প্রতিটি সরকারি মসজিদে এবং যেসব মসজিদে সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রী, বিচারপতি বা বিচারকরা নামাজ পড়েন; সেসব মসজিদে জুমার নামাজের পূর্বে দুর্নীতিবিরোধী বয়ান (খুৎবা) চালুর করার অনুরোধ জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ।
শনিবার (৩ আগস্ট) সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনে ‘দুর্নীতি প্রতিরোধে আইন সাংবাদিকতা’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিচারপতি হাসান আরিফ এ কথা বলেন। আইন, বিচার ও মানবাধিকার বিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ল’ রিপোর্টার্স ফোরাম (এলআরএফ) এ কর্মশালার আয়োজন করে।
বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ বলেন, ‘ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের অনুরোধ করবো যেন— প্রতিটি সরকারি মসজিদে এবং যেসব মসজিদে সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রী, বিচারপতি বা বিচারকরা নামাজ পড়েন; সেসব মসজিদের খতিবদের কাছে সার্কুলার পাঠান যেন বয়ানের সময় তারাা দুর্নীতি সম্পর্কে বক্তব্য দেন। প্রধান বিচারপতির কাছে অনুরোধ, সুপ্রিম কোর্টে নিয়ন্ত্রণাধীন যত মসজিদ আছে, অধস্তন আদালতে জেলা জজদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত মসজিদের ইমাম ও খতিবদের কাছে সার্কুলার পাঠানো হোক যাতে অন্যান্য বয়ানের সাথে দুর্নীতি নিয়ে বয়ান করা হয়।’
দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শুধু অর্থের দুর্নীতিই দুর্নীতি নয়, মামলায় রায় দিয়ে কোন পক্ষের কাছ থেকে সুবিধা নেওয়াও দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে। দুর্নীতি নিয়ে যখন কথা বলবেন (গণমাধ্যমকর্মীরা) তখন শুধু টাকার দুর্নীতিই নয়, সুবিধা নেওয়ারও দুর্নীতিও সামনে তুলে ধরতে হবে। শুধু অর্থের দুর্নীতিই দুর্নীতি নয়, অর্থ ছাড়াও অনেক রকমের দুর্নীতি রয়েছে। দুর্নীতি নিয়ে আমাদের পুরো দৃষ্টিভঙ্গি থাকে টাকা নিয়ে রায় দিয়েছে কিনা, মামলার কার্যতালিকার উপরের দিকে এসেছে কিনা। এর বাইরেও যে কত রকমের দুর্নীতি আছে সেটা জানতে হবে। দন্ডবিধির ১৬১ ধারায় উদাহরণটা দিয়েছে এরকম যে, একজন মুন্সেফ একজন ব্যাংকারকে বলছে তোমার কাজটি (আমার কাছে যে মামলা আছে) আমি করে দেবো, তবে তুমি আমার ছোট ভাইকে তোমার ব্যাংকে একটা চাকরি দিও। এখানে টাকার কোনও লেনদেন নাই। মুন্সেফ তার ভাইয়ের জন্য একটা বেনিফিট নিচ্ছেন এভাবে। অর্থাৎ ভাইকে চাকরি পাইয়ে দিয়ে তার বিনিময়ে একটা নির্দিষ্ট পথে চাকরিদাতাকে রায় দিয়ে দিচ্ছে।’
হাইকোর্ট বিভাগে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ আরও বলেন, ‘আমাদের (বিচারক) স্পষ্ট আচরণবিধিমালা আছে। কিন্তু এর কোনও প্রয়োগ নেই। সাবেক প্রধান বিচারপতি মো. লতিফুর রহমান আচরণ বিধিমালা করেছিলেন। কোথাও যেতে বা তদবির করতে (বিচারপতিরা) পারবো, কী পারবো না। এগুলো অনেকেই কেয়ার’স (মেনে) করেন। কিন্তু একটা ভালো অংশই আছে, যারা এটা মেনেই চলেন না। তারা হরদম তদবিরবাজিতে থাকেন, হরদম ক্ষমতার অপব্যবহার করে তদবিরবাজি করেন। সংবিধান ও আইন আমার উপর একটা ক্ষমতা অর্পণ করেছে আমি সেই ক্ষমতাকে অপব্যবহার করছি আমার বেনিফিটের জন্য, আমার আত্মীয়-স্বজনদের বেনিফিটের জন্য, এটাই হলো দুর্নীতি।
বিচারপতি হাসান আরিফ বলেন, ‘একজন জজের কাজ কি তদবির করা! অমুকের চাকরি নাই, তাকে চাকরি দেন, পদোন্নতি পাচ্ছে না তাকে পদোন্নতি দিয়ে দেন। এর বিনিময়ে ওই লোককে কোনও মামলায় সুবিধা পাইয়ে দেওয়াটাও বড় ধরনের দুর্নীতি। এ ধরনের দুর্নীতি অপ্রকাশিতই থেকে যায়।’
বিচারপতি হাসান আরিফ বলেন, ‘হাইকোর্ট বিভাগে জুরিসপ্রুডেন্স ডেভেলপমেন্ট করার ক্ষেত্রে আমাদের প্রচুর সীমাবদ্ধতা আছে। ১০ বিচারকের মামলায় বিচারপতি আব্দুর রশিদ যে রায় দিয়েছিলেন, সেটা একটা চমৎকার জুরিসপ্রুডেন্স ডেভেলপ করেছিল। এটা এখন নাই। আমাদের জুরিসপ্রুডেন্সের বর্তমান যে অবস্থা এক হাত আছে তো আরেক হাত নাই।’
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান বলেন, হুন্ডির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংককে পদক্ষেপ নিতে হবে। যাতে প্রবাসীর স্বজনরা দেশে দ্রুত ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পান। সেটা না করে হুন্ডির বিরুদ্ধে লড়ার সুযোগ নাই। কারণ হুন্ডির মাধ্যমে স্বজনরা এক ঘণ্টার মধ্যে দেশে বসে টাকা পেয়ে যাচ্ছে। সেখানে ব্যাংকিং চ্যানেলে লাগছে অনেক সময়। এ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি পদ্ধতি বের করতে হবে। বিএফআইইউকে হুন্ডি প্রতিরোধে লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়াতে হবে।’
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন এলআরএফ সভাপতি মাসউদুর রহমান রানা। সঞ্চালনরায় ছিলেন সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। বক্তব্য শেষে অংশগ্রহনকারীদের হাতে সার্টিফিকেট তুলে দেন প্রধান অতিথি।