সিলেটের কানাইঘাট থেকে পাঁচ বছরের শিশু মুনতাহা আক্তার নিখোঁজ হয়। মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ছোট্ট মুনতাহার ছবি। কোথায় গেলো শিশুটি—সেই দুশ্চিন্তায় সারা দেশের মানুষ। কিন্তু পরে তাকে খুঁজে পাওয়া গেলো মৃত অবস্থায় ডোবায়। বেরিয়ে এলো ভয়ংকর তথ্য— প্রতিবেশী গৃহশিক্ষক শামীমা বেগম মর্জিনার পরিকল্পনায় অপহরণের পর বস্তাচাপা দিয়ে হত্যা করা হয় তাকে। তার এই নিহতের ঘটনায় প্রতিবেশীর জড়িত থাকার কথা ছড়িয়ে পড়লে স্তব্ধ হয়ে যায় মানুষের ভাবনা। সবচেয়ে কাছে থেকে যে মানুষগুলো এই শিশুকে বেড়ে উঠতে দেখছিল, তারাই কীভাবে তার মৃত্যুর পরিকল্পনা করতে পারে!
বগুড়ায় বেশ কিছু দিন আগের একটি ঘটনা। শিশু মুনিমের বাবা ইদ্রিসের প্রতিবেশী আশরাফের সঙ্গে পারিবারিক বিরোধ ছিল আমিনুলদের। আর ইদ্রিস আলী যেকোনও বিষয়ে আশরাফদের পক্ষে থাকতেন। এসব নিয়ে ক্ষোভ ছিল আমিনুলের। তাই আমিনুল ইদ্রিসের ছেলেকে খুন করে বসে।
কেবল প্রতিবেশী না, বাড়িওয়ালা-ভাড়াটে সম্পর্ক, এলাকার বড় ভাইদের সঙ্গে ছোটদের সম্পর্ক নিয়ে একের পর এক সংবাদ উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায় দিনদুপুরে বাসায় ঢুকে উম্মে সালমা (৫০) নামের এক গৃহবধূকে শ্বাসরোধে হত্যার পর লাশ ডিপফ্রিজে রাখার ঘটনায় বিস্ময়কর তথ্য বের হয়ে আসে। ফ্ল্যাটের একজন ভাড়াটে নারীসহ তিন জনকে এ ঘটনায় গ্রেফতার করেছে দুপচাঁচিয়া থানা-পুলিশ। তারা ডাকাতির উদ্দেশ্যে উম্মে সালমার বাসায় ঢুকেছিলেন এবং পরে তাকে হত্যা করেন বলে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকারোক্তি দিয়েছে।
কেন প্রতিবেশী সম্পর্কের মধ্যে এই টানাপড়েন শুরু হলো— প্রশ্নে সমাজবিজ্ঞানী নেহাল করীম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উৎসবের আর শোকের বাড়ি ছাড়া আমাদের পরস্পরের সঙ্গে দেখা হয় না। সেটাও পরমাত্মীয়ের ক্ষেত্রে। পাশের বাড়িতে কে কোন সমস্যায় আছে—সেটা আমরা প্রাইভেসির নামে জানাজানি বন্ধ করে দিয়েছি। রাস্তায় কাউকে বিপদে পড়তে দেখলে সেটা কেবল তার সম্পর্ক হিসেবে দেখতে শিখেছি। ফলে এক ধরনের নেতিবাচক আবহাওয়া তৈরি হয়েছে। আর অতি সম্প্রতি যে ঘটনাগুলো ঘটছে—সেগুলো বিগত সরকারের আমলে যে শোষণ বঞ্চনা, সেটার প্রতিশোধ চলছে এবং সেটা স্বাভাবিক।’
মানুষ কেন এত বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করলো এবং প্রতিবেশী কেন শত্রুর জায়গা নিলো প্রশ্নে মনোবিশ্লেষক মেখলা সরকার বলেন, ‘মানুষের মধ্যে নৃশংসতা, হিংসা, ভালো-মন্দ মিলিয়ে বিভিন্ন অনুভূতি কাজ করে। এর মধ্যে খারাপ বিষয়গুলো আমরা ভালো প্রবৃত্তি দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু আমরা অন্যদের প্রতি নেতিবাচক ভাব প্রকাশ করে ফেলছি। কারণ পরস্পরের ওপর দায়বোধ নেই। আর সেই না থাকার কারণ বিচ্ছিন্নতা। পারস্পরিক সম্পর্ক থাকলে তবেই সহমর্মিতা থাকবে, তার বিপদকে আপনি নিজের বিপদ ভাবতে শিখবেন। সেই জায়গায় ঘাটতির কারণে মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সমাজ একটা ট্রান্সজিশনাল টাইমের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের পরিবর্তন হঠাৎ করে হয়েছে এবং টেকনোলজিনির্ভর ওই জীবনটাকেই গুরুত্বপূর্ণ ভাবছি। ফলে ঘরের মধ্যে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। আমরা সামাজিক অনুষ্ঠানেও পাশের মানুষটাকে মনোযোগ না দিয়ে ভার্চুয়াল জগতে মনোযোগ দিই। এই ফ্যান্টাসি জগতের কারণে হীনম্মন্যতা বাড়ে, সেখান থেকে হতাশা বাড়ছে এবং আমাদের সামাজিক বন্ধনটা আগের মতো নেই। ফলে যা খুশি করতে দ্বিধা কাজ করছে না।’