সরকারের পটপরিবর্তনের পর মেয়র-কাউন্সিলরদের বেশিরভাগই ‘আত্মগোপনে’ যান। তাদের অনুপস্থিতিতে এক রকম মুখথুবড়ে পড়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রায় সব কার্যক্রম। পরে প্রশাসক নিয়োগ দিলে একে একে চালু হয় বিভিন্ন সেবা। বিভিন্ন এলাকায় নর্দমা ও খাল পরিষ্কার, মশক নিধন, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়। তবে ছোটো-বড় বিভিন্ন রাস্তায় তৈরি হওয়া খানাখন্দ ঠিক করার উদ্যোগ নেই এখনও। কয়েকটি এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, মশা বেড়েছে। সঙ্গে এলাকার পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে না ঠিকমতো।
আগস্টে দেশের সব সিটি করপোরেশনে মেয়রদের অনুপস্থিতির কথা উল্লেখ করে তাদের অপসারণ করা হয়। মেয়রদের জায়গায় প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। ১৯ আগস্ট স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এরই ধারাহিকতায় ডিএসসিসির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রশাসক ড. মুহ. শের আলীকে।
দায়িত্ব নেওয়ার পরদিন থেকেই সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম গতিশীল করার আশ্বাস দেন প্রশাসক। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে যে সেবাগুলো দেওয়া হতো সেগুলোও অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন। ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডের যেসব কাউন্সিলরদের অফিস ভেঙে ফেলা হয়েছে সেগুলো ঠিক করে আবারও নাগরিক সেবাদান কার্যক্রমকে সচল করার কথা বলেন। কিন্তু তখন পর্যন্ত নাগরিক সেবা দেওয়ার ক্ষমতা প্রশাসকের কাছে ছিল না।
ফলে মেয়রের অনুপস্থিতিতে সিটি করপোরেশনের সেবামূলক, উন্নয়নমূলক প্রকল্পসহ সব কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। এর মধ্যেই গত ২৫ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের আরেক প্রজ্ঞাপনে ডিএসসিসির প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান নজরুল ইসলাম। এরপরও স্থবির ছিল সিটি করপোরেশনের প্রায় সব নাগরিক সেবা কার্যক্রম। বিশেষ করে জন্ম সনদ-মৃত্যু সনদ সেবা, ওয়ারিশান সনদ, নিয়মিত মশক নিধন কর্মসূচি, মাতৃসনদ, পারিবারিক সনদসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও সেবামূলক কার্যক্রম।
যা বলছেন নাগরিকরা
পুরান ঢাকার ৪১ নম্বর ওয়ার্ডভুক্ত দক্ষিণ মহুসেন্দীর বাসিন্দা মোজাম্মেল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পারিবারিক কলহ বা পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যকার বিভিন্ন বিরোধ-ঝামেলা নিয়ে আগে প্রতিদিন কাউন্সিলরের কার্যালয়ে যেতো মানুষ। কিন্তু এখন কাউন্সিলর না থাকায় সাধারণ মানুষ আগের সেই সেবা পাচ্ছে না। ৫ আগস্টের পর এলাকার ছোটখাটো অনেক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেনাবাহিনীর কাছে সমাধান চাইতে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তখন পুলিশের কার্যক্রমও ছিল না। এখন মোটামুটি আছে। তবুও কাউন্সিলরের যে অভাব সেটা বোধ করছি।
তিনি আরও বলেন, রাস্তাঘাট সংস্কারের যে কাজ চলমান ছিল তা এখন স্থগিত হয়ে আছে। মূল সড়কের বেহাল দশা। সরকারের পটপরিবর্তনের আগে ভেতরে অলিগলিতে যেসব রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি করে রাখা হয়েছে তা এখনও সেই অবস্থায় আছে, বিশাল বিশাল গর্ত হয়ে আছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে, নাজেহাল অবস্থা। সবচেয়ে বড় কথা, কত দিনে এই পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে বা জনপ্রতিনিধি এসে সরাসরি জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে কবে কাজ করবে তা এখনও অনিশ্চিত।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম রেজা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কাউন্সিলরের অনুপস্থিতিতে জবাবদিহিতার যে জায়গা সেটা এখন নেই। আগে নিয়মিত মশক নিধন কর্মসূচি হতো। না হলে সরাসরি কাউন্সিলর অফিসে গিয়ে কেন হচ্ছে না, কবে হবে সেটা জানা যেতো। এখন সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে মশার উপদ্রব বেড়ে গেছে। তারপর ড্রেনেজ ব্যবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তাদের মনমতো কাজ করছে। মন চাইলে ভালোভাবে করে, নয়তো না। তাদের মেনটেইন করার আগে যে প্রক্রিয়া ছিল সেটা এখন নষ্ট হয়ে গেছে।
এই নাগরিক আরও বলেন, এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজি বেড়ে গেছে। নামে বেনামে এখন চাঁদাবাজি শুরু হয়েছে। এই সমস্যাটা অবশ্য আগেও ছিল। কিন্তু মনে হচ্ছে এখন আরও বেড়েছে। এছাড়াও ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা নতুন করে দখল জায়গা জমি-দখল করছে। কাউকে যে বিচার দেবো সেই সুযোগ নাই। অথচ জায়গা-জমির এসব ঝামেলা কিন্তু আগে স্থানীয়ভাবে সমাধান হতো। প্রতিবন্ধী সনদ সত্যায়িত করতে গিয়েও সমস্যা হয়েছে বলে শুনেছি।
৪২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা বশির উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জন্ম সনদ ও মৃত্যু সনদ সেবা আগে যেটা কাউন্সিলরের কাছে পাওয়া যেতো এখন কাউন্সিলর না থাকায় সেটা পাওয়া যাচ্ছে না। সেটার জন্য নগরভবনে দৌড়াদৌড়ি করতে হচ্ছে। এটা বাড়তি একটা ভোগান্তি। তাছাড়া টিসিবির স্বল্প মূল্যে সেবা দেওয়ার যে কার্যক্রমটা ছিল তা আগের মতো চলছে না।
কী বলছেন কর্মকর্তারা
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবু নাসের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মেয়র-কাউন্সিলরদের অনুপস্থিতিতে জনগণের কিছু ভোগান্তি হচ্ছিলো। এগুলো কমাতে ইতোমধ্যেই নাগরিক সনদ, ওয়ারিশান সনদ, পারিবারিক সনদসহ (সাবেক) ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের কাছ থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাসিন্দারা যেসব সনদ পেতেন তা এখন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের (আনিক) মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ কমাতে যা কিছু করা প্রয়োজন সেই অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন ডিএসসিসি প্রশাসক। এছাড়াও যেসব উন্নয়ন কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে তা শিগগিরই শুরু হবে।