দূষণের শিকার সুন্দরবন সুরক্ষিত করবে কে?

২০১৪ সালে সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে তেলবাহী জাহাজ ডুবে যাওয়ার ঘটনায় সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর ও বন বিভাগের পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয়, ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ এবং আইএসও-৭৫-এর যেসব ধারা লঙ্ঘনের কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে, তা শনাক্তকরণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা কীভাবে রোধ করা যায়, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দিতে বলা হয়। সেসময় পরিদর্শনে এসে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ দলও বেশ কিছু সুপারিশ করেছিল। সুন্দরবনের পরিবেশকে ‘মহামূল্যবান’ এবং ‘বৈচিত্র্যপূর্ণ’ উল্লেখ করে এর মধ্য দিয়ে নৌ-চলাচল বন্ধের সুপারিশ করেন তারা।

শ্যালা নদীতে নৌ-চলাচল বন্ধ হলেও এখন বাংলাদেশ-ভারত নৌ প্রটোকলের যে চ্যানেল, সেখানে চলাচল বন্ধ হয়নি। এ বিষয়ে সে সময়ের নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছিলেন, ‘সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায় ওই চ্যানেল ভবিষ্যতে বন্ধ করা হবে। তবে এখন করা যাচ্ছে না। কারণ এতে ভারতে সঙ্গে আমাদের নৌ-যোগাযোগ বন্ধ হবে। এ জন্য এখন বন্ধ করা যাচ্ছে না।’

ওই ঘটনায় জাহাজ দুটির মালিকের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা করেছিল বন বিভাগ। মামলার ফলাফল ও অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা অনেক দিন আগের ঘটনা, আপডেট আমার জানা নেই।’ এরপরের ঘটনাগুলো নিয়ে কয়েকটি তদন্ত কমিটি হয়েছে এবং সেসব প্রতিবেদনের কী পরিস্থিতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পশুর নদীর চ্যানেল থেকে মোংলা পোর্ট পর্যন্ত বাকিটা বিআইডব্লিউটিএ’র। তারা এ বিষয়ে জানাতে পারবে।’ দুর্ঘটনার কারণে বনের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ে প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সব দুর্ঘটনা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে তা নয়। তেল ট্যাংকারের ঘটনায় প্রভাবটা খুব বড় ছিল। ফ্লাইঅ্যাশ, কয়লাসহ জাহাজডুবির ঘটনায় কী পরিমাণ ক্ষতি হয়, তা নিয়ে তেমন গবেষণা করা হয়নি।’

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের দাবি আছে এখনও

প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ-খ্যাত সুন্দরবন প্রতিনিয়ত হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে মানবসৃষ্ট নানা কর্মকাণ্ডের কারণে। ‘সুন্দরবন বাঁচাও আন্দোলন’-এর অন্যতম অ্যাক্টিভিস্ট কল্লোল মোস্তফা সরকার পরিবর্তনের পর সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের দাবি জানিয়ে লেখেন, ‘রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করেন। যত বেশি দিন চালু থাকবে, তত বেশি ক্ষতি হবে সুন্দরবনের। রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে সেখানে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেন।’

সুন্দরবন দূষণের অন্যতম উৎস হিসেবে রামপাল পাওয়ারপ্ল্যান্ট ও অপরিকল্পিত শিল্পায়নকেই দায়ী করেন গবেষকরা। রামপাল পাওয়ারপ্ল্যান্ট সুন্দরবনের মাত্র ১৪ কিলোমিটার উত্তরে পশুর নদের কোলঘেঁষে নির্মিত বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ প্রকল্প। অ্যাক্টিভিস্ট, গবেষক ও সুশীল সমাজের বাধার মুখে ২০১০ সালে এই প্রকল্প শুরু হয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর এক প্রতিবেদনে পরিবেশের সম্ভাব্য ক্ষতি বিবেচনায় এনে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করতে বলা হয়।

গবেষকরা বলছেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে টারবাইন, জেনারেটর, কম্প্রেসার, পাম্প, কুলিং টাওয়ার, কয়লা পরিবহন, ওঠানো-নামানো ইত্যাদি কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও যানবাহন থেকে একদিকে প্রকট শব্দদূষণ হচ্ছে। অপরদিকে নির্মাণ ও পরিচালনার কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নদীপথে পরিবহন করার ফলে বাড়তি নৌযান চলাচল, তেল নিঃসরণ, বর্জ্য নিঃসরণের কারণে সুন্দরবনের ইকোসিস্টেমে প্রভাব পড়ছে।

এই দুর্ঘটনা কতটা আমলে এলো

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি পশুর নদীর কানাইনগর এলাকায় ‘এমভি ইশারা মাহমুদ’ নামে কয়লাবাহী একটি কার্গো জাহাজের তলা ফেটে যায়। ৯৫০ টন কয়লা বোঝাই এই জাহাজ ডুবোচরে ধাক্কা লেগে ফেটে যায়। এমন জাহাজডুবির ঘটনা নতুন নয়।  ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর পশুর নদের চরকানা এলাকায় ৮০০ টন কয়লা নিয়ে তলা ফেটে ডুবে গিয়েছিল আরেকটি কার্গো জাহাজ। একই বছরের ১৫ অক্টোবর মোংলায় পশুর নদে ৮০০ টন ক্লিংকার (সিমেন্টের কাঁচামাল) নিয়ে একটি লাইটার জাহাজ ডুবে। ২০২১ সালের ৩০ মার্চ পশুর নদীতে ৪০০ টন কয়লা বোঝাই কার্গো জাহাজ ডুবে যায়। ২০১৮ সালের ১৫ এপ্রিল ৭৭৫ মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে একটি জাহাজ মোংলা বন্দর এলাকায় ডুবে যায়। ২০১৭ সালের ১৪ জানুয়ারি এক হাজার মেট্রিক টন কয়লাবাহী এমভি আইচগাতি লাইটার জাহাজ ডুবে। ২০১৫ সালের ২৯ অক্টোবর ৫১০ মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে এমভি জিআর রাজ সুন্দরবনের পশুর নদীতে ডুবে যায়। ২০১৫ সালের ৩ মে ৫০০ মেট্রিক টন এমওপি সার নিয়ে একটি জাহাজ ডুবে, ২০১৪ সালের ১০ ডিসেম্বর পূর্ব সুন্দরবনের জয়মনির ঘোল এলাকায় শ্যালা নদীতে ডুবে যায় তেলবাহী জাহাজ ওটি সাউদার্ন স্টার।

আগুনের উৎস নিয়ে সন্দেহ

বনের আগুনের কারণ চিহ্নিত করা জরুরি উল্লেখ করে গবেষকরা বলছেন, কিছু হলেই বনের মানুষ অসতর্কতাবশত আগুন ফেলে দেওয়ায় বন পুড়ে যায় বলা হয়ে থাকে। গবেষণা বলছে, বনের আগুন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট হতে পারে। প্রাকৃতিক বনের আগুনের সবচেয়ে বড় কারণ হলো—বজ্রপাত থেকে শুকনো গাছপালায় আগুন লাগে। তাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, এই অগ্নিকাণ্ডগুলো বেশিরভাগই মানুষের উপস্থিতি থেকে দূরবর্তী স্থানে ঘটে। গাফিলতির কারণে যে অগ্নিসংযোগ ঘটে, তার প্রকৃত শাস্তি হলে আগুনের সংখ্যা কমবে। বনের মধ্যে ক্যাম্প ফায়ার, রান্না, উষ্ণতা, আগুন বন্ধ করতে হবে, সিগারেট, সিগার, পাইপ এবং তামাক, আলো জ্বালানোর জন্য ব্যবহৃত ম্যাচ বা লাইটার ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে হবে ও সতর্ক থাকতে হবে।

পশুর নদে কয়লা ভর্তি ডুবন্ত জাহাজ (ফাইল ফটো)

সুন্দরবন রক্ষায় এত গাফলতি কেন প্রশ্নে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সুন্দরবন ধ্বংস হলে আরেকটা বানিয়ে নেওয়া যাবে, আমাদের ক্ষমতাসীনদের এরকম একটা ধারণা কাজ করে। কিন্তু সুন্দরবন যে কেবল জঙ্গল না, নীতিনির্ধারকরা এটা না বুঝলে কে বুঝবে? কারোর কথা না শুনে রামপাল চালু করা হলো। এখন চালু যেহেতু হয়েছে, কয়লা নিয়ে আসবেন। সেটা তো আর আকাশপথে আনা যাবে না। আনতে গিয়ে একের পর এক কার্গোডুবি হচ্ছে, দূষণ হচ্ছে। সুন্দরবন রক্ষা করবেন কীভাবে? সুন্দরবনের সব নদী শুকিয়ে গেছে। ফারাক্কা থেকে পানি আনতে না পারলে এটা বাঁচানোর পথ নেই।’

সুন্দরবন সুরক্ষিত আছে উল্লেখ করে পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) কাজী নুরুল করিম বলেন, ‘আগুনের অনেক উৎস থাকতে পারে। সুন্দরবনের ভেতরে গিয়ে বনজীবীরা বিড়ি-সিগারেটের আগুন নেভায় না, আবহাওয়া তপ্ত, সব মিলিয়ে অনেক সময় আগুন লাগে। এসব প্রতিরোধে আমরা কাজ করছি। আমরা বনজীবী ও স্থানীয়দের সচেতন করেছি। সচেতনতামূলক কার্যক্রম এখনও অব্যাহত রয়েছে।’