‘শিকারি সাংবাদিকতায় মুহূর্তেই কাউকে অপরাধী বানিয়ে শাস্তি দেওয়া যেতো’

বাংলাদেশে বিগত সময়ে একধরনের শিকারি সাংবাদিকতার উদ্ভব ঘটেছে। যার মাধ্যমে মুহূর্তেই কাউকে অপরাধী বানিয়ে শাস্তি দেওয়া যেতো।

শুক্রবার (১৭ জানুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে আয়োজিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক অধ্যাপক আ-আল মামুন এ কথা বলেন। ‘ফ্যাসিবাদের জমানায় শিকারি সাংবাদিকতা’ শিরোনামে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) সেমিনারটি আয়োজন করে।

সেমিনারে বক্তব্য রাখেন লেখক ও চিন্তক ড. সলিমুল্লাহ খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুন আহমেদ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খোরশেদ আলম। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন প্রেস ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ।

বাংলাদেশে শিকারি সাংবাদিকতার উত্থানের কারণ জানিয়ে আ-আল মামুন বলেন, ইউরোপ ও আমেরিকায় এই শিকারি সাংবাদিকতা দেখা যায়নি; বাংলাদেশে ঘটেছে। কারণ আমাদের সংবাদ ব্যবস্থায় প্রোপাগান্ডা চালানোর সুযোগ আছে। কিন্তু তাৎক্ষণিক একটা মব তৈরি করে কাউকে অপরাধী করা যায় না। শিকারি সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে মুহূর্তেই কাউকে (ক্রিমিনালাইজ) অপরাধী করে ফেলা যায়। এখানে গোয়েন্দা সংস্থা, রাষ্ট্রীয় লোকজন এবং সংবাদপত্রের একধরনের সংযোগ কাজ করে। এটি দুইভাবে কাজ করে। একদিকে সে সমাজের ভাষাগুলোকে দমন করে। অন্যদিকে সমাজের ভাষাগুলোকে সে শিকার করে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে শিকারি সাংবাদিকতার মেনিফেস্টো শুরু হয়েছে ২০০৭ সালে। সেসময় শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে গ্রেফতার করার সময় আমরা শিকারি সাংবাদিকতা দেখেছি। পরে তা বিস্তৃত হতে পারেনি। কিন্তু মামুনুল হকের রিসোর্টকাণ্ড বা পরীমণির মাদককাণ্ডে তা পুনরায় প্রতিফলিত হয়েছে।

শিকারি সাংবাদিকতার বিষয়ে ২২ জন সাংবাদিকের মতামত নিয়েছেন আ-আল মামুন। তাদের মতামতের উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা শিকারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, তার কয়েকটি কারণ তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, সাক্ষাৎকার ওই সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, ২০১০-২০১২ সালের আগে গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে সংবাদ করা যেতো। কিন্তু এরপর ডিজিএফআই-এনএসআইসহ গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে কোনও সংবাদ করা যেতো না। দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকদের মধ্যে চাকরি হারানোর ভয় কাজ করে। কারণ, বাংলাদেশে চাকরি ও সম্মান একসাথে হারায়। এখানে কেউ চাকরি হারালে তাকে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে সম্মান হারানোর ভয়ে সাংবাদিকরা তার মালিকপক্ষের সাথে সমঝোতা করে। তৃতীয়ত, যারা গণমাধ্যমের মালিক, তারাই রাষ্ট্র চালায়। গত নির্বাচনে ১৮ জন গণমাধ্যমের মালিক অংশ নিয়েছেন এবং ১২ জন সাংসদ হয়েছেন। চতুর্থত, মূলধারার গণমাধ্যমের আয় কমে যাওয়ার কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাথে তাদের মধ্যে একধরনের নেক্সাস (সংযোগ) গড়ে উঠেছে। এই শক্তিশালী নেক্সাস শিকারি সাংবাদিকতার উত্থানে ভূমিকা রেখেছে।

