থার্টি ফার্স্ট নাইটে আইন অমান্য করলেই ব্যবস্থা

৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় এখনও জনমনে শঙ্কা বিরাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে এবার থার্টি ফার্স্ট নাইট ঘিরে বাড়তি সতর্ক থাকতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের।

উৎসবকে কেন্দ্র করে সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিবারের মতো এবারও কোনও ধরনের বিতর্কে না জড়াতে থার্টি ফার্স্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সূত্র। পুলিশ জানিয়েছে, যারাই নির্দেশনার বাইরে গিয়ে কোনও কিছু করার চেষ্টা করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে চলবে তল্লাশি, পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত চলবে।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব উৎসবকে ঘিরে আগে থেকেই নিরাপত্তা ইস্যুতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। তবে দেখা যায় সেসব তোয়াক্কা না করেই অনেকে উৎসব পালন করতে গিয়ে বিশৃঙ্খলায় জড়িয়ে পড়েন। থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপনে তরুণদের মাধ্যমেই বিশৃঙ্খলার ঘটনাগুলো আগে ঘটেছে। বিশেষ করে তরুণদের ভাবা দরকার, তারা নতুন বছরকে স্বাগত জানাচ্ছে- যেন নতুন বছর কল্যাণ বয়ে আনে। এ সময় তারা যদি অপ্রত্যাশিত, শিষ্টাচার বা আচরণবহির্ভূত কোনও কাজ করে, তাহলে সেটি কোনও মঙ্গল বয়ে আনে না। এসব ঘটনা দেশীয় গণমাধ্যম ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও দৃষ্টিগোচর হয়।

পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, থার্টি ফার্স্ট নাইট উপলক্ষে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পুলিশ যথাযথ ব্যবস্থা জোরদার করেছে। কৌশলগত স্থানে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, ক্রাইম সিন ভ্যান, কুইক রেসপন্স টিম এবং সোয়াত টিম ইত্যাদি মোতায়েন থাকবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক পোস্ট, মন্তব্য বা ছবি আপলোড করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চেকপোস্টে চলছে তল্লাশি (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)
এরইমধ্যে ঢাকা মহানগর এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিয়মিত টহল ও তল্লাশি চৌকি বাড়ানোর পাশাপাশি র‌্যাব-পুলিশি তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো এবং গুজব ও অপপ্রচার প্রতিরোধে সাইবার পেট্রোলিং জোরদারসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো মনিটরিং করা হচ্ছে। কেউ উচ্চস্বরে গাড়ির হর্ন বাজালে ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি বা মোটরবাইক চালালে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাঠপর্যায়ে থাকবেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, মহানগর ও জেলা পর্যায়ে নিরাপত্তা ইস্যুতে আলাদা বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। নতুন ইংরেজি বছরের আগের রাতে চট্টগ্রাম নগরীর রাস্তা, ফ্লাইওভার, ভবনের ছাদ ও প্রকাশ্য স্থানে কোনও ধরনের জমায়েত, সমাবেশ বা উৎসব না করার নির্দেশনা দিয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি)। সিএমপি জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় চেকপোস্ট বসানো, গির্জা, হোটেল, ক্লাব, বিনোদন কেন্দ্রে পুলিশ মোতায়েন, টহল জোরদার, ট্রাফিক পুলিশের বিশেষ ব্যবস্থা এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া ৩১ ডিসেম্বর রাতে এবার কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের উন্মুক্ত স্থানে কোনও অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকছে না।

ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনে আতশবাজি ও পটকা ফোটানো এবং ফানুস ওড়ানো বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে দফায় দফায় নিষেধ করা হয়েছে। এদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। এছাড়া রাজধানীর বাসা, বাসাবাড়ির ছাদ ও সব ভবন, উন্মুক্ত স্থান, পার্কে আতশবাজি, পটকা ফোটানো বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে।

সোমবার (৩০ ডিসেম্বর) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামানের দায়ের করা রিটে জনসমাগম ও আতশবাজি ঠেকাতে ওই দিন রাত ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারির মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পরিচয়পত্র ছাড়া এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। গুলশান, হাতিরঝিল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণসহ সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে র‌্যাবের হেলিকপ্টার, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, ডগ স্কোয়াড টিম ও ক্রাইম সিন ভ্যান।

একটি গাড়িকে তল্লাশি করছেন র‌্যাব সদস্যরা
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘থার্টি-ফার্স্ট নাইটে কী করা যাবে, কী করা যাবে না এসব বিষয়ে কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সবাইকে এ বিষয়গুলো মেনে চলার অনুরোধ জানাচ্ছি। এছাড়া উৎসবটি কেন্দ্রে করে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে—এমন কোনও শঙ্কা নেই। সবকিছু মাথায় রেখে পুলিশের পক্ষ থেকে  ঢাকা মহানগরসহ সারা দেশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্ব-স্ব ইউনিটকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। নিরাপত্তা ইস্যুতে মিটিংয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়ে সব দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুনীম ফেরদৌস বলেন, ‘থার্টি ফার্স্ট নাইটে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ, মাদক সেবন প্রতিরোধে যেকোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে র‌্যাবের গোয়েন্দা ও আভিযানিক দল প্রস্তুত রয়েছে। সব ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের মাধ্যমে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি ও ইউনিফর্ম টহল বৃদ্ধি করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। অভিজাত এলাকা এবং ডিপ্লোম্যাটিক জোনেও চেকপোস্ট জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি ভার্চুয়াল জগতে যেকোনও ধরনের গুজব, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো প্রতিরোধে র‌্যাব সাইবার মনিটরিং টিম অনলাইনে সার্বক্ষণিক নজরদারি অব্যাহত রাখছে। যারা সাইবার জগতে মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে উসকানি দেওয়ার মাধ্যমে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করবে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।’

থার্টি-ফার্স্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আজ এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, ‘ঢাকায় থার্টি ফার্স্ট নাইট উপলক্ষে রাজধানীর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে রেগুলার ডিপ্লয়মেন্টের বাইরে অতিরিক্ত ৩ হাজার পুলিশ মোতায়েন করেছে ডিএমপি।’

তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশের পাশাপাশি পরিবেশ অধিদফতরের ম্যাজিস্ট্রেট থাকবেন। তারা যেকোনও জায়গায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবেন। আমরা মনে করছি এটা যথেষ্ট। আমরা কিছু পয়েন্টকে টার্গেট করেছি। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, গুলশান, ৩০০ ফিট, উত্তরা দিয়াবাড়ি এলাকায় বেশি পুলিশ মোতায়েন থাকবে। আমাদের পুলিশ ফোর্সের পাশাপাশি পরিবেশ অধিদফতরের ম্যাজিস্ট্রেটরা থাকবেন। তারা যেকোনও জায়গায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করলে আমাদের ফোর্স সহযোগিতা করবে।’