সোনালী ব্যাংকের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ দুর্নীতির ১১টি মামলার মধ্যে এক যুগ পর একটির রায় ঘোষণার জন্য আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি তারিখ ধার্য করেছেন আদালত।
রবিবার (২৮ জানুয়ারি) রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে ঢাকার ১ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আবুল কাশেম রায় ঘোষণার এই তারিখ ধার্য করেন।
দুদকের প্রসিকিউটর মীর আহমেদ আলী সালাম এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০১০-২০১২ সালের মার্চের মধ্যে সোনালী ব্যাংকসহ দেশি-বিদেশি ৪১টি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে হলমার্ক ৩ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা তুলে নেয়। এর মধ্যে জালিয়াতির খবর প্রথম প্রকাশিত হওয়ার পর (মালিক তানভীর মাহমুদ গ্রেফতারের আগে) মাত্র ৫৬৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আদায় হয়। এরপর গত এক যুগে একটি টাকাও আদায় হয়নি। প্রতি মাসে ১০০ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধের শর্তে ২০১৩ সালের আগস্টে জামিন পায় মামলার অন্যতম আসামি হলমার্কের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম। কিন্তু সে ছয় বছর জামিনে বাইরে থাকলেও এক টাকাও পরিশোধ না করায় ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই তার জামিন বাতিল করে ফের কারাগারে পাঠান আদালত।
এসব ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালত ও সাধারণ আদালতে মামলা হয়। এ বিষয়ে দুদক অনুসন্ধান শেষে পৃথক ৪০টি মামলা করে। এর মধ্যে ফান্ডেড মামলা ৩৮টি, আর নন-ফান্ডেড ২টি।
২০১২ সালে ফান্ডেড (সোনালী ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ) ১ হাজার ৫৬৮ কোটি ৪৯ লাখ ৩৪ হাজার ৮৭৭ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২৭ জনকে আসামি করে ১১টি মামলা এবং ২০১৩ সালে ফান্ডেড মামলায় প্রায় ৩৭২ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আরও ২৭টি মামলা দায়ের করে দুদক।
পরবর্তী সময়ে ২০১২ ও ২০১৩ সালের বিভিন্ন সময়ে ৩৫টি মামলায় চার্জশিট এবং ৩টি মামলায় এফআরটি দেয় সংস্থাটি।
চার্জশিট হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে ১১ মামলায় ২৫ জন আসামি। তবে রায়ের তারিখ ঘোষণা হওয়া মামলায় মোট আসামি ১৯ জন। তাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ, তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম, জেনারেল ম্যানেজার তুষার আহমেদ, সেনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের জিএম মীর মহিদুর রহমান, উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. সফিজউদ্দিন আহমেদ, ডিএমডি মাইনুল হক (বর্তমানে ওএসডি), এজিএম মো. কামরুল হোসেন খান (সাময়িক বরখাস্ত) ও নকশী নিটের এমডি মো. আবদুল মালেক কারাগারে।
এছাড়া জামিনে রয়েছে দুই উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) শেখ আলতাফ হোসেন (সাময়িক বরখাস্ত) ও সাভারের হেমায়েতপুরের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জামাল উদ্দিন সরকার।
পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছে-প্যারাগন গ্রুপের এমডি সাইফুল ইসলাম রাজা, সেনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের জিএম ননী গোপাল নাথ (বর্তমানে ওএসডি), প্রধান কার্যালয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন কবির, সহকারী উপমহাব্যবস্থাপক মো. সাইফুল হাসান, নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল মতিন, ম্যাক্স স্পিনিং মিলসের মালিক মীর জাকারিয়া, টি অ্যান্ড ব্রাদার্সের পরিচালক তসলিম হাসান, ডিএমডি (ওএসডি) সোনালী ব্যাংক মো. আতিকুর রহমান ও সোনালী ব্যাংক ধানমন্ডি শাখার বর্তমান জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুন্নেসা মেরি।
এ মামলায় অস্তিত্বহীন ম্যাক্স স্পিনিং মিলসের নামে প্রায় ৫২৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠে। মামলায় আদালত চার্জশিটে মোট ৮১ জন সাক্ষীর মধ্যে ৫৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেছেন।
মামলাটিতে ২০১৬ সালের ২৭ মার্চ আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জগঠন করেন আদালত।
হলমার্ক ঋণ কেলেঙ্কারির অন্যতম হোতা সোনালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হুমায়ুন কবির বিদেশে বিলাসী জীবনযাপন করছে। নিয়ম ভেঙে হলমার্ক গ্রুপকে অন্তত ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ পাইয়ে দেওয়ার ঘটনা ফাঁস হলে দুদক মামলা করে।
রায়ে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যাশা করছেন দুদকের প্রসিকিউটর মীর আহমেদ আলী সালাম।
তিনি আরও বলেন, দণ্ডবিধির ৪২০/৪০৬/৪০৯ ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং ২০১২ সালের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪(২) ধারায় অভিযোগ গঠন করেছেন আদালত। যেখানে দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারণার জন্য সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড, ৪০৬ ধারায় অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গের জন্য সর্বোচ্চ ৩ বছর ও ৪০৯ ধারায় সরকারি কর্মচারী কর্তৃক অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গের জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় সর্বোচ্চ ৭ বছর এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪(২) ধারায় সর্বোচ্চ ১২ বছর করে কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আমরা আশা করছি, আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে।