একটা সময় ছিল যখন নারী স্বাধীনতা, জেন্ডার ধারণা, নারীর গৃহস্থালি কাজের মূল্য দেওয়া ইত্যাদি সম্পর্কে মানুষের মধ্যে কোনও চিন্তাই ছিল না। বিশেষ করে পরিবারের পুরুষরা গৃহস্থালি কাজে নারীদের সাথে কাজ করবেন এটা ভাবাই যেতো না। সাধারণ পরিবারে তো নয়ই, শিক্ষিত পরিবারগুলোতেও নারী অধিকার, নারীর কাজে পুরুষের সহযোগিতা করার তেমন কোনও চর্চা ছিল না। পরিবারগুলোতে সেভাবে জেন্ডার ধারণা ছিল না। এমনকি বাবারা সন্তান কোলে নিয়ে বাইরে বের হলে বা সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করলে বাসার মুরব্বিরা এটা ভালো চোখে দেখতেন না।
এরপরেও সেসময় কোনও কোনও ব্যক্তির মধ্যে জেন্ডার ধারণা, গৃহকাজে সহযোগিতা করার চিন্তা, সন্তানের জন্য কাজ করার ইচ্ছা তৈরি হয়েছিল। পরিবারে কাজে হাত লাগানো, দায়িত্ব শেয়ার করা, স্ত্রীকে সম্মান করা, কন্যা সন্তানকে স্বাধীনতা দেওয়ার ধারণা কেউ হয়তো তাদের শেখায়নি অথবা তারা এ বিষয়ে কোন প্রশিক্ষণও পাননি। অথচ নিজেই তারা নিজেকে পরিবর্তন করেছেন একজন আধুনিক পুরুষ হিসেবে। তারা সেটা অন্তরে ও কাজের মাধ্যমে বহন করার চেষ্টাও করেছেন। এই ধরণের পুরুষ চরিত্র পাওয়া আমাদের সমাজে সেই সময় তো বটেই, এখনও পাওয়া কঠিন। সময় এগিয়েছে কিন্তু ধারণা কি বদলেছে? এতগুলো বছর পরেও, আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষ গৃহস্থালি কাজ, সন্তান প্রতিপালনের কাজগুলোকে শুধু নারীদের কাজ বলে মনে করেন। পুরুষ যদি নারীর সঙ্গে কাজ করেন, ঘরের কাজে সাহায্য করেন বা সন্তান প্রতিপালনে সহযোগিতা করেন তাহলেই তাকে অনেক অপমান করা হয়। তাকে নিয়ে পরিবার, বন্ধু ও আত্মীয় স্বজন হাসাহাসি ও টিটকারিও করেন। সমাজ মনে করে একজন যথার্থ পুরুষ হবেন পুরুষতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবসম্পন্ন। এসব ধারণা বদলাতে এগিয়ে এসেছে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল: পরিবার মানুষের প্রথম ও সবচেয়ে শক্তিশালী শিক্ষাক্ষেত্র। সন্তানের বেড়ে ওঠা এবং বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বাবা-মাসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। সেখানে সন্তান যে শিক্ষা পায়, সেই শিক্ষাই তাদের অন্তরে থেকে যায়। এরকম একটা ধারণাকে সামনে রেখে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ জেন্ডার ট্র্যান্সফরমেটিভ আর্লি চাইল্ডহুড ডেভলপমেন্ট প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছে বরগুনা সদর উপজেলা এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাতটি ওয়ার্ডে। এই প্রকল্পটি মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করছে সাউথ এশিয়ান পার্টনারশিপ এবং সুরভী। বাংলাদেশের সামাজিক সাংস্কৃতিক অবস্থা বিবেচনা করে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল এই প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যেখানে বাবা বা সংসারের পুরুষ সদস্যকে জেন্ডার ট্র্যান্সফরমেটিভ আর্লি চাইল্ডহুড ডেভলপমেন্ট প্রজেক্ট (ইসিডি) বা শিশুর প্রাক-শৈশবকালীন বিকাশে বাবার ভূমিকা নিশ্চিতকরণ করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
