রায় আজ

‘অরিত্রী হত্যা মামলা শুধু আলোচিতই না, সন্তান হারানোর মামলাও’

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারীকে আত্মহত্যার প্ররোচনায় দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় প্রতিষ্ঠানটির দুই শিক্ষিকা নাজনীন ফেরদৌস ও জিনাত আক্তারের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার জন্য আজ রবিবার তারিখ ধার্য রয়েছে।

রবিবার (২১ জানুয়ারি) দুপুরে ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ ১২-এর বিচারক আব্দুল্লাহ আল মামুনের আদালত এই রায় ঘোষণা করবেন।

গত ২৭ নভেম্বর রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ ১২-এর বিচারক রায়ের জন্য এই তারিখ ধার্য করেন।

এদিকে রায়ে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক সাজার প্রত্যাশা করছে নিহত অরিত্রীর পরিবার। অন্যদিকে এই মামলা থেকে খালাসের প্রত্যাশা করেছে আসামিপক্ষ।

অরিত্রীর বাবা দিলীপ অধিকারী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমার জায়গা থেকে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কিন্তু আইন তো নিজস্ব গতিতে চলে। আপনি যখন একটা পেশিশক্তির বিরুদ্ধে লড়তে যাবেন, অন্যায় যারা করে তারা কিন্তু তখন মরিয়া হয়ে ছাড়া পাওয়ার কথাই ভাবে। তারা এস্টাবলিস্ট করতে চায়—অপরাধ করিনি। একজন খুন করেও একথা বলে। আবার যে সামান্য আঘাত করে সেও একথা বলে। একজন আরেক জনকে চড় মেরে বা অপমান করেও বলে আমি এ অপরাধ করিনি। একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া।

তিনি আরও বলেন, রায় যা হয় দেবে, আমার আর কী করার আছে। তবে এটা আলোচিত মামলা শুধু না, একটা সন্তান হারানোর মামলাও। এ কারণে সারাজীবন ব্যথিত থাকবো। এই হত্যার একটা শাস্তি হোক। এবং এই শাস্তিটা দৃষ্টান্তমূলক হোক এই সমাজের জন্য। শিক্ষকদের যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ, পেশাদারি আচরণ না। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় ৯০ শতাংশ শিক্ষক শিক্ষকসুলভ আচরণ করে না। চেয়ারটা পেলে অনেক শিক্ষকের আচরণ বদলে যায়। এই অশুভ লোকগুলো চেয়ারের দোহাই দিয়ে হয়রানি করে, রূঢ় আচরণ করে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। আমরা আশা করি আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা হবে এবং ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পাবেন।

অন্যদিকে আসামিদের পক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, আদালতের ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। আদালত যে আদেশ দেবেন আমরা মাথা পেতে নিবো। আশা করি, আসামিরা ন্যায়বিচার পাবেন। এই মামলা থেকে খালাস পাবেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর পরীক্ষা চলাকালে অরিত্রীর কাছে মোবাইল ফোন পান শিক্ষক। মোবাইল ফোনে মেয়ে নকল করেছে এমন অভিযোগে মা-বাবাকে স্কুলে যেতে বলা হয়। দিলীপ অধিকারী তার স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে স্কুলে গেলে ভাইস প্রিন্সিপাল তাদের অপমান করে কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। অধ্যক্ষের কক্ষে গেলে তিনিও একই রকম আচরণ করেন। এ সময় অরিত্রী দ্রুত অধ্যক্ষের কক্ষ থেকে বের হয়ে যায়। পরে শান্তিনগরে বাসায় গিয়ে তিনি দেখেন, অরিত্রী তার কক্ষে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়নায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় ঝুলছে। অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্কুল কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটি প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় স্কুলের অধ্যক্ষসহ তিন শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়।

ওই ঘটনায় ৪ ডিসেম্বর পল্টন থানায় তার বাবা দিলীপ অধিকারী বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।

২০১৯ সালের ২০ মার্চ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক কাজী কামরুল ইসলাম ওই দুই আসামির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় শ্রেণিশিক্ষক হাসনা হেনাকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করেন তিনি।

২০১৯ সালের ১০ জুলাই ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ রবিউল আলম প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস ও শাখাপ্রধান জিনাত আক্তার বিরুদ্ধে চার্জগঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। দুই আসামির বিরুদ্ধে যে ধারায় চার্জ গঠন করা হয়েছে ওই ধারায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড অথবা অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

মলাটিতে ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করেছে আদালত।