যশোর থেকে গত ১০ মে রাত ১১টার দিকে ছেলে শ্যারন বিশ্বাসকে সঙ্গে নিয়ে ট্রেনে করে ঢাকায় আসেন নয়ন বিশ্বাস (৫২)। পরের দিন ১১ মে ভোর সাড়ে ৫টার দিকে কমলাপুর রেল স্টেশনে নামেন তারা। এরপর শ্যারন বিশ্বাস মোহাম্মদপুরে সেন্ট জোসেফ স্কুলের ডরমেটরির উদ্দেশে রওনা দেন। আর তার বাবা নয়ন বিশ্বাস গাজীপুরে যাওয়ার বাসে ওঠার জন্য টিটিপাড়ার উদ্দেশে কমলাপুর থেকে হেঁটে রওনা দেন।
এরপর সকাল সাড়ে ৭টায় রামপুরা টেলিভিশন ভবনের বিপরীত পাশে ফুটওভার ব্রিজের কাছে অচেতন অবস্থায় নয়ন বিশ্বাসকে উদ্ধার করে পুলিশ। তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ১৪ মে বিকাল ৪টার দিকে তিনি মারা যান।
এদিকে অনেক খোঁজাখুঁজির পর বাবাকে না পেয়ে ওই দিনই ভুক্তভোগীর ছেলে শ্যারন বিশ্বাস ডিএমপির শাজাহানপুর থানায় নিখোঁজের একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে এই জিডির সূত্র ধরে পুলিশ ঘটনার ‘রহস্য’ উদঘাটন করে।
এ বিষয়ে সবুজবাগ জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার শোভন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এ ঘটনায় গত ১৫ মে অজ্ঞান পার্টির সদস্য বিশ্বজিৎ কর্মকার ও নূর মোহাম্মদকে গ্রেফতার করা হয়। আমরা তদন্ত করে দেখছি, ঘটনার দিন নিখোঁজ নয়ন বিশ্বাস মুগদা থানার টিটিপাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় স্টার লাইন বাস কাউন্টারের সামনের দোকানে এক ব্যক্তির দেওয়া সফট ড্রিংক পান করেন। পরে তারা ওই স্থান থেকে হেঁটে কমলাপুর স্টেডিয়ামের কাছ থেকে রাইদা বাসে ওঠেন। পরে চেতনানাশক মেশানো ওই পানীয় ভিকটিমের শরীরে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। একপর্যায়ে আসামি বিশ্বজিৎ কর্মকার ভিকটিমের কাছে থাকা সব ছিনিয়ে নিয়ে রামপুরায় নেমে যায়। এরপরই অচেতন অবস্থায় বাসের হেলপার ভুক্তভোগীকে বাস থেকে নামিয়ে দেয়।
এর আগে গত ২৯ জানুয়ারি বিটিএস গায়কদের বিয়ের স্বপ্ন নিয়ে রাজধানীর মেরাদিয়ার নিজ বাসা থেকে পালিয়েছিল তিন কিশোরী। নিখোঁজের পরপরই খিলগাঁও থানায় জিডি করে তাদের পরিবার। নিখোঁজের ১০ দিন পর বর্ষা আক্তার, রুবিনা আক্তার মিম ও রিজুয়ানা রিজু নামে ওই তিন কিশোরীকে গাজীপুর জেলার টঙ্গী পশ্চিম থানা এলাকা থেকে উদ্ধার করে পুলিশ।
নিখোঁজ ও গুম
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত রাজধানীর ৫০টি থানায় ৪ হাজার ৫২টি নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডি হয়। অর্থাৎ প্রতি মাসে এই সংক্রান্ত জিডি হয়েছে গড়ে ২৩৮টি।
এর মধ্যে ডিএমপি’র রমনা বিভাগে ৩৭৪টি, তেজগাঁও বিভাগে ১৬২টি, গুলশান বিভাগে ৬৩২টি, ওয়ারী বিভাগে ৮৭৫টি, লালবাগ বিভাগে ৩২৪টি, উত্তরা বিভাগে ৭৪৪টি, মিরপুর বিভাগে ৯০টি ও মতিঝিল বিভাগে ৮৫১টি।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তারা নিখোঁজ ও গুমের অভিযোগ পেয়েছে ১২৮টি।
হংকংভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের (এএইচআরসি) ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ৬২৩ ব্যক্তি গুমের শিকার হন, তাদের মধ্যে ৮৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়, জীবিত অবস্থায় ফিরে আসেন বা পরে গ্রেফতার দেখানো হয় ৩৮৩ জনকে। এখনও নিখোঁজ ১৫৩ জন।
পুলিশ কী বলছে
পুলিশ বলছে, থানায় নানা কারণে নিখোঁজের জিডি হয়। সব ঘটনা যে একই রকম তাও না। অল্প বয়সী ছেলেমেয়েরা প্রেমের কারণে ঘর থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। আবার বাড়ির কাজের মেয়েও পালিয়ে গিয়ে নিখোঁজ হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রতারকদের খপ্পরে পড়ে কিংবা অপহরণের পর খুনের মতো ঘটনাও ঘটে। নিখোঁজের যেকোনও জিডি পাওয়া মাত্র সর্বোচ্চ প্রায়োরিটি দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে কাজ করা হয় বলে দাবি পুলিশের।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (অপারেশনস) বিপ্লব কুমার সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কাউকে খুঁজে না পেলে বা কেউ হারিয়ে গেলে জিডি করা হয়। অনেক সময় কাজের লোক হারিয়ে গেলেও জিডি করেন নিয়োগদাতা। আসলে অনেকে চলে যায়। এসব নিয়ে নিখোঁজের জিডি হয়। বেশিরভাগ সময়ই নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যায়। দুই- একটি ঘটনায় দেখা গেছে, আসলে নিখোঁজ ব্যক্তি অপহরণের শিকার হয়েছেন। এছাড়া অনেকে নিজেই নিজেই চলে আসে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা উদ্ধার করে ফেলি।
তিনি বলেন, নিখোঁজের জিডি নিয়ে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে। এ বিষয়ে সরাসরি নির্দেশনাও দেওয়া আছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের শত শত জিডি হচ্ছে। কিন্তু নিখোঁজের জিডি পাওয়া মাত্রই পুলিশের কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। এ কাজটি প্রকাশ্যে অথবা অপ্রকাশ্যে দুইভাবে করা হয়।
এই কর্মকর্তা দাবি করেন, নিখোঁজের জিডি পুলিশের কাছে সর্বোচ্চ প্রায়োরিটি। কারণ, কারও নিখোঁজের ক্ষেত্রে যদি আমরা অবহেলা করি, তাহলে এর মাত্রা আরও বেড়ে যেতে পারে। অপহরণ থেকে কিলিং পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। দ্রুত রেসপন্স করতে পারলে ফলাফল ভালো পাওয়া যায়। আপনার পরিবারের কোনও সদস্যকে যদি খুঁজে না পান, কোনও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব না রেখে সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থানায় যাবেন এবং জেনারেল ডায়েরি করার অনুরোধ থাকবে।
বিশ্লেষকরা যা বলছেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রায়ই নিখোঁজের ঘটনাগুলো গণমাধ্যমের সূত্র ধরে সবার নজরে আসে। এরকম ঘটনা বিভিন্ন কারণে ঘটতে পারে। এ সংক্রান্ত মামলা গ্রহণের পর পুলিশের পক্ষ থেকে তদন্ত ও নিখোঁজের কারণ উদঘাটনসহ অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেফতার ও আইনের মুখোমুখি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিখোঁজের ঘটনা বাড়তে থাকলে অসৎ ব্যক্তিরা এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিরোধ রয়েছে— এমন ব্যক্তির ক্ষতি করার সুযোগ নেবে। আইনগত ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব হলে এ ধরনের অপরাধ ঘটার প্রবণতা বেড়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে বাংলাদেশে নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তির পরিবারের বক্তব্য আর পুলিশের বক্তব্যের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে গরমিল লক্ষণীয়। ব্যক্তিগত স্বার্থে হোক, রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে হোক, অথবা অন্য যেকোনও কারণে নিখোঁজের মতো ঘটনা ঘটলে তা উদঘাটনসহ অপহৃত ব্যক্তিকে উদ্ধার, পরিবারকে আইনি সহায়তা এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে মামলা পরিচালনা ও দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে আইনের প্রতি আস্থা ও নাগরিক দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এর ব্যতিক্রম যত হবে, নিখোঁজ বা অপহরণসহ এ ধরনের অপরাধের সংখ্যা তত বাড়বে।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ফৌজদারি ও দণ্ডবিধি— এ দুটি আইনে যখন কোনও মানুষ নিখোঁজ হন, তখন সাধারণ মানুষ সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের কাছে যায় এবং পুলিশকে জানায়, জিডি করে। জিডি করার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের উচিত বিষয়টি আমলে নিয়ে তদন্ত করা, পদক্ষেপ নেওয়া। কিন্তু আমরা যেটি দেখতে পেয়েছি— নিখোঁজ হচ্ছে, জিডি করেছে। কিন্তু সেগুলোর কোনও কার্যকারিতা না থাকায় পরে ভিকটিমদের বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, অথবা কোথাও অপহরণের শিকার হয়েছে। মানুষ নিখোঁজ হওয়া ভয়ংকর ঘটনা। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আপনি নিখোঁজ হয়ে যাবেন, বা সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে আপনাকে তুলে নিয়ে যাবে, সেটা হয় না। কেউ যদি অপরাধ করে, পুলিশ যদি সন্দেহভাজন কাউকে গ্রেফতার করতে চায়, তাহলে সেক্ষেত্রে নিয়ম আছে। কী কারণে গ্রেফতার করা হচ্ছে ওই ব্যক্তির পরিবারের লোকজনের কাছে তা স্পষ্ট করতে হবে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে আদালতে তুলতে হবে।’
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে নিখোঁজের জিডি হচ্ছে। তবে এসব জিডি হওয়ার পর ফলোআপ কেমন হচ্ছে, সেটি দেখার বিষয়। নিখোঁজের ক্ষেত্রে ইউনিফর্ম ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নামে সাদা পোশাকে যদি কাউকে তুলে নিতে আসে, তখন কিন্তু তার পরিবারের লোকজন বুঝতে পারে না আসলেই তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক কিনা। যদি বুঝতে পারতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক কেউ তুলে নিচ্ছে কিনা, তাহলে থানায় কিংবা সংশ্লিষ্ট জায়গায় যোগাযোগ করে ঘটনা বা কারণ জানা সহজ হয়ে যায়। ধরে নিয়ে যাওয়ার পর কারা নিয়েছে সেটি আইডেন্টিটিফাই না করতে পারলে সন্দেহ তৈরি হয়। তারা তখন চিন্তা করে দুষ্কৃতকারী ধরলো নাকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ। এটা নিয়ে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। আর পর্যাপ্ত তথ্য থাকলে, কেন ধরে নিয়ে যাছে তার বিরুদ্ধে কোনও মামলা থাকলে ,সেটা ক্লিয়ার করা হলে এমন বিভ্রান্তিকর পরিস্থতি তৈরি হয় না।