ফাদার্স ক্যাফের উদ্দেশ্য
ছেলে ও মেয়ে সন্তানের বেড়ে ওঠা ও বিকাশে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
সন্তানের লালনপালন ও যত্নে বাবা ও পরিবারের পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
সমাজে প্রচলিত সনাতনী শিশু লালনপালন পদ্ধতি ও নিয়ম পাল্টে দিয়ে এবং জেন্ডার ধারণাকে সামনে রেখে একটি বৈষম্যহীন সামাজিক পরিবর্তন আনা।
বিশেষ করে জেন্ডার সমতার কথা মাথায় রেখে কীভাবে শিশুর সাথে খেলতে হয়, সেটা বাবারা জানতেন না। ফাদার্স ক্যাফের আলোচনায় বাবারা সংসারের কাজে তাদের হাত লাগানোর অভিজ্ঞতা বিনিময় করার পাশাপাশি সন্তানের সঙ্গে জেন্ডার নিরপেক্ষ খেলা কেমন করে খেলবেন, সে সম্পর্কেও ধারণা পেয়েছেন। 'ফাদার'স ক্যাফে' গঠন করার মাধ্যমে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল চাইছে পরিবার এবং কমিউনিটির মানুষের মধ্যে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে। ফাদার্স ক্যাফে হলো জেন্ডার সমতা এবং সহায়ক পারিবারিক কর্মকাণ্ড নিশ্চিতকল্পে নবজাতক থেকে ৮ বছর বয়সী শিশুর বাবাদের একটি কমিউনিটিভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী দল। এই ক্যাফেতে বাবাদের সংযুক্ত করার মাধ্যমে তাদের ভূমিকাকে আরও সংবেদনশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাবাদের ওরিয়েন্টেশনে গর্ভবতী মায়ের প্রসব পরিকল্পনা, প্রসব পূর্ব ও পরবর্তী সেবা, টিকা, রক্তদাতা, স্বাস্থ্য কেন্দ্র নির্বাচন, শিশুর খাদ্য ও পুষ্টি, শিশুর সুরক্ষা, জেন্ডার, জেন্ডার সমতা, জেন্ডার বৈষম্যের কুফল, প্রাকশিশু বিকাশ, পারিবারিক সহিংসতা কীভাবে শিশুর বিকাশে বাধার সৃষ্টি করে, বাবা-মায়ের মধ্যে সুসম্পর্কের ফলাফল, যৌথভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুফল, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর বিশেষভাবে যত্ন করার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। ওইসব আলোচনায় কীভাবে পুরুষরা এগিয়ে আসতে পারেন ও সমানভাবে সাংসারিক ও শিশু প্রতিপালনের কাজে অংশ নিতে পারেন, সেইসব নিয়েও কথা বলা হয়। বাবারা শিশু লালনপালনসহ পারিবারিক সকল কাজে অংশগ্রহণ করলে পরিবার কী কী সুফল পেতে পারে সেটাও আলোচনা করে বুঝানো হয়। আলোচনা ও নানা ধরণের কর্মসূচির মাধ্যমে বাবারা তাদের শিশু সন্তানদের সামগ্রিক বেড়ে ওঠার বিষয়গুলোতে আরও সম্পৃক্ত হয়েছেন। শিশুকে বড় করে তোলার কাজটি যে একা মায়ের নয়, এই দায়িত্ব সমানভাবে যে বাবারও এই কথাটি প্রতিষ্ঠা করাই হচ্ছে ফাদার'স ক্যাফের লক্ষ্য। প্রতিটি শিশুর অধিকার রয়েছে সুন্দর ও সুস্থ পরিবেশে বড় হয়ে ওঠার। সেইসাথে সমাজের বিভিন্ন ক্ষতিকারক নিয়ম, স্টেরিওটাইপ ধারণা এবং অভ্যাস থেকে মুক্ত হয়ে একটি চমৎকার জীবন শুরু করার। ১৩৪টি "ফাদার্স ক্যাফে"-তে ২৫৮০ জন বাবা সদস্য হিসাবে সক্রিয়ভাবে বিভিন্ন সেশন এবং আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন।
বাংলাদেশের সমাজে বাবাদের ভূমিকাটা কেমন
