স্বল্প আয়ের মানুষের ভরসার বাজার

শাকসবজি ও কাঁচামাল থেকে শুরু করে নিত্য প্রয়োজনীয় নানা পণ্যের পাইকারি বাজার সদরঘাটের শ্যামবাজার। পণ্য পরিবহনের জন্য সড়কপথে প্রতিদিন অসংখ্য মালবাহী ট্রাক বা পিকআপের যাতায়াত এই এলাকায়। এসব ট্রাক বা পিকআপ থেকে যখন মালামাল নামানো হয়, তখন অসাবধানতায় বা বস্তার ফাঁকে দিয়ে অল্পস্বল্প পড়ে যায়। আর এই পড়ে যাওয়া পণ্য কুড়িয়ে সংসার চলে অসংখ্য মানুষের। কেউ কেউ আবার এই পণ্য তুলে বিক্রিও করেন। অল্প মূল্য এসব পণ্য কিনতে শ্যামবাজারে ভিড়ও হয় অসংখ্য মানুষের।

কেউ পণ্য কুড়ানোয় বাধা দেন না, কারও অভিযোগও নেই এ নিয়ে। এভাবে বছরের পর বছর ধরে সীমিত আয়ের লোকজনের কাছে ভরসার স্থান হয়ে আছে শ্যামবাজার। 

প্রতিদিনই শ্যামবাজারে শতাধিক ট্রাক ও পিকআপ ভ্যান আসে। এসব যানবাহনে করে চাল, আলু, পেঁয়াজ, আদা, রসুন ইত্যাদি মালামাল আনা-নেওয়া করা হয়। অন্যদিকে নৌপথে ট্রলারে করেও আনা হয় শাকসবজি। এসব পণ্য নামানোর সময় সেখানে জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকেন অনেক মানুষ। নামানোর সময় পড়ে যাওয়া বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি কুড়িয়ে নেন তারা। কুড়িয়ে পাওয়া এসব পণ্যে সংসার চলে কয়েকশ পরিবারের।

কয়েকশ লোকের পরিবার চলে কুড়িয়ে পাওয়া এসব পণ্যে

সদরঘাট এলাকায় গত ১৫ বছর ধরে বিভিন্ন পণ্য কুঁড়িয়ে সংসার চালাচ্ছেন ষাটোর্ধ্ব বীনা রানি। প্রতিদিনই ছোট একটা থলে নিয়ে পণ্য ওঠানামা করা ট্র্যাক বা পিকআপের পেছনে থাকেন। আর পড়ে যাওয়া সেই পণ্য কুড়িয়ে ব্যাগে ভরেন‌। বাংলা ট্রিবিউনের কাছে তিনি তুলে ধরেন মনের মধ্যে থাকা চেপে থাকা কষ্ট আর সংগ্রাম করে চালানো পরিবারের কথা।

আক্ষেপ নিয়ে বীনা রানি বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর ছেলেমেয়ের দিকে তাকিয়ে আর দ্বিতীয় বিয়ে করিনি। যখন গায়ে শক্তি ছিল কাজ করে খেয়েছি। কাজ করে মেয়ের বিয়েও দিয়েছি। ভাগ্যখারাপ, মেয়ের জামাই অভাব-অনটনের কারণে ছেড়ে চলে গেছে। ঘরে এখন মেয়ে আর তার একটা ছেলে নিয়ে থাকি। আমার মেয়েটাও বাসাবাড়িতে কাজ করে। কিন্তু অমন করে তো আর সংসার চলে না। আমার বয়স হয়ে গেছে প্রায় ৬০এর কাছাকাছি। ভেবেছিলাম ছেলে বড় হলে ভাত খাওয়াবে। কিন্তু কপালে আমার ছেলের ভাত নাই। শেষ বয়সে এসেও রাস্তা থেকে কুড়িয়ে সংসার চালাতে হয়।

বছরের পর বছর ধরে শ্যামবাজার থেকে পণ্য কুড়িয়ে সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন অনেকে

রাস্তায় মালামাল কুড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, একটা ট্র্যাক থেকে মাল নামানোর সময় আমার মতো আরও পাঁচ সাত জন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে কার আগে কে পড়ে যাওয়া আলু বা পেঁয়াজ কুঁড়িয়ে নেবে। এখানে মোটামুটি সব কিছু পাওয়া যায়। আলু, পেঁয়াজ, রসুন, চাল, শাকসবজি থেকে শুরু করে যা কিছু ট্রাক বা নৌকায় করে আনা হয় তার আশেপাশে থেকেই এসব জিনিসপত্র কুড়ানো যায়। আবার অনেকে এই টুকটাক কাজ করে কুড়িয়ে অবশিষ্ট পড়ে থাকা জিনিস নিয়ে আসে। আর তা প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের ঘরের জন্য রেখে দেয় বা বিক্রি করে দেয়।

সদরঘাট এলাকায় এভাবে পণ্য কুড়ান ফাতেমা বেগম। ১৩ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামীর মৃত্যুর পর শ্বশুরবাড়ি ছাড়তে হয় তাকে। এক মেয়ে আর এক ছেলেকে নিয়ে বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জে তার বসবাস। মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করার পাশাপাশি প্রতিদিন নদীর এপারে বাজার করার কথা বলে চাল, ডাল শাকসবজি কুড়িয়ে নিতে আসেন।