চিন্তক সলিমুল্লাহ খান বলেন, ফ্যাসিবাদের একটি দিক হচ্ছে, অতীতের ঐতিহাসিক ঘটনাবলি নিজের মধ্যে আত্মস্থ করে নেওয়া। যেমন— টিভির নাম হয়েছে একাত্তর বা একুশে- এগুলো হলো আত্মসাৎকরণ। এগুলো ফ্যাসিবাদের লক্ষণ। আপনারা বলতে পারেন, এগুলো তো জাতীয় প্রতীক। নাম দেওয়া সমস্যা না, কিন্তু নাম দিয়ে যা করে, তা তো ভয়াবহ'।

সলিমুল্লাহ খান আরও বলেন, ‘সাংবাদিকতা শুধু জনমত তৈরি করে না, এটি রাজনৈতিক মতও তৈরি করে। থিউরিও তৈরি করে, ক্ষমতাও তৈরি করে। ফ্যাসিবাদের উদাহরণ হিসেবে বলি- ১৯৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের ১০০ বছর পূর্ণ হয়। তখন ঢাকার যেসব পত্রিকা আমি দেখেছি, তারা বিশেষ সংখ্যা বের করেছিল। কিন্তু ২০০৭ সালে ১৫০ বছরপূর্তিতে ঢাকার কয়েকটি দুর্বল পত্রিকা ও টিএসসিতে কয়েকজন বামপন্থি কিছু বক্তব্য দিয়েছিল। সরকারিভাবে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। পলাশীর যুদ্ধের কথা উল্লেখ নেই। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের উল্লেখ নেই। এমনকি ’৪৭ সালে ব্রিটিশরা বিদায় নিয়েছে, তারও কোনও স্বীকৃতি নেই।

তিনি বলেন, সেদিন দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতি পাঠ্যবইয়ে রাখা নিয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের উপর আক্রমণ করা হয়েছে। অভ্যুত্থানের সময় যারা বীরের ভূমিকা পালন করেছে, তাদেরকে পিটানো হয়েছে। তারমানে ফ্যাসিবাদ এখনও জীবন্ত আছে। ফ্যাসিবাদ আমাদের শিক্ষকদের ভেতর আছে, ছাত্রদের ভেতর আছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ফ্যাসিবাদের জমানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি কী ভূমিকা পালন করেছে, এটা নিয়ে কোনও সমালোচনা না করে উপাচার্য, উপ-উপাচার্যকে দাওয়াত দিলে পাপমোচন হবে না। এদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মামুন আহমেদ নিজের সাথে ঘটে যাওয়া শিকারি সাংবাদিকতার একটি উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কারের আন্দোলনের সময় একদিন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাকে ফোন করেন। তিনি আমার কাছে কোটা সংস্কার আন্দোলনের যৌক্তিকতা সম্পর্কে জানতে চান। আমি তাকে বললাম, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনটি যৌক্তিক। পরে দেখলাম সবগুলো মূলধারার গণমাধ্যমে আমাদের এই ফোনালাপটি প্রচার করা হচ্ছে। ‘লন্ডনে বসে সরকার পতনের ষড়যন্ত্র’ এমন একটি ভাব। হঠাৎ দেখলাম একটি টিভি রাত ১১টায় টকশো ডেকে বসলো। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো উপস্থাপিকা লাইভ অনুষ্ঠানে আমাকে কল করে বসলেন।

তিনি বলেন, আমার মেয়ের পরীক্ষা ছিল এর দুইদিন পরেই। পরদিন দুইটা পর্যন্ত এই ঘটনা টিভি চ্যানেলের লিড নিউজে ছিল। সরকারের তখনকার দুজন মন্ত্রীও টিভিতে এই ঘটনার রেফারেন্স টেনে কথা বললেন। আমি তখন আমার পরিচিত ‘প্রভাবশালী’ সাংবাদিকদের ফোনও করলাম। মনে হলো তারা আমার কল পেয়ে ভীত। অনেকে ফোনকলই ধরলেন না। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাথে কথা বললাম। তারা আরও বেশি ভীতসন্ত্রস্ত। আমি তখন বুঝতেই পারিনি এ ধরনের একটি ব্যক্তিগত ফোনালাপের মধ্যে এমন কী সংবাদ উপাদান রয়েছে, যার কারণে দুইদিন ধরে তাকে লিডে রাখা হলো। এভাবে রেকর্ড গ্রহণ করা আইনসিদ্ধ কিনা? তাছাড়া গোয়েন্দা