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো ও পারিবারিক সংস্কৃতি অনুযায়ী পুরুষ ও বাবার দায়িত্ব মূলত সংসারের হাল ধরা। সেকারণেই বাবার সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনাই সংসারে অবশ্য পালনীয়। সাধারণত কেউ তার কথার বিরোধিতা করে না ও তার সামনে কোনও যুক্তি-তর্ক খাটে না। যেহেতু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে বাবা বাইরে গিয়ে কাজ করেন সেহেতু তার মধ্যে কর্তৃত্বের বিষয়টি চলে আসে। সেই কর্তৃত্বের বিষয়টিকেই আমরা বলি পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, এরই প্রতিফলন দেখা যায় অনেক বাবার মধ্যে। তাই সন্তানের বেড়ে ওঠার সময় বাবারা অর্থনৈতিক দায়িত্ব যতোটা পালন করেন, সহায়তাকারীর ভূমিকা ততোটাই কম পালন করেন। সন্তানের সঙ্গে কম কথা বলেন, কম হাসেন ও কম মেলামেশাও করেন। আর সন্তানের সাথে বন্ধুত্ব করার তো প্রশ্নই আসে না।
পুরুষ সন্তান প্রতিপালন করার ক্ষেত্রে যদি স্ত্রীকে সহযোগিতা করেন, ঘরের কাজে সাহায্য করেন তাহলে তাকে সামাজিক প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়। সাধারণত ছেলের মা সবচেয়ে আগে তার ছেলেকে বাধা দিতে এগিয়ে আসেন। ছেলের কাজ হলো আয় করা। ছেলে কেন সন্তান প্রতিপালনের কাজ করবে? কেন ঘরের কাজে হাত লাগাবে? স্ত্রীকে ঘরের কাজে সাহায্য করাটা কি পুরুষের কাজ? যৌথ পরিবারগুলোতে মা ছেলের কাপড় ধোয়া, বাসন মাজা, ঘর ঝাড়া, ভাত রান্না করা, সন্তানের জন্য দুধ বানানো, সন্তানের পেশাব-পায়খানা পরিষ্কার করার কাজগুলো সহজভাবে গ্রহণ করেন না। পুরুষকে গৃহস্থালি কাজে বা সন্তান প্রতিপালনে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে প্রথম আপত্তি বা বাধা আসে মায়ের কাছ থেকে। সেজন্য একক পরিবারে পুরুষ এমন অনেক সাংসারিক কাজই করতে পারেন, যা যৌথ পরিবারে পারেন না।
ফাদার্স ক্যাফে একটি সমন্বিত উদ্যোগ
তাই ফাদার্স ক্যাফে মানেই কিন্তু শুধু বাবাদের জড়িত করা নয়। এটি একটি সমন্বিত উদ্যোগ। এর সাথে আছে দাদা-দাদির ক্লাবও। কারণ পুরুষ গৃহকর্ম করলে সবচেয়ে বেশি আপত্তির মুখে পড়েন তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে। সেকারণে দাদা-দাদিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, তারাও যেন সেশনে এসে তাদের পরিবারের মধ্যে প্রগতিশীল পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেন। এর সাথে আছেন ইয়ুথ ক্লাবের সদস্যরা। এরা বিভিন্নভাবে শিশু সহায়ক কেন্দ্রের ফ্যাসিলেটেটরকে সহায়তা করেন। শিশুদের নাম নথিভুক্ত করেন, নিয়মিত শিশু সহায়ক কেন্দ্র পরিদর্শন করেন এবং শিশুদের ঝরেপড়া থেকে বিরত রাখার উদ্যোগ নেন। তারাও চাইছেন সমাজে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে জেন্ডার অসমতা দূর করতে।
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ চেষ্টা করছে কিছু উদ্ভাবনী ধারণা ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে সব শিশুদের সমানভাবে বেড়ে ওঠার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে। এর জন্য সবচেয়ে আগে প্রয়োজন বাবা-মা ও সহায়তাকারী বা শিশুদের যত্নকারীদের অনুপ্রাণিত করা। যাতে প্রকল্পটি সমস্যা ছাড়াই কাজ করতে পারে এবং পুরুষরা গৃহকাজ করতে চাইলে যেন সমালোচিত না হন এবং অপদস্থের শিকার না হন। তাই এদের সাথে এই প্রকল্পে সংযুক্ত করা হয়েছে দাদা-দাদি, পরিবারের অন্যান্য সদস্য, কমিউনিটির সদস্য, ধর্মীয় নেতা এবং স্থানীয়ভাবে গণ্যমান্য ব্যক্তি, যাদের আমরা সমাজে প্রভাব বিস্তারকারী বা কমিউনিটি লিডার বলি।
বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা নারী ও শিশু উন্নয়নে কাজ করতে গিয়ে দেখেছে যে পুরুষকে সম্পৃক্ত না করে বা স্বামীদের বাদ দিয়ে কোনও কার্যক্রম গ্রহণ করলে তা পুরোপুরিভাবে সফল হয় না। কারণ সংসারে ও শিশুর সার্বিক বিকাশে নারী ও পুরুষের যৌথ অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। এই গুরুত্ব অনুধাবন করে ফাদার্স ক্যাফের ধারণাটি উদ্ভাবন করা হয়েছে।
বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে শিশুপালন মায়ের একার দায়িত্ব বলে মনে করা হয়। তাই সন্তান প্রতিপালন করার কাজটিতে অধিকাংশ বাবাই লজ্জিত বোধ করেন। এছাড়াও এখনও একটি বৈষম্যমূলক ধারণা প্রচলিত আছে যে শুধু মা বা নারীরা সন্তানের লালনপালনের ও যত্নের দায়িত্বপালন করবেন। পুরুষ বা বাবারা ঘরের বাইরের উপার্জনমূলক কাজগুলো করবেন। অনেক বাবাই জানেন না যে জেন্ডার ধারণার ঊর্ধ্বে উঠে কীভাবে শিশুকে বড় করতে হয়, শিশুর সাথে খেলতে হয় ও গল্প করতে হয়। মূলত এই জেন্ডার বৈষম্যমূলক ধারণাগুলো বদলানোর জন্যই এই ইসিডি প্রকল্প কাজ করছে।
শিশু শিক্ষা গ্রহণ করে পরিবার থেকে
জেন্ডার সংবেদনশীল আচরণ করা, নারীকে সম্মান দেওয়া, নিজের ধারণা বা পছন্দ অপছন্দ অন্যের উপর চাপিয়ে না দেওয়া, ছেলে শিশু ও মেয়ে শিশুর মধ্যে কোন পার্থক্য না করার শিক্ষা মানুষ প্রকৃতপক্ষে পরিবার থেকে গ্রহণ করে। একটি পরিবারে সন্তান যখন দেখে তার বাবা তাদের বড় করে তোলার কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছেন, গৃহস্থালি কাজে মায়ের সাথে হাত লাগাচ্ছেন, অসুখ-বিসুখে সেবাযত্ন করার সময় সবার পাশে আছেন, তখন সন্তান সেই শিক্ষাটাই গ্রহণ করে। বড় হয়ে সেও একজন দায়িত্ববান পুরুষ হিসেবে ভূমিকা পালন করে।
২০২১ সালে জানুয়ারি মাসে ২/৩টি শিশু বিকাশ কেন্দ্রের আওতায় যে সব পরিবারে গর্ভবতী মা থেকে ৮ বছর বয়সী শিশু আছে, সেইসব পরিবারের বাবাদের নিয়ে বরগুনা সদর উপজেলায় ৫টি ইউনিয়ন এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাতটি ওয়ার্ডে মোট ১৩৪টি ফাদার্স ক্যাফে গঠন করা হয়। প্রতিটা ফাদার্স ক্যাফেতে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন বাবা সদস্য ছিলেন। সচেতনতামূলক ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে গর্ভবতী মায়ের প্রসবের আগে ও প্রসবের পরের সেবা, টিকা, রক্তদান, স্বাস্থ্য কেন্দ্র নির্বাচন, শিশুর খাদ্য ও পুষ্টি, শিশুর সুরক্ষা, জেন্ডার সমতা, জেন্ডার বৈষম্যের কুফল, প্রাকশিশু বিকাশ, পারিবারিক সহিংসতা কীভাবে শিশুর বিকাশে বাধার সৃষ্টি করে, পারিবারিক সুসম্পর্কের ফলাফল, যৌথ সিদ্ধান্তের সুফল, বিশেষ শিশুর যত্ন নিয়ে আলোচনা করা হয়। এসব ক্ষেত্রে দায়িত্বপালনে কীভাবে পরিবারের পুরুষ সদস্য এগিয়ে আসতে পারেন ও সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেন সেগুলো জানানো হয়। পুরুষরা শিশু লালনপালনসহ পারিবারিক সকল কাজে অংশগ্রহণ করলে কী সুফল হয়, তা আলোচনা করে বুঝানো হয়। যেহেতু বাবারা বেশিরভাগই বাড়ির বাইরে কাজের সাথে জড়িত, তাই ফাদার্স ক্যাফের সেশনগুলোতে সবার উপস্থিতি সবসময় নিশ্চিত করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাই কখনও কখনও সন্ধ্যাবেলাতেও অধিবেশন পরিচালনা করতে হয়।
জেন্ডার ধারণা ও সামাজিক উদ্যোগ
বাংলাদেশ বিভিন্ন সামাজিক এবং অর্থনৈতিক খাতে স্বাধীনতার পর থেকে অনেক কিছু অর্জন করেছে। বাংলাদেশের শ্রম বাজারে গত ২/৩ দশক ধরে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও নারী তার সময়ের একটা বড় অংশ বাজারকেন্দ্রিক কাজের চেয়ে বাজার বহির্ভূত কাজে ব্যস্ত থাকেন। বিনামূল্যের গৃহস্থালি কাজগুলোকেই অর্থ-আয়কারী কাজ নয় বলে বিবেচনা করা হয়। এই কাজগুলো কোনও অর্থনৈতিক লেনদেন বা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশা ছাড়াই গৃহিণীরা করে থাকেন। অস্বীকৃত এবং অদৃশ্য কাজগুলো শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রান্না, শিশুযত্ন, বয়স্ক মানুষের যত্ন নয়, এর সাথে আছে কৃষিকাজ, গবাদিপশুর দেখাশোনা ও বীজ সংরক্ষণ। অর্থনীতিবিদরা দেখিয়েছেন দেশে ৪৩ শতাংশের বেশি নারী পুরোপুরিভাবে গৃহস্থালি কাজের সাথে যুক্ত। পুরুষের সংখ্যা সেখানে ১ শতাংশেরও কম।
সময় এসেছে সরকারি নীতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে জেন্ডার সমতা, পরিবারের আয়-ব্যয়, সার্বিক দায়িত্বপালন, শিশুর যত্ন, বয়স্ক মানুষের যত্ন, সন্তানের পড়াশোনার দায়িত্ব ইত্যাদি বিষয়ে নারী-পুরুষ দায়িত্বভাগ করে নেওয়ার। এখন বৈশ্বিক এজেন্ডা হচ্ছে এমন সমাধান বের করা, যার মাধ্যমে নীতি বা পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটিয়ে সন্তান প্রতিপালন ও ঘরের কাজে নারীর সঙ্গে পুরুষ দায়িত্ব ভাগ করে নেবে। সেইসাথে নারীর অর্থনৈতিক কাজকে উৎসাহিত করা অর্থাৎ এমন সুযোগ সৃষ্টি করা যেন নারী কোন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাজে যোগ দিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। ফাদার্স ক্যাফেকে এই এজেন্ডারই একটি রূপ বলা যায়।
জেন্ডার সমতার ক্ষেত্রে এসডিজি ৫ অর্জন করতে চাইলে অবশ্যই নারীর এই অস্বীকৃত গৃহস্থালির কাজকে মূল্যায়ন করতে হবে। সেখানে ৪টি ক্ষেত্রে মনোযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে যেমন— নারীবান্ধব অবকাঠামোগত বরাদ্দ বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা, জনসেবা এবং ঘরের ভেতরের কাজ বা দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া। কারণ দেশে ৪৩.৩% নারী এবং ০.৯% পুরুষ পুরোপুরিভাবে গৃহস্থালি কাজে যুক্ত আছেন, যা একটি আধুনিক সমাজের পরিচয় বহন করে না। এসডিজি লক্ষ্য ৫.৪ এ স্পষ্টতই বলা হয়েছে পরিবারে কাজের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া, পুরুষকে সংসারের কাজে নিয়োজিত করা এবং প্রজন্মান্তরে কর্ম বিভাজনের ধারার কথা। পারিবারিক চর্চায় পরিবর্তন ও অবকাঠামো বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যেন গৃহস্থালি কাজে এবং সেবামূলক কাজে নারীর দায়িত্ব সহজ করা যায় এবং পুরুষের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়।