প্রতিদিনের চাহিদা মেটানোর মতো সব জিনিসই কুড়িয়ে যাওয়া যায় শ্যামবাজারে

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, এই কাজ করে ছেলেমেয়েরে বড় করছি। এখন ওরা বড় হইছে এসব কাজ করতে নিষেধ করে। ছেলেমেয়ে দুজনই আমার কলেজে পড়ে। ছেলেটা সোহরাওয়ার্দী কলেজ, আর মেয়েটা বদরুন্নেসা কলেজে। তারা এখন বাচ্চাদের পড়িয়ে মোটামুটি কিছু রোজগার করে। কিন্তু তা দিয়ে কি আর চলে! আর তো কয়টা বছর। তারপর দুই জনেই বললো চাকরি করবে। তখন আর এসব করতে হবে না।

ফাতেমা বেগম ও বীনা রানির মতো এমন অসংখ্য মানুষের ভরণপোষণ জোগাড় হয় একইভাবে।  সকাল থেকে শুরু করে রাত অবধি অন্তত কয়েকশ মানুষের আনাগোনা থাকে সদরঘাট এলাকায়। উদ্দেশ্য একটাই, ট্র্যাক ও অন্যান্য মালবাহী গাড়ি থেকে পড়ে যাওয়া পণ্য কুড়ানো।

শ্যামবাজারে উঁকি দিলেই দেখা যায়, কুড়িয়ে পাওয়া আলু, পেঁয়াজ, লাউ, কুমড়া, টমেটো থেকে শুরু করে সব রকমের শাকসবজি ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ১০ থেকে ২০ টাকার ভাগে কেনাকাটা চলছে। কুড়িয়ে আনায় ও সামান্য পঁচন ধরার কারণে স্বাভাবিকভাবেই অন্য জায়গার তুলনায় এখানে কম মূল্যে বিক্রি হচ্ছে এগুলো। আর কম মূল্যে কিনতে পারার কারণে প্রতিদিনই এই বাজারে ভিড় করেন অসংখ্য মানুষ। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের লোকদের আনাগোনায় মুখরিত এই বাজার।

এই বাজারে থেকে সদাই করতে আসা একরাম হোসেন নামের একজন ক্রেতা বলেন, আমি ইসলামপুর একটা কাপড়ের দোকান কাজ করি। নাস্তা বকশিশসহ মাসে ১৩/১৪ হাজার টাকা বেতন পড়ে। এই অল্প বেতনে চাকরি করে ঢাকা শহরে বউ-বাচ্চা নিয়ে থাকি, আবার বাচ্চাদের লেখাপড়া করাই। এটা আসলে কতোটা কঠিন ব্যাপার তা বোঝানো যাবে না। সপ্তাহে দুই তিন বার আসি এখানে বাজার করতে। এসে প্রয়োজনীয় সব কিছু সস্তা মূল্য নিয়ে যাই। কিছুটা পঁচা বা ময়লা আবর্জনা থাকে, এর জন্য আবার বাসায় বকা শুনতে হয়। বউ বলে আমি দেখে বাজার করতে পারি না। কিন্তু আমি যে সংসার চালাতে কোথা থেকে আর কীভাবে বাজার করি সেটা শুধু আমি জানি।

কম দামে পাওয়া যায় বলে সামর্থ্যবান অনেকেও আসেন এখান থেকে পণ্য কিনতে

এই বাজার থেকে তরকারি কিনতে আসা সুজাতা নামের আরেকজন ক্রেতা বলেন, যদিও এখানে সব কুঁড়িয়ে পাওয়া তরকারি বিক্রি হয়, কিন্তু এতে আমাদের অনেক উপকার হয়। বাজার থেকে কোনও তরকারি কিনতে গেলে এক পয়সাও কম দেওয়া যায় না। কিন্তু এখান থেকে এক স্তূপ বা এক ভাগ দামাদামি করে নেওয়া যায়। আমাদের মতো এমন অগনিত পরিবার আছে যাদের নিয়মিত বাজার সদাই হয় এই ১০-২০ টাকার বাজার থেকে।

মোতালেব হোসেন নামের এই বাজারের একজন বিক্রেতা বলেন, এই বাজারে ব্যবসা করার লাভ একটা। সেটা হচ্ছে জিনিসপত্র ভালো হোক আর পচা হোক এখানকার সবকিছু বিক্রি হয়ে যায়। কারণ এখান থেকে কম দামে বাজার করা যায়। এখান থেকে যে শুধু গরিব মানুষেরা বাজার করে এমন ভাবলে কিন্তু ভুল হবে। অনেক ভালো ভালো পরিবারের মানুষও এখান থেকে বাজার করে। কম দাম পাইলে কে না কিনে! অনেকে সুন্দর পোশাক পরে নামিদামি প্যান্ট শার্ট পড়ে এখান থেকে বাজার করে। কে কার দিকে তাকিয়ে থাকে!অনেকে অপেক্ষায় থাকে কখন এখানে তরকারি বা অন্যান্য যাবতীয় জিনিসপত্র আসবে আর কখন কিনে বাসায় ফিরবে।

ছবি: প্রতিবেদক।