‘আশিয়ান সিটি’ প্রকল্পের শুধু ৩৩ একর ভূমিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাবে মর্মে রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ। বুধবার (২২ নভেম্বর) আশিয়ান ল্যান্ডস ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের করা একটি রিভিউ আবেদনের শুনানি নিয়ে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এ রায় দেন।
আদালতে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট ফিদা এম কামাল ও প্রবীর নিয়োগী। তাদের সহযোগিতা করেন অ্যাডভোকেট মিনহাজুল হক চৌধুরী।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ মোহাম্মদ মোরশেদ। আশিয়ান সিটির পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট কামরুল হক সিদ্দিকী ও আহসানুল করিম।
এর আগে আইন ও সালিশ কেন্দ্র, এএলআরডি, বেলা, ব্লাস্ট, বাপা, আইএবি, নিজেরা করি এবং পবা-এ ৮টি মানবাধিকার এবং পরিবেশবাদী সংগঠন আশিয়ান সিটি প্রকল্পটির স্বপক্ষে প্রদত্ত রাজউক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র চ্যালেঞ্জ করে ২০১২ সালে একটি জনস্বার্থমূলক মামলা দায়ের করে। মামলার চূড়ান্ত শুনানী শেষে হাইকোর্ট বিভাগের একটি বিশেষ বেঞ্চ ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি এক বিভক্ত রায় প্রদান করেন।
রায়ে আদালত আশিয়ান ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের ‘আশিয়ান সিটি’ প্রকল্প এবং এ প্রকল্পে প্রদত্ত রাজউক ও পরিবেশ অধিদফতরের সব অনুমতিপত্র/ছাড়পত্র অবৈধ, বেআইনি এবং জনস্বার্থবিরোধী ঘোষণা করেন। দুজন বিচারপতি আবেদনকারীদের পক্ষে রায় দিলেও একজন বিচারপতি ভিন্নমত পোষণ করেন এ রায়ে। এ রায়ের বিরুদ্ধে আশিয়ান ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের একটি লিভ টু আপিল করে। আপিলটি শুনানি না করে ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি প্রদত্ত রায়ের দিনই জেলা প্রশাসন ১১৯৭ একর ভূমি ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছে এ যুক্তিতে আবাসন কোম্পানিটি হাইকোর্ট বিভাগের বিশেষ বেঞ্চে রিভিউ আবেদন করে। রিভিউ আবেদনের শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট বিশেষ বেঞ্চের ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারির রায় বাতিল করা হয়। রিভিউ রায়ের বিরুদ্ধে রিট আবেদনকারীরা সিভিল আপিল করেন। রিভিউ রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকেও অপর একটি সিভিল আপিল করা হয়। আপিল আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে আজ আপিল বিভাগ রিভিউ রায় খারিজ করেন এবং আশিয়ান ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের ‘আশিয়ান সিটি’ প্রকল্পটি ৩৩ একরের অধিক ভূমিতে বাস্তবায়নের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
প্রসঙ্গত, আশিয়ান ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের বিরুদ্ধে ২৩০ একরের অধিক ভূমিতে আশিয়ান সিটি প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমিদস্যুতার এবং জলাশয় আইন, ২০০০; পরিবেশ আইন, ১৯৯৫; ল্যান্ড হোল্ডিং লিমিটেশন অর্ডার, ১৯৭২; ল্যান্ড রিফর্ম অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৪; বেসরকারি আবাসন প্রকল্প (ভূমি উন্নয়ন) বিধিমালা, ২০০৪ এবং রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ ভঙ্গের অভিযোগে জনস্বার্থমূলক মামলাটি করা হয়। একই সঙ্গে এ মামলায় প্রকল্প অনুমোদনে পূর্ত মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, রাজউক এবং পরিবেশ অধিদফতরের বিরুদ্ধে অস্বচ্ছতা এবং ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়।
রাজউক ২০০৭ সালে জলাশয় ভরাটের অভিযোগে আশিয়ান সিটি প্রকল্পের বিরুদ্ধে জলাশয় আইনে মামলা করে। শুনানিতে হাজিরা না দেওয়ায় মামলাটি আশিয়ান সিটির স্বপক্ষে খারিজ হয়ে যায়, যার বিরুদ্ধে রাজউক কোনও আপিল করেনি। বিভিন্ন সময়ে রাজউক এ প্রকল্প অননুমোদিত বিধায় এতে প্লট না কিনতে ক্রেতাসাধারণকে বিজ্ঞপ্তি মারফত অনুরোধ জানায়। পরিবেশ অধিদফতরও জলাশয় ভরাটের অভিযোগে পরিবেশ আইনের অধীনে আশিয়ান সিটি প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করে। আশিয়ান সিটি প্রকল্প কর্তৃপক্ষের আপিল আবেদনের প্রেক্ষিতে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় কোনোরূপ যৌক্তিক কারণ না দেখিয়ে সেই জরিমানা কমিয়ে ৫ লাখ টাকা প্রদানের নির্দেশ দেয়। আশিয়ান সিটি প্রকল্প কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ভূমিদস্যুতার অভিযোগ উঠলে জেলা প্রশাসক, ঢাকা এক রিপোর্ট প্রদান করেন, যাতে দেখা যায় যে মাত্র ৪১ একর জমির সপক্ষে কিছু কাগজাদি দেখাতে পারলেও আশিয়ান সিটির নামে প্রায় ২৩০ একর ভূমি ভরাট করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের প্রতিবেদন অনুযায়ী ‘প্লাবনভূমি’।
জেলা প্রশাসকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভরাটকৃত জমিতে সরকারি এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি রয়েছে। ভুক্তভোগী জমির মালিকদের বারবার অভিযোগ সত্ত্বেও আশিয়ান সিটি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক জমি দখলের ব্যাপারে রাজউক, পুলিশ বা ভূমি প্রশাসন কেউ কোনও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
প্রথমে জলাশয় ভরাটের অভিযোগে আশিয়ান সিটি প্রকল্পের বিরুদ্ধে মামলা করলেও রাজউক ২০১২ সালের ৪ অক্টোবর ২০টি শর্ত সাপেক্ষে এ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। প্রকল্পের জমির শতভাগ মালিকানা না থাকলেও এবং প্রকল্পের লেআউট প্ল্যান অনুমোদন ছাড়াই শর্ত সাপেক্ষে প্রদত্ত এ অনুমোদন ২০০৪ সালের বেসরকারি আবাসন প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন বিধিমালার লঙ্ঘন দাবি করে তা চ্যালেঞ্জ করে মামলার বাদীরা। আশিয়ান সিটি প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে জলাশয় ভরাটের অভিযোগে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করে এবং বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর কর্তৃক আশিয়ান সিটি প্রকল্প এলাকাকে প্লাবনভূমি বর্ণনা করা সত্ত্বেও পরে এ প্রকল্পের সপক্ষে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র স্ববিরোধী এবং বেআইনি বলে মামলাটি চ্যালেঞ্জ করা হয়। আশিয়ান ল্যান্ডস ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড কর্তৃক প্রকল্পের জন্য ল্যান্ড হোল্ডিং লিমিটেশন অর্ডার ১৯৭২ এবং ল্যান্ড রিফর্ম অর্ডিনেন্স, ১৯৮৪-তে নির্ধারিত ভূমির পরিমাণের সর্বোচ্চ সিলিংয়ের অতিরিক্ত জমি দখলে রাখার অভিযোগ আনা হলে আদালত তা আমলে নেন এবং জমির এরূপ মালিকানা আইন বহির্ভূত মর্মে রায় দেন।