় ডাকাতরা।
পরে এসব স্বর্ণ তাঁতীবাজারের আরেক স্বর্ণ ব্যবসায়ী পলাশের কাছে বিক্রি করে তারা। এর আগেও এ ধরনের ডাকাতির ঘটনা ঘটিয়ে ব্যবসায়ী পলাশের কাছে স্বর্ণ বিক্রি করেছে চক্রটি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা টের পেয়ে গাঢাকা দিয়েছে পলাশ। তাকে গ্রেফতারে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গ্রেফতারকৃত ৯ জনের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জায়গায় মামলা রয়েছে। চক্রটি মূলত স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে ডাকাতি করে আসছিল। ডাকাতির পর তাঁতীবাজারের একটি দোকানে ডাকাতি করা স্বর্ণ গলিয়ে পাত তৈরি করে তারা। পরে তাঁতীবাজারে সাগর করপোরেশনে স্বর্ণ বিক্রি করতে এলে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
তিনি বলেন, ডাকাতি করা স্বর্ণ একাধিক হাত ঘুরে তাঁতীবাজারের ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করার জন্য আরও একটি সিন্ডিকেট কাজ করে। ব্যবসায়ীরা এসব স্বর্ণ কেনার পর নিজেরাই গলিয়ে অন্যান্য স্বর্ণালংকার তৈরি করে। তাঁতীবাজারে যেসব ব্যবসায়ীর কাছে ডাকাতি, চুরি কিংবা লুট হওয়া স্বর্ণ বিক্রি করা হয়েছে, তাদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান পুলিশ সুপার।