সমাজ-পরিবারে নৃশংসতা বাড়ছে কেন?

নৃশংসতাই যেন এখন শেষ কথা। ঘরে-বাইরে সর্বত্র। প্রতিপক্ষ কিংবা স্বজন; কেউই এই নৃশংসতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সনাতন সমাজ ব্যবস্থা থেকে আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় উত্তরণ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক অসমতা, দ্বন্দ্ব, লোভ ও হতাশা থেকেই মানুষ দিন দিন নৃশংস হয়ে উঠছে। যার সঙ্গে প্রযুক্তির উন্নয়নের বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার এ ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সোশ্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ভিডিওচিত্র ও নৃশংসতার খবর পড়েও অনেকে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সাম্প্রতিক নৃশংসতার কয়েকটি চিত্র

হাত-পা বেঁধে ঝুলিয়ে নির্যাতন ও হাতের কব্জি এবং পায়ের গোড়ালি কেটে ভিডিও ধারণ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের নৃশংসতার জানান দিয়ে উল্লাস করতো রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একদল সন্ত্রাসী। গত মাসের (সেপ্টেম্বর) শুরুতে এমন কয়েকজনকে গ্রেফতার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। র‌্যাবের হাতে আটক সন্ত্রাসী রাফাত কারও হাতের কাটা কব্জি হাতে নিয়ে ভিডিওতে সেটার বর্ণনা দিতো বলে জানান র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। রাফাতসহ সাত জনকে আটকের পর গত ৯ সেপ্টেম্বর তাদের নৃশংসতার বর্ণনা দেন তিনি।

গত ৬ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরে মাত্র ১১ বছর বয়সী আকাশ নামের এক শিশুকে চুরির অভিযোগ এনে বাঁশের মধ্যে ঝুলিয়ে লাঠি, লোহার রড ও ক্রিকেট খেলার ব্যাট দিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। শিশুটিকে নির্যাতনের ভিডিও করেও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। শিশু আকাশ মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটসংলগ্ন হাজী চিনু মিয়া স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। এ ঘটনায় পুলিশ ও র‌্যাব ৫ জনকে গ্রেফতার করে।

সম্পত্তির বিরোধে চট্টগ্রামের হালিশহরে বৃদ্ধ মো. হাসানকে (৬১) হত্যা করে স্ত্রী ও দুই ছেলে। হত্যার পর বৃদ্ধের লাশ ১০ টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গুম করার চেষ্টা করে তারা। গ্রেফতারের পর নিহতের স্ত্রী হোসনে আরা, বড় ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান ও পুত্রবধূ আনারকলির জবানিতে উঠে আসে হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতার ভয়াবহ চিত্র। লাশের টুকরাগুলো কয়েকটি লাগেজ ও ব্যাগে ভর্তি করে তারা। খণ্ডিত লাশের টুকরোগুলো পাশে রেখেই একত্রে খাওয়া-দাওয়া করে। তারপর সবাই মিলে লাশ গুমের জন্য বিভিন্ন স্থানে ফেলে আসে।  

পারিবারিক সহিংসতা

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সবশেষ তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে পরিবারের সদস্যদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩৯১ জন নারী। এরমধ্যে ২৩৫ জনকে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে। নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে আত্মহত্যা করেছেন ৯৪ জন নারী। শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৬২ জন। যৌতুককে কেন্দ্র করে নির্যাতনের শিকার ১১৪ নারী। যৌতুকের জন্য শারীরিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে ৫১ জনকে এবং যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন ছয় জন। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৫৭ জন। যদিও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। পরিবারের বাইরে প্রতিবেশী, পরিচিত-অপরিচিতজনদের হাতেও নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন অনেক নারী। বিগত নয় মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪৬৭ জন নারী। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩২ নারীকে। ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন তিন জন। এছাড়া ১০৫ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে।

নৃশংসতার হাত থেকে রেহাই পায়নি শিশুরাও। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিগত নয় মাসে ১ হাজার ১৫৭ শিশু নানাভাবে নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছে। এরমধ্যে হত্যার শিকার হয়েছে ৩১৭ শিশু। ধর্ষণের শিকার ৪৩ ছেলে শিশু। দুই ছেলে শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। একজন ছেলে শিশু ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে।  ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ছয় শিশুকে। এছাড়া আত্মহত্যা করেছে ৬৪ শিশু। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থান থেকে ১১৮ শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে পাঁচ শিশুর। এছাড়া অপহরণের পর হত্যা করা হয় ১৫ শিশুকে।

আগের বছর ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪৭৯ জন নারী। একই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৯৩৬ জন। এছাড়া নির্যাতনের কারণে ৫১৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলেও তথ্য দেয় সংস্থাটি।

নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতা নিয়ে যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের ডিন ও ক্রিমিনোলোজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিয়া রহমান বলেন, ‘সভ্যতা একদিকে যেমন আমাদের ভালো কাজের উদাহরণ দিচ্ছে, ঠিক তেমনি আমাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, লোভ, ধর্ষণ, ড্রাগ বেড়ে যাওয়া, সামাজিক অসমতা, অস্ত্রের ব্যবহার এর বিপরীত চিত্র। এটা শুধু আমাদের দেশেই নয়, উন্নত বিশ্বেও এটা রোগের মতো ছড়িয়ে গেছে। তিনি বলেন, ২০-২৫ বছর আগে রিলেটিভলি দ্বন্দ্বের উৎস কম ছিল। সমস্যা হলে নিজেরাই নিজেদের মধ্যে সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা করে নিতো। সভ্যতার বিকাশে নগরায়ণ ও শিল্পায়ন যখন হয়েছে, তখনই মানুষের সঙ্গে মানুষের প্রতিযোগিতা বেড়েছে। এরমধ্যে সম্পত্তি একটা বড় কারণ হয়ে উঠছে। আগের তুলনায় জমির মূল্য অনেক বেড়ে গেছে। ফলে পরিবারের মধ্যেই পিতা, মাতা, ভাই-বোন একে অপরের সঙ্গে বিরোধ বাড়ছে। জমির জন্য মাকে-বাবাকে মেরে ফেলা হচ্ছে। ভাই ভাইকে ও বোনকে হত্যা করছে।’

তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করে আমাদের মধ্যে বড় হওয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। অনেক টাকা থাকতে হবে। একইসঙ্গে টেকনোলজির অতিরিক্ত অপব্যবহারের কারণে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত মানুষের প্রতি মানুষের ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে। এতে দ্বন্দ্ব আরও বেড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি কালচারাল অ্যাক্টিভিটিজ, ধর্মীয় শিক্ষা, সবকিছু করার ফলে একসময় আমাদের মনের হিংস্রতাকে দমিয়ে রাখার সুযোগ ছিল। আমাদের মধ্যে লোভ-লালসা এত বেশি ছিল না। জমি জমার দাম এত বেশি ছিল না।’

নৃশংসতার বিষয়ে অধ্যাপক জিয়া রহমান বলেন, ‘নানা কারণে মানবিক গুণাবলি লোপ পেয়ে যাচ্ছে। যতই আধুনিক সমাজের দিকে আমরা এগুচ্ছি, ততই সেটা প্রকট আকার ধারণ করছে। সিরিয়াল কিলিং বা সিরিয়াল কিলার তো আমাদের দেশে তৈরি হয়নি। সেটা হয়েছে উন্নত দেশে। যত বেশি আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় যাবেন, তত বেশি সাইকোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার বা মানসিক অস্থিরতা বাড়বে। ড্রাগ, গ্যাং কালচার আধুনিকায়নেরই বাই প্রডাক্ট। যে কারণে যত বিভৎস কার্যকলাপ আমরা দেখতে পাচ্ছি।’

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডাক্তার মোহিত কামাল বলেন, ‘কোনও মা তার সন্তানকে মারতে পারেন না। কোনও কারণে যখন মায়ের মাতৃত্বটা ক্ষয়ে যায়, যখন সে ভোগবাদী নারীতে পরিণত হয়, বা ইনসাইড লস্ট বা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য একটা নারীতে পরিণত হয়। তখনই একজন নারী সন্তানকে হত্যা করতে পারে। যেমন আমরা বিভিন্ন সময় দেখি, সন্তান বাবাকে হত্যার ঘটনা আছে। পুলিশ কর্মকর্তা বাবাকে খুন করা মেয়ে ঐশীর ঘটনা আমরা জানি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা যে হিংস্র হয়ে উঠছি, নিষ্ঠুর হয়ে উঠছি, এর পেছনে রয়েছে হতাশা। সেখান থেকেই সহিংসতা। এই হতাশাটা কেন? সেটা আগে জানতে হবে। তাদের বাবা কী সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার পরিকল্পনা নিয়েছিল কিংবা অন্য কোনও পদক্ষেপ নিয়েছিল?’

পরিবার কিংবা স্বজনদের মধ্যে এ ধরনের ঘটনা কী কী কারণে ঘটতে পারে- যেমন বাবা বিয়ে করতে চাইছে একজন টিএনএজ মেয়েকে। সম্পত্তি অন্য কাউকে দিয়ে দিতে চাইছে। তখন তাকে তার সন্তান কিংবা আপনজনরা মারছে। সম্পত্তি আর বিয়ে কমন বিষয়। এখন নৃশংসতাটা কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। তখন চিন্তা করে লাশ কী করবে। গুম করতে হবে। এই গুম করার পরিকল্পনার মধ্যেই হিংস্রতাটা আমরা দেখতে পাই। পৃথিবীর যেকোনও খুনেই খুনি লাশ গুম করার চেষ্টা করে। এমনভাবে সরানোর চেষ্টা করে, যেনও কেউ বুঝতে না পারে। সেখানে নৃশংসতা আসতে পারে। একটা অপরাধ আরেকটা অপরাধকে উস্কে দেয়। একটা অপরাধ করে ফেলেছে, তখন এটা থেকে বাঁচার জন্য আরও অপরাধ করতে থাকে মানুষ। তখন চক্রবৃদ্ধি হারে অপরাধ ঘটে। এখন তারা কতটুকু নির্মম, নিষ্ঠুর, পাষণ্ড সেটা আমাদের জানা নেই। কিন্তু হিংস্র নির্মম পাষণ্ডরাই এ ধরনের কাজ করতে পারে। যেটা আমরা চিন্তাই করতে পারি না। সোশ্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন মিডিয়াতে যে হিংস্রতার চিত্র দেখানো হয়, এভাবে খুন হতে পারে, ওভাবে গুম করা যেতে পারে। সেটা থেকেও একটা কুশিক্ষা আসতে পারে। তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে তো ভালো কিছু আছে। সেটা না নিয়ে খারাপটা কেন আমরা নেবো।’

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘যেখানে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা থাকে না, সেখানে সমাজ বলেন আর পরিবার বলেন, সব ক্ষেত্রেই হতাশা দানা বাঁধে। সবার মনেই অস্থিরতা তৈরি হয়। সেই হতাশা আর অস্থিরতা থেকেই সমাজ ও পরিবারে সহিংসতা ও নৃশংসতা ছড়িয়ে পড়ে।’