সাত বছর পর এখনও রেজিস্ট্রেশনই প্রথম চ্যালেঞ্জ

সংযোজন-বিয়োজন করে নতুন প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়। গত সাত বছর আগে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের নিয়ে গল্পের যেন শেষ নেই। লাখ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী রাতারাতি উখিয়া-টেকনাফজুড়ে অবস্থান নেওয়ায় শুরু থেকেই স্থানীয়দের সঙ্গে দ্বন্দ্ব-গল্পের ডানা মেলে। কেউ বলে, ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে রোহিঙ্গারা সাধারণের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। কেউ বলে কিছু টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জন্মনিবন্ধন পাচ্ছে। আবার জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে পাসপোর্ট পেয়ে যাওয়ার খবরও গণমাধ্যমে দেখা গেছে। অধিকারকর্মীরা বলছেন, একটা এলাকায় এত বিশাল জনগোষ্ঠীকে ঘিরে রাখলেই তারা সেখানে বছরের পর বছর থাকবেন, এমন নাও হতে পারে। তারা ছড়িয়ে পড়ে স্বাভাবিক জীবনে যাওয়ার চেষ্টা করাটা স্বাভাবিক। আর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, নিবন্ধন নিশ্চিত ও নিয়মিত মনিটরিং করা জরুরি। সেটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আর সরকারি শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশন বলছে, প্রত্যাবাসনের বিকল্প নেই। এবং রোহিঙ্গাদের সীমিত সুযোগ- সুবিধার মধ্যেই রেখে নিজ দেশে ফেরানোর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখতে হবে। এই দেশে সাধারণের মধ্যে মিশে যাওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেটা বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন

যে অভিযোগগুলো উঠেছে তার সব গল্প তেমনও না। সারা দেশে কতজন রোহিঙ্গাকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তা জানতে চেয়ে গত ১১ জুন আদেশ দেন হাইকোর্ট। আগামী ৮ আগস্টের মধ্যে এ বিষয়ে জানাতে বলা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ না দিয়েই কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলার ঈদগাঁও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল প্রকাশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করেছিলেন ওই ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা মোহাম্মদ হামিদ। তার পক্ষের আইনজীবী ছিদ্দিক উল্লাহ মিয়া জানান, ২০১৬ সাল থেকে ঈদগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ কিছু ক্ষমতাধর ব্যক্তির যোগসাজশে রোহিঙ্গাদের জাল কাগজপত্র তৈরি করে জন্মনিবন্ধন, ভোটার আইডিসহ দেশের নাগরিকত্ব দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই ইউনিয়নে অন্তত ৩৭০ জন রোহিঙ্গাকে জন্মনিবন্ধন ও ভোটার আইডি দেওয়া হয়। বেসরকারি সংস্থাগুলোর শঙ্কা—এভাবে অবৈধ পথে রোহিঙ্গারা বের হয়ে গেলে প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে গরমিল থেকেই যাবে।

উল্লেখ্য, মিয়ানমারে নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ গত প্রায় পাঁচ দশক ধরে চলে আসছে। মিয়ানমারে একটা করে ধ্বংসযজ্ঞ চলে, আর তারা প্রাণভয়ে সীমানার এপারে চলে আসার চেষ্টা করে। মানবিকতার খাতিরে তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ যেমন থাকে না, আন্তর্জাতিক চাপেও কখনও কখনও সীমানায় প্রবেশের অনুমতি দিতে হয়। বর্তমান হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ১০০ শিশুর জন্ম হয় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। তাহলে সেই হিসাবে ২০১৭ সালের পর রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যা কত?

নিবন্ধন সাইটে নিয়ম মেনে সব কাজ করেন তারা

২০১৭ সালে প্রবেশের পরপরই প্রথম কাজ ছিল পালিয়ে আসা এই মানুষগুলোর নিবন্ধন নিশ্চিত করা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাসহ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজ করতে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করছে প্রশাসন। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে বিজিবি ও সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের নিবন্ধনের এই কাজ করছিল। সেটি ব্যক্তি নিবন্ধন হলেও পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো পরিবারভিত্তিক নিবন্ধনের কাজটি করে। সেটি চলমান প্রক্রিয়া। এবং একজন রোহিঙ্গা পরিবারের এই নিবন্ধন তার অধিকার নিশ্চিতের প্রথম ধাপ। এই নিবন্ধন কার্ডের ওপর তার থাকা-খাওয়ার নিশ্চয়তা মিলবে।

