সাম্প্রদায়িক হামলাসহ সব ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। দেশের চলমান পরিস্থিতিতে আজ মঙ্গলবার (৬ আগস্ট) দুপুর ১২টায় শাহবাগ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা চত্বরে একটি প্রতিবাদী মিছিল করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। মিছিল শেষে এক বিবৃতিতে এই আহ্বান জানায়।
বিবৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক জানায়, একটি চরম নিপীড়নমূলক ও ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে জুলাই মাসের প্রথম থেকে বাংলাদেশের আপামর শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করে। বৈষম্যের পরিবর্তে সাম্যের দাবি তোলায় তাদের শিকার হতে হয় নির্মম জুলাই হত্যাকাণ্ডের। সরকারি হিসাবে ৩০০ জনের বেশি এবং বেসরকারি হিসেবে এক হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী, শিশু থেকে বৃদ্ধ, পুরুষ ও নারী এবং সব শ্রেণি-পেশার নাগরিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনগুলোর গুন্ডাদের হাতে নৃশংস ও নারকীয় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ক্রমবর্ধমান নিপীড়ন-নির্যাতন-খুনের মুখে আর স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা ও অনুসারীদের হিংস্র গোয়ার্তুমি, প্রতিশোধপরায়নতা এবং অব্যাহত হামলার প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষার্থী আন্দোলন একটি গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয়। পরিণামে শিক্ষার্থী-নাগরিকদের অবিস্মরণীয় বিদ্রোহের মুখে গতকাল জুলাই-হত্যাকাণ্ডের মূল নির্দেশদাতা, ফ্যাসিস্ট এবং স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। দীর্ঘ ও ভয়াবহ নিপীড়নমূলক স্বৈরশাসন থেকে এই মুক্তি অর্জনের জন্য তাই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক (ইউটিএন) বাংলাদেশের শিক্ষার্থীবৃন্দসহ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব মুক্তিকামী জনতাকে উষ্ণ অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছে।
এতে আরও বলা হয়, তবে আমরা মনে করি, নিপীড়নমূলক ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে এই মুক্তি অর্জন রাষ্ট্রকে মেরামত করে একটি গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী, অসাম্প্রদায়িক, সাম্য ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকারী রাষ্ট্রে রূপান্তরের কঠিন পথ আমাদের সামনে। মুক্তি এখনও অর্জিত হয়নি। ১৯ জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সন্ধ্যা থেকে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার শর্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীকে মাঠে মোতায়েন করে। তারপরও পরিস্থিতির ক্রমাবনতি হতে থাকে এবং গত রবিবার (৪ অগাস্ট) সারা দেশে সর্বোচ্চ সংখ্যক (অফিসিয়াল হিসাবে ১০২ জনের বেশি) মানুষ নিহত হয়। অনির্দিষ্টকালের কারফিউ জারি এবং তিন দিনের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। যদিও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সরকারের এই ঘোষণা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে (৫ আগস্ট) ‘ঢাকা মার্চ’ এর ডাক দেয়। লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও নাগরিকের সমাবেশ ও বিদ্রোহের মুখে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং বিদেশে পালিয়ে যান।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের বিবৃতিতে বলা হয়, এই সংকটময় মুহূর্তে আমরা বিষ্মিত হয়ে ঢাকা শহরসহ সারা দেশে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুপস্থিতি আর চেইন অব কমান্ডের পুরোপুরি অনুপস্থিতি লক্ষ্য করি। এই সুযোগে দুষ্কৃতিকারীরা ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, লুটতরাজ চালানো শুরু করে। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙ্গচুর, লুটপাট, থানা জ্বালিয়ে দেওয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা চত্বরের এবং বিখ্যাত ঐতিহ্য ময়মনসিংহের শশীলজসহ নির্বিচার ভাঙ্গচুর, ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর হামলা, তাদের সম্পত্তি লুটপাট ও পোড়ানো শুরু হয়। একইসঙ্গে সন্ধ্যা থেকে খবর আসতে থাকে যে কিছু স্থানে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু ও তাদের বাসাবাড়িতে, ধর্মস্থানে ওপর হামলা লুটপাট অব্যাহত রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের দফতরে ও মিডিয়া কর্মীদের ওপরও হামলা হয়েছে। বহু হামলার খবর মিডিয়ায় পরিবেশিত হয়নি এখনও। থানায় থানায় ক্ষিপ্ত জনতা পুলিশের ওপর হামলা করছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের ওপর হামলা করছেন। নৃশংস সব মৃত্যুর খবর আমাদের কাছে নিয়মিত আসছে। আমরা সেনাবাহিনীকে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ার আগেই পেশাগত কর্তব্য পালনের আহ্বান জানাই।
এতে আরও বলা হয়, আমরা চাই অতি দ্রুত একটি সুস্থ সভ্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা দেশে চালু হবে। আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক বৈষম্যহীন বাংলাদেশ দেখতে চাই যেখানে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি। যেকোনও ধরনের সন্ত্রাস একযোগে রুখে দিতেও আমরা বদ্ধপরিকর। পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রাখা হবে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম লক্ষ্য। তাই ছাত্র-জনতার এই অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানকে কেউ কালিমালিপ্ত করতে না পারে সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। উল্লাস-উচ্ছ্বাস যাতে কোনোরকম প্রতিহিংসার জন্ম না দেয় সেদিকে দায়িত্বশীল নাগরিকদের সজাগ থাকতে হবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে, আমরা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীসহ বাংলাদেশের আপামর জনগণের কাছে নিম্নোক্ত বিষয় বা ঘটনাবলী সম্পর্কে উদ্বেগ পেশ করছি-
১। বাংলাদেশ বর্তমানে কার শাসনে, কোন বিধি অনুসারে চলছে? সেনাপ্রধানের, নাকি প্রেসিডেন্টের, নাকি স্পিকারের তত্ত্বাবধানে মন্ত্রীসভার অধীনে? ছাত্ররা অসহযোগের ডাক দিয়েছে। তাহলে তাদের বাদ দিয়ে আইএসপিআর কোনও ক্ষমতাবলে সব কিছু খোলার ডাক দিলো?
২। গণভবন, বিভিন পুলিশ থানা সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা সুরক্ষায় পুলিশের উপস্থিতি নেই কেন? পুলিশের অবর্তমানে সেনাবাহিনী সুরক্ষা প্রদানে ব্যর্থ হলো কেন?
৩। কোন আইনের বলে এবং কোন কোন মানদণ্ডের আলোকে রাজনৈতিক নেতাদের বঙ্গভবনে সেনাবাহিনী প্রধানের সঙ্গে দেখা করার জন্য মনোনীত বা নির্বাচিত করা হলো?
৪। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে সুরক্ষা প্রদানে এবং চলমান সব ধরনের সহিংসতা বন্ধে কোনও ধরনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না কেন? এমন পদক্ষেপ এখন কে নেবে- রাষ্ট্রপতি নাকি সেনাবাহিনী?
৫। সেনাবাহিনীর কাজ হলো গণ-অভ্যুত্থানকে নিরাপত্তা প্রদান করা এবং গণ-অভ্যুত্থানকারীদের এখনকার কাজ হলো বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা। এটা নিয়ে আলাপ না করে সেনাবাহিনী বা সেনাবাহিনী সমর্থিত সরকার সংক্রান্ত আলাপ জনপরিসরে উঠছে কেন? কারা এই ধরনের আলাপ তুলছে?
৬। সর্বোপরি, গণ-অভ্যুত্থান সফল করা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন শ্রমজীবী ও পেশাজীবী শ্রেণি, সিভিল প্রশাসন, এবং মিলিটারি প্রশাসনের সমন্বিত আলাপ ও আলোচনা না শুরু না করে বঙ্গভবনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ করার মাধ্যমে জনগণকে কী বার্তা দেওয়া হচ্ছে?
পরিশেষে এই গণ-আন্দোলনের জন্য যারা তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন সেসব শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। অতি দ্রুত দেশের জনগণের সুরক্ষা এবং সহিংসতা বন্ধের জন্যও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাই। এবং অবিলম্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে এর পরবর্তীতে একটি সংবিধান সভা গঠিত করে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে এর আলোকে একটি অবাধ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি আমরা করছি।