তবে বোর্ড কর্তৃপক্ষ বলছেন,প্রশ্নে ভুলের কারণে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হবে না।তাদের পক্ষেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।বরং ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়ার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরপরও ফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত দুশ্চিন্তায় থাকার কথা জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
গত ১ ফেব্রুয়ারি এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়ে শেষ হয় গত ৮ মার্চ।
জানা গেছে, যশোর বোর্ডে গণিতের প্রশ্নে ১১টি ভুল,ঢাকা বোর্ডে পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নে পাঁচটি, রাজশাহী বোর্ডে বাংলা প্রথম পত্রে তিনটি এবং দ্বিতীয় পত্রে চারটি,চট্টগ্রাম বোর্ডে গণিতের প্রশ্নে,বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম মিলিয়ে ১১টি ভুল পাওয়া যায়। আবার এসব ভুলের পাশাপাশি দেশের বেশকিছু স্কুলে দুই বছরআগের প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
ভুক্তভোগী ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকেরা এ নিয়ে উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা হওয়ায় পরীক্ষার্থীদের শঙ্কা ভুলের কারণে তারা নম্বর কম পেতে পারেন। এমনকি ফেলও করতে পারেন বলে ভয় পাচ্ছেন অনেকে।
অন্যদিকে বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা জানিয়েছেন,প্রশ্নের ভুলের কারণে কোনও পরীক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। ক্ষতি যেন না হয় সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।|
রাজশাহী গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলের বাংলা বিষয়ের শিক্ষক আজমিরা খাতুন বলেন, ‘ভুলের ধরন দেখে অবাক হয়েছি।এমন ভুল আর যাতে না হয় সে জন্য শিক্ষা প্রশাসনকে কঠোর হওয়া উচিত। দুশ্চিন্তায় রয়েছি শিক্ষার্থীদের কপালে কি আছে কে জানে!’
এসএসসি পরীক্ষার্থী বিউটি আক্তার বলেন,‘আমরা ভালোভাবে পরীক্ষা দিয়ে বাসায় যাই। বাসায় গিয়ে দেখি ২০১৪ সালের প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়েছি। শিক্ষা বোর্ড থেকে পাঠানো প্রশ্নে আমাদের ১০ বছরের স্বপ্ন ভেঙে গেলো। আমরা মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীকে বলতে চাই, আমাদের পরীক্ষা আবার নেওয়া হোক।’
শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়,এবার আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষার জন্য মোট ৩২ সেট প্রশ্ন করা হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে এসব প্রশ্ন থেকে লটারি করে প্রতি বোর্ডের জন্য চার সেট প্রশ্ন নেওয়া হয়। তাই কার তৈরি করা প্রশ্নে কোন বোর্ড পরীক্ষা নিচ্ছে, তা চট করে জানতে পারেনি বোর্ড কর্তৃপক্ষ। এছাড়া প্রতিটি প্রশ্ন তৈরি ও পরিমার্জনে জড়িত থাকেন চারজন অভিজ্ঞ শিক্ষক, যারা এ কাজের জন্য সম্মানীও পান। যদিও এসব শিক্ষক নির্বাচন করা নিয়ে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
প্রশ্নে ভুল থাকার বিষয়ে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বোর্ডে গণিতের প্রধান পরীক্ষকদের নিয়ে সভা করে বোর্ড কর্তৃপক্ষ। ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়,বহুনির্বাচনী প্রশ্নগুলোর মধ্যে যেগুলোতে ভুল আছে সেগুলোর নম্বর সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। সৃজনশীল অংশের ভুল প্রশ্নের জবাব কেউ দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে পুরনো প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য পরীক্ষাকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দায়ী করা হচ্ছে। বেশ কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা দুশ্চিন্তা নিয়ে পরবর্তী পরীক্ষাগুলোয় অংশ নিয়েছে। এতে তাদের পরের পরীক্ষাগুলোও খারাপ হয়েছে বলেও জানিয়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার ধামরাইয়ে আবদুস সোবহান মডেল হাইস্কুল পরীক্ষাকেন্দ্রে ব্যবসায় উদ্যোগ বিষয়ে ৭১ জন নতুন পরীক্ষার্থীকে ২০১৪ সালের পুরনো নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়। গাজীপুরের শ্রীপুর মাওনা বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় পরীক্ষাকেন্দ্রে পুরনো প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়েছে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ২০ পরীক্ষার্থী। তাদের বিষয়টি ‘বিশেষভাবে বিবেচনা’ করতে ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে সুপারিশ পাঠিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
জেলার কাপাসিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ৪৪ জন পরীক্ষার্থী পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে পরীক্ষায় অংশ নেয়। কিন্তু তাদের ২০১৪ সালের নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন বিলি করা হয়। চাপের মুখে কেন্দ্রসচিব পরীক্ষা শুরুর ৩৫ মিনিট পর ওই উত্তরপত্র প্রত্যাহার করে নেন।
আবার, যশোরের মনিরামপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের একটি কক্ষে কিছু পরীক্ষার্থীকে ২০১৪ সালের প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়।পটুয়াখালীর বাউফলে কালাইয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভুল প্রশ্নপত্রে অনিয়মিত তিন পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়া হয়। কক্ষ পরিদর্শকের অবহেলায় নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিলাহাটি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে বাণিজ্য বিভাগের চার ছাত্র পুরনো প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়েছে। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর রামদিয়া কেন্দ্রে বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষায় ৭৯ জন এসএসসি পরীক্ষার্থী দুই বছর আগের সিলেবাস অনুযায়ী করা প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়েছে। শরীয়তপুরের জাজিরা বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজে রসায়ন বিজ্ঞানের পরীক্ষায় ২০১৪ সালের প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়েছে ৪০ পরীক্ষার্থী। পরে তাৎক্ষণিক বিষয়টি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শ্রীকান্ত কুমার চন্দ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রশ্নের কোনও ভুলের জন্য পরীক্ষার্থীর ক্ষতি হবে না। সব বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকেরা বসে ভুলত্রুটিগুলো পর্যালোচনা করে পরীক্ষার্থীদের পক্ষেই সিদ্ধান্ত নেবেন। এর পাশাপাশি যেসব শিক্ষকের তৈরি করা প্রশ্নে ভুল পাওয়া গেছে,তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ১৬ মার্চ এ বিষয়ে একটি সভা হওয়ার কথা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সারাদেশের বিভিন্ন বোর্ডের প্রশ্নপত্রে এমন মারাত্মক ভুল দেখে আশ্চর্য হয়েছেন শিক্ষাবিদরা। অর্থনীতিবিদ ও জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির কো-চেয়ারম্যান ড. কাজী খলিকুজ্জামান আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘এ ধরনের ভুল কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়ে যায়। তাদের মন-মানসিকতা ভেঙে যায়।’
শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন,‘এ ধরনের ভুল একেবারেই কাম্য নয়। যারা এমন ভুল করেছেন বোর্ড কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আর আগামীতে যেন এমন ভুল না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।’
/আরএআর/এফএস/ এমএসএম