হবিগঞ্জে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে করা এক মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মায়ের সঙ্গে কনডেম সেলে থাকা ১০ মাসের শিশু মাহিদা কী অবস্থায় আছে— তার সার্বিক বিষয়ে জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে সেই শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে যেসব ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, সে সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নের কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়েছে।
শিশুটি ফাঁসির সেলে কেমন অবস্থায় আছে, তাকে কী সুবিধা দেওয়া হয়েছে, এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন আগামী ১৮ জানুয়ারির মধ্যে দাখিল করতে বলা হয়েছে। আইজি প্রিজন্স ও হবিগঞ্জের সিনিয়র জেল সুপারকে এই আদেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়।
হবিগঞ্জে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি মামলায় দণ্ড নিয়ে কারাগারে মায়ের সঙ্গে ১০ মাসের শিশু সংক্রান্ত রিটের শুনানি নিয়ে রবিবার (১৭ ডিসেম্বর) বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি জিনাত হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এসব আদেশ দেন।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাডভোকেট তানভীর আহমেদ। অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাস গুপ্ত।
পরে আইনজীবী তানভীর আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, হবিগঞ্জ জেলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মায়ের সঙ্গে থাকা ১০ মাসের শিশু মাহিদার সব ধরনের সুব্যবস্থা গ্রহণে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা এবং খামখেয়ালিকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং একইসঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির বাচ্চাদের কনডেন্স ছেলে রাখার ক্ষেত্রে সব সুব্যবস্থা গ্রহণের নীতিমালা করতে কেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হবে না, জানতে চেয়ে রুল ইস্যু করেছেন হাইকোর্ট।
উল্লেখ্য, গত ৩০ নভেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে ‘ফাঁসির সেলে কেমন আছে ১০ মাসের মাহিদা’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি সংযুক্ত করে হাইকোর্টে রিট করা হয়।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, হবিগঞ্জে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি মামলায় মায়ের মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ায় মায়ের সঙ্গেই ফাঁসির সেলে বন্দি আছে ১০ মাসের শিশু মাহিদা। এক লাখ টাকা যৌতুকের জন্য নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগে নিহত গৃহবধূ আয়েশা আক্তারের বাবা আব্দুস সাত্তার বাদী হয়ে ২০১৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলার আসামিরা হলেন— চুনারুঘাট থানার সাদেকপুর গ্রামের নিহত আয়েশা আক্তারের স্বামী রাসেল মিয়া, রাসেল মিয়ার মা তাহেরা খাতুন, ভাই কাউছার মিয়া, বোন রোজি আক্তার ও হুছনা আক্তার। মামলায় পাঁচ আসামির সবাইকে দোষী সাব্যস্ত করে গত ২৬ অক্টোবর মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয় হবিগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ আদালতের বিচারক জাহিদুল হক। আসামি কাউছার মিয়া পলাতক। অন্য আসামিরা রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায় ঘোষণার দিন মা হুছনা আক্তারের সঙ্গেই আদালতে এসেছিল ১০ মাসের শিশু মাহিদা। রায় ঘোষণার পর মায়ের সঙ্গে মাহিদার জায়গা হয় হবিগঞ্জ কারাগারের ফাঁসির সেলে। হত্যাকাণ্ডের সময় হুছনা আক্তার কলেজে লেখাপড়া করতেন। প্রায় দুই বছর আগে একই গ্রামের মিজানুর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।
জেল কোডের ৭৩৫ বিধিতে সেলের কথা বলা হলেও এর আয়তন কী তার উল্লেখ নেই। তবে জানা গেছে, বিভিন্ন কারাগারে ৬ ফুট বাই ৬ ফুট থেকে ১০ ফুট বাই ১০ ফুট আয়তনের সেল রয়েছে। হবিগঞ্জ কারাগারে নারী বন্দিদের জন্য দু’টি সেল রয়েছে। হবিগঞ্জ কারাগারে ফাঁসির সেলের আয়তন প্রায় ১০ ফুট বাই ১০ ফুট। দু’টি সেলের একটিতে রয়েছেন মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ষাটোর্ধ্ব তাহেরা খাতুন, তার মেয়ে রোজি আক্তার, হুছনা আক্তার ও হুছনা আক্তারের ১০ মাসের কন্যা মাহিদা আক্তার। তাদের সেলের উত্তর দিকে একটি জানালা, আয়তন প্রায় ৩ ফুট বাই ৩ ফুট। তাও একাধিক টিন দিয়ে শক্ত করে সাঁটানো, বন্ধ করে দেওয়া। কক্ষের দক্ষিণ দিকে অন্তত ১২ মিলিমিটার পুরুত্বের ১৪ শিকের (রডের) গেট। সেলে কোনও দরজা নেই। কক্ষ ঘেঁষে ছোট আয়তনের একটি বাথরুম। বাথরুমের সামনে প্রায় ৪ ফুট উচ্চতার দেয়াল। বাথরুমের সামনে একটি ভাঙা দরজা। দরজাটি লাগানো যায় না। লোহার শিকের বাইরে থেকে বড় একটি তালা ঝোলানো। দিনে সূর্যের আলো, জেল কোডের ৯৮৪ বিধি মোতাবেক রাতে থাকে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বৈদ্যুতিক আলো। বৈদ্যুতিক বাতি নেভানোর কোনও বিধান নেই। ফাঁসির সেলে বন্দিদের ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করে থাকেন কারারক্ষীরা।
হবিগঞ্জ কারাগারের ওই সেলে সরাসরি পানির কোনও ব্যবস্থা নেই। ছোট বালতিতে করে পানি পাওয়া যায়, তাও সবসময় নয়, ওই পানিতেই চলতে হয় তাদের। একজন সশ্রম কারাবন্দি যে হারে খাবার পেয়ে থাকেন, ফাঁসির সেলে বন্দিদেরও একই নিয়মে খাবার দেওয়া হয়ে থাকে।
২৪ ঘণ্টার মধ্যে দিনে দেড় ঘণ্টার জন্য ১০ ফুট বাই ১০ ফুট আয়তনের কক্ষের তালা খুলে দেওয়া হয়। তালা খুলে দেওয়ার পর দেড় ঘণ্টার জন্য ওই কক্ষের শিশু মাহিদাসহ চার বন্দির পরবর্তী গন্তব্য কক্ষের সামনের ৬ ফুট বাই ১০ ফুট আয়তনের বারান্দা।