ইউএনএইচসিআর-এর সর্বশেষ হিসাব বলছে, ক্যাম্পে বর্তমানে ২ লক্ষাধিক পরিবারের ৯ লাখ ৭৯ হাজার ৩০৬ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তাদের ৫২ শতাংশ শিশু, ৪৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ৪ শতাংশ বৃদ্ধ।

কোন ক্যাম্পে কতজন রয়েছে, সে হিসাব রাখা হয় প্রতিনিয়ত

ক্যাম্প ফোর এর রেজিস্ট্রেশন ক্যাম্পে সরেজমিন দেখা যায়, লম্বা লাইন, রেজিস্ট্রেশন চলছে। কারোর বয়স ১২ হলে সে নথিভুক্ত হয়, কারোর বিয়ে হলে তাকে নতুন পরিবারের নিবন্ধন নিতে হয়। আবার কারোর মৃত্যু বা জন্ম হলে পরিবারগুলোকে নিবন্ধন আপডেট করতে হয়। মোট কথা, রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর রেজিস্ট্রেশন হচ্ছে প্রথম ধাপ। এক কিশোরকে কেন এসেছেন জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আমি নিবন্ধনের পর স্মার্ট কার্ডটা নিলে আমার পড়ালেখার সুযোগ থেকে খাওয়া-দাওয়া, সব এই কার্ডের সহায়তায় করতে হবে। আমি যে একজন মানুষ, এখানে আছি, সেটার জন্য এখানে আসতে হবে এবং কার্ড বানাতে হবে—এটা আমাদের ঘরে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবকরা বলে এসেছেন এবং কবে আমার নিবন্ধনের তারিখ সেটাও বলে এসেছেন। সেই অনুযায়ী আমি কার্ড বানাতে এসেছি।

সংযোজন-বিয়োজন করে নতুন প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়

কীভাবে কাজটি হয় জানতে চাইলে ক্যাম্প ফোর রেজিস্ট্রেশন সাইটে নিবন্ধনের কাজ করছেন এমন এক কর্মকর্তা জানান, সাতটা রেজিস্ট্রেশন সাইট আছে। ক্যাম্প ফোরে ৫টা ক্যাম্পের নিবন্ধনের কাজ হয়। নিবন্ধনের ক্ষেত্রে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের অধীন ক্যাম্প-ইন-চার্জ (সিআইসি) অফিসের একটি অনুমোদনের কাগজ থাকা লাগে। নতুন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে মা ও শিশুর টিকা কার্ড, সিআইসি অফিসের জন্ম নিবন্ধন কার্ড নিয়ে সাইটে এলে তাদের পারিবারিক প্রত্যয়নপত্রে তথ্যগুলো সংযুক্ত করে দেওয়া হয়।

ক্যাম্প ফোরের রেজিস্ট্রেশন অ্যাসিসটেন্ট টুম্পা রানী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের মাঠকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিয়ে নিয়মিত আপডেট করার কাজটিতে সহায়তা করে। রোহিঙ্গা পরিবারগুলো নিয়মিত পারিবারিক সদস্য নিবন্ধন আপডেট করেন নিজেদের প্রয়োজনে। এমনকি ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম থেকেও আমরা খবর পাই—কোনও পরিবারে যদি সদস্য তার রিলিফ নিতে না আসে, বা যে সেবাগুলো তার পাওয়ার কথা, সেটা যদি গ্রহণ না করে। তখন আবারও সেই পরিবারগুলোকে নিবন্ধন ক্যাম্পে ডাকা হয়। এখন আমাদের কাছে সবার তথ্য আছে। যেটা আমরা সরকারের সঙ্গে নিয়মিত বিনিময় করে থাকি।

এরকম একটি স্মার্ট কার্ড বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেটি তাদের সব সহায়তা পেতে কাজে লাগবে

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন বিষয়ক অতিরিক্ত কমিশনার শামসুদ্দৌজা নয়ন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এত বিশাল জনগোষ্ঠীকে বছরের পর বছর এভাবে রাখতে হলে নিবন্ধন চলমান থাকতে হবে। নিয়ম করেই সেটা আপডেট করার কাজটিও করতে হবে। একটা কনক্রিট তথ্যভাণ্ডার থাকলে তবেই কে থাকলো বা কে চলে গেলো, সেই হিসাবটা স্পষ্ট থাকবে। তা না হলে স্বাভাবিকভাবেই রোহিঙ্গারা সাধারণের মধ্যে মিশে যাওয়ার শঙ্কা থাকবে।’