বাংলাদেশ সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ও হাইকোর্টের আইনজীবী ড. কামাল হোসেন বলেছেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত অধিকার নিয়ে সংবিধান রচনা করেছিলাম, যেখানে এবারের আন্দোলন আবারও বৈষম্য নিরসনের বিষয়ে সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার কোনও সুযোগ যাতে না থাকে, সেই আলোকে সংবিধানের সংশোধনীর সুপারিশ তৈরি করতে হবে।
সোমবার (১০ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে 'আবুল মনসুর আহমেদের সংবিধান চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা' শীর্ষক আলোচনা সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আবুল মনসুর আহমেদ স্মৃতি পরিষদ আলোচনা সভার আয়োজন করে।
ড. কামাল আহমেদ বলেন, আবুল মনসুর আহমেদ কখনোই সংবিধানকে একটি নিশ্চল দলিল হিসেবে দেখেননি। তিনি একে একটি গতিশীল পথপ্রদর্শক হিসেবে বিবেচনা করেছেন, যা সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তন ও পরিমার্জনের দাবি রাখে। আজ আমরা যে সংবিধানের সংশোধন নিয়ে আলোচনা করছি, তা আবুল মনসুরের এই চিন্তারই প্রতিফলন।
আমাদের দায়িত্ব হলো, সংবিধানকে এমনভাবে সংশোধন করা এবং চর্চা করা, যাতে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না হয়। আমরা যেন এই শিক্ষাগুলোকে আমাদের সংবিধানের মূল কাঠামোতে গেঁথে দিতে পারি, যাতে কোনও নাগরিকের সঙ্গে অন্যায়-অবিচার আবার না ঘটে। এটাই হবে আমাদের সংবিধানের সত্যিকারের পরীক্ষা।
এ সময় তিনি আরও বলেন, গণতন্ত্রের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা করতে হবে, মৌলিক অধিকারের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি কীভাবে মৌলিক অধিকারের ক্ষুণ্নতা একটি জাতিকে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এ জন্যই আমাদের সংবিধানে মৌলিক অধিকারগুলোকে আরও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে এবং এই অধিকারগুলো রক্ষার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা রাখতে হবে।
সহজবোধ্য ভাষায় সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার গুরুত্বের দিয়েছিলেন, সেটিও নতুন সংবিধানে নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ফৌজদারি আইনের মানহানি বা রাষ্ট্রদ্রোহের মতো যে অপরাধগুলো গণমাধ্যমের স্বাধীনতার এবং সবার মত প্রকাশের জন্য প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে, সেগুলোকেও বাতিল করতে হবে।
ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথককরণ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের ওপর গুরুত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন,বিষয়টির বিরোধিতা এককক্ষ বিশিষ্ট সংসদের পক্ষপাতী ছিলেন আবুল মনসুর। তিনি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টকে অপ্রয়োজনীয় ও ব্যয়বহুল মনে করতেন। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে, এখন এমন একটি সময় এসেছে, যখন আমরা দ্বিতীয় কক্ষের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে পারি। এটি করা গেলে সরকার পরিচালনায়, বাংলাদেশের পেশাজীবী ও নাগরিকদের বিভিন্ন অংশ সরাসরি অবদান রাখার পথ খুলে দেবে। আমাদের বিচার বিভাগের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে হবে।