ফাদার'স ক্যাফের মতো উদ্যোগ যে ইতিবাচক ফলাফল বয়ে এনেছে
এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে ফাদার'স ক্যাফের মতো উদ্যোগ যে ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনতে পারে তা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে। যেমন ফাদার্স ক্যাফের আলোচনার ফলে যে পরিবর্তনগুলো দেখা যাচ্ছে, তা হলো—
ক) যে সকল কমিউনিটিতে ফাদার্স ক্যাফের ওরিয়েন্টেশন হয়েছে, সেখানে বাবারা তাদের পূর্বের ধারনা থেকে সরে এসেছেন। তারা আগে মনে করতেন ঘরের সব কাজ নারীর। পুরুষরা বাইরের কাজগুলো করবে। এখন তারা সময় পেলেই পারিবারিক কাজ মিলেমিশে করেন এবং কমিউনিটির সকলকে নিয়মিত পরামর্শ দেন। বাবারা সময় পেলেই শিশুর লালনপালন, গোসল করানো, খাওয়ানো, স্কুলের জন্য তৈরি করে স্কুলেও নিয়ে যান।
খ) সময় পেলেই বাচ্চাদের নিয়ে খেলাধুলা করেন, খেলনা কিনে আনেন। শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশে যে বাবার ভূমিকা অনেক বেশি, তা বুঝতে পেরে সেই অনুযায়ী সচেতন হয়েছেন। কেউ কেউ বাসার একটি নির্দিষ্ট স্থানে শিশুর জন্য খেলার ঘর বানিয়ে দিয়েছেন।
গ) যে বাবারা একসময় শিশুকে সময় দিতেন না ও গাম্ভীর্য বজায় রাখতেন, তারাও এখন শিশুদের সময় দেন। শুধু তাই নয় শিশুর সাথে শিশুসুলভ ব্যবহারও করেন ও অন্যকেও করতে উৎসাহিত করেন। তারা শিশুকে দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে নিয়ে যান ও গল্প করেন। শিশু জন্ম নেওয়ার পর থেকেই, তার প্রতি দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রে যেন জেন্ডার সমতা বজায় থাকে, এরকম পরিবেশ তৈরিতে তারা সচেতন হয়েছেন। জেন্ডার বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে, এমন কার্যকলাপ যাতে কমিউনিটিতে না ঘটে সেদিকেও নিজে সচেষ্ট থাকেন ও অন্যকে সচেষ্ট থাকার জন্য আহবান করেন।
ঘ) ফাদার্স ক্যাফেতে অংশগ্রহণকারী বাবারা বুঝতে পেরেছেন পরিবারের সকল কাজে সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিলে তা মঙ্গলজনক হয়। তাই এটি তারা নিজে বুঝে প্রতিবেশী বা আত্মীয়-স্বজনদেরও করতে উৎসাহিত করেন। মায়ের গর্ভে যে শিশুটি একটু একটু করে বড় হচ্ছে তার যত্নের দায়িত্ব শুধু একা মায়ের নয়, সেই দায়িত্ব বাবারও।
ঙ) পরিবারে স্ত্রী সারাদিন যে কাজ করেন, তার প্রতি সম্মান দেখানোর সংস্কৃতি সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি নারী ও শিশুর প্রতি কোন কাজ বা কোনও ব্যবহারগুলো শিশু নির্যাতনের আওতায় আসে সেটাও বুঝতে পেরেছেন।
সংসারের কাজ একা নারীর নয়
বহুদিন ধরেই বাংলাদেশে নারী শুধু উপার্জনকারী নয়, সংসারের মুখ্য উপার্জনকারী হিসেবে নারীর সংখ্যা বাড়ছে। নারীশিক্ষার হার বেড়েছে, বিভিন্ন সেক্টরে নারীর চাকরির হার বেড়েছে, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর প্রাধান্য লক্ষণীয়, রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব চোখে পড়ার মতো, দেশের সার্বিক এসডিজি লক্ষ্য অর্জনে নারীর ভূমিকার কথা গুরুত্ব দিয়ে বলা হচ্ছে। কিন্তু এরপরও সংসারের কাজ ভাগাভাগির ক্ষেত্রে অসমতা রয়েই গেছে। গত ৫২ বছরে বাংলাদেশে নারীর সার্বিক উন্নতি হলেও এই একটা জায়গায় এসে যেন স্থবির হয়ে আছি আমরা। নারীর অধিকাংশ কাজকে মূল্যায়ন করা হয়না বলে নারী ও পুরুষের কাজের মধ্যে সমতাও অর্জিত হয় না।
বরগুনার সখিনা বেগমের কথা দিয়েই লেখাটি শেষ করতে চাই- সখিনা বেগম বলেছেন, সংসারের কাজ করার পাশাপাশি তিনি আবাদ পরবর্তী সব কাজ করেন। যেমন, গবাদিপশুর দেখাশোনা, দুধ আহরণ, ছাগলের চাষ, বাড়ির ভেতরের সবজি বাগান এবং বীজ সংরক্ষণের মতো জরুরি কাজগুলো তিনিই করেন। এছাড়া জমি তৈরি, চারা রোপণ, সার দেওয়া, পোকানাশকের ব্যবহার, বীজ তৈরি, শস্য জমি থেকে বাড়িতে নেওয়া, ফসল ভাঙানো, বাছাই ও প্যাকেটজাত করার প্রক্রিয়ার সাথেও তিনি জড়িত। এর পাশাপাশি সংসারের প্রায় সব কাজই তাকে একা হাতে করতে হতো কয়েকবছর আগেও। তবে সখিনার স্বামী ফাদার্স ক্যাফের সদস্য হওয়ার পর, প্রায় সব কাজে, এমনকি সংসারের রান্নাবান্না ও সন্তান প্রতিপালনের কাজেও সহায়তা করেন। তিনি গ্রামের অন্য পুরুষদেরও এই পরামর্শ দেন।
ফাদার্স ক্যাফের সেশনে অংশ নেওয়ার পর সাইফুল ইসলাম বলেছেন, "পরিবার মানে এখন আমার কাছে সংসারের সব দায়িত্বপালন করা। স্ত্রী ও সন্তানের পাশে থাকা।” ফাদার্স ক্যাফের সেশনগুলোতে যোগ দিয়ে ক্যাফে মেম্বাররা প্রায় সবাই জানিয়েছেন যে তাদের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষ করে গৃহ কাজ ও সন্তানের সাথে খেলার মধ্যে জেন্ডার সমতা তৈরি করার বিষয়টি বুঝতে পারছেন। তারা আগে সংসারের কাজ, সন্তান লালনপালন ইস্যুকে যেভাবে ভেবেছেন, এখন তা ভাবছেন না। তারা সংসারের কাজ তাদের পরিবারের নারী সদস্যদের সাথে ভাগ করে নিয়েছেন। খুব জোরালো কণ্ঠে বলছেন, "এটি আমাদের পরিবার, এবং তাই পরিবারের কাজ করছি। এতে কোনও লজ্জা নেই।” একজন বাবা এখন অবলীলায় বলতে পারছেন, "গৃহস্থালির কাজে সহযোগিতা করার মাধ্যমে পরস্পরের মধ্যে সুসম্পর্ক তৈরি হয়। দু'জন দু'জনকে বুঝে ও সম্মান করে। আমি মনে করি এর মাধ্যমে আমরা কিছু অনুকরণীয় আচরণ উপস্থাপন করতে পেরেছি।" এক কথায় বলা যায়, ফাদার্স ক্যাফেতে অংশ নেওয়া বাবারা এখন এলাকায় চেঞ্জমেকার বা পরিবর্তনকারী হিসেবে কাজ করছেন।
শতকরা প্রায় একশো ভাগ বাবা, যারা ফাদার্স ক্যাফের সদস্য, তারা এখন একা একাই ঘরের কাজ করছেন। বাবারা কাজ ভাগ করে নিয়ে বলছেন, "এটি আমাদের পরিবার, তাই ঘরের কাজও আমার কাজ।"
একজন শিশুর কাছে বাবা-মা দুজনেই সমান প্রিয়, সমান নির্ভরতার জায়গা, দু'জনের ভালবাসা ও আলিঙ্গন শিশু প্রত্যাশা করে সমানভাবে। একটি পরিবারে ছায়াদানকারী বটগাছটির নাম বাবা। আর তাই একজন সন্তান যখন বেড়ে ওঠার সময় তার বাবাকে পাশে পায়, তখন সেই সন্তানের বেড়ে ওঠাটা হয় খুব সহজ ও সাবলীল।
লেখক: প্রজেক্ট ম্যানেজার- গেটইসিডি প্রজেক্ট, প্লান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।