এ সময় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সেন্টার ফর পার্লামেন্ট স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ড. জালাল ফিরোজ, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা, লেখক ড. জাহেদ উর রহমান, লেখক সারোয়ার তুষার।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে সংবিধান বিশেষজ্ঞ আরিফ খান বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা ফ্যাসিস্টের বিদায় করেছি, এটিই শেষ কথা নয়। এটিকে অর্থবহ করতে ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক ফ্রেমিং তৈরি করতে হবে। পৃথিবীর ইতিহাসে যতগুলো সংবিধান তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে মাহাত্ম্যের সঙ্গে টিকে আছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান। কারণ সংবিধান বানানো সহজ কিন্তু টিকিয়ে রাখা কঠিন। পৃথিবীতে সংবিধানের গড় বয়স ১১ বছর। এখানে আমাদের সংবিধান ৫৩ বছর ধরে টিকে আছে। এ জন্য আমাদের সংবিধান একটা ধন্যবাদ পেতেই পারে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সংবিধান সংশোধন বা নতুন করে তৈরির প্রস্তাব নিয়ে তিনি বলেন, যেসব প্রস্তাব এসেছে, কোনোটিই অভিনব নয়, যা আমরা অতীতে কোনো না কোনোভাবে পরীক্ষিত হয়নি বা করিনি।
সংবিধান সংশোধনের কিছু প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, এক নাগাড়ে দুবার প্রধানমন্ত্রী হওয়া যাবে না, এটির প্রয়োজন রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। তবে সেটা রাষ্ট্রপতির সাথে ভাগাভাগি করে নয়। ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োজন রয়েছে, তবে যেভাবে এটি রাখা হচ্ছে, সেটি নিয়ে ভাবতে হবে। ন্যায়পাল নিয়োগের বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে, নির্বাচন কমিশনকে আলাদা করে দিতে হবে।
সারোয়ার তুষার বলেন, পরপর দুবার নয় আমাদের বক্তব্য দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে না। সংবিধানের মূলনীতিগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র ছাড়া বাকিগুলো সরকারি মূলনীতি, এগুলো সংবিধানে লেখার প্রয়োজন নেই। নিরংকুশ গণতন্ত্র এলে বাকিগুলো এমনিতেই আসবে।
আরিফ খানের নতুন প্রজন্ম সংবিধান না পড়ে সমালোচনা করে তুষার বলেন বলেন, সংবিধান পড়ি না বলে আমাদের ছোট করা হয়, আমরা আইনের ছাত্র না হলেও আমরা আইন পলিটিক্যালি পড়ি। বাহাত্তরের সংবিধান শ্রেষ্ঠ সংবিধান এটা বলে লাভ নাই। হ্যাঁ, এটা ভালো সংবিধান। কিন্তু এটি নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। আমাদের সংবিধান প্রিয়েম্বেল আছে, সেটা আমরা রেখে দিতে চাই, এটা আমাদের অর্জন। কিন্তু পরবর্তী যতটুকু অংশ আছে, সেখানে আমাদের নিয়ে যাবেন না, আমরা সেখানে ফিরে যেতে চাই না।
সংবিধানে ইংরেজির শব্দের পরিভাষা ব্যবহার করে দুর্বোধ্য করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, আবুল মনসুর আহমেদ বলেছিলেন, এটির জন্য আমাদের বেগ পেতে হবে। সেটি আমরা চার প্রজন্ম ধরে পাচ্ছি। আমরা না পড়ে কথা বলছি, সংবিধান নিয়ে সেটা বলার আগে দেখবেন আমরা ভুলভাবে পড়ছি কিনা এবং সেটা ইচ্ছাকৃত কিনা।
দেশের জনগণের ওপর আস্থা রাখতে হবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, সংবিধান বোঝে না এমন ধারণা জনগণের ওপর অবিশ্বাসের কাছ থেকে আসে। যারা রক্ত দিয়ে একটা দেশ তৈরি করেছে, তারা সংবিধান তৈরি করতে পারবেন না, এটা তো হয় না। আপনার জনগণের ওপর বিশ্বাস করতে রাখতে হবে।
আলোচকরা বলেন, ৭০ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে আপনি বলে দিলেন এই দেশে কোনো সংসদ নেই। সংবিধান পুনর্লিখন করি বা সংশোধন করি, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবিধানের ঠিকঠাক প্রয়োগ হচ্ছে কিনা। স্বৈরাচার তৈরি হয় মূলত নিজে যা ভাবছি তা অন্যের ওপর চালিয়ে দেওয়া। আমরা যা ভাবছি তা যেন জনগণের মতো বলে চালিয়ে না দিই। সেটি নিয়েও ভাবতে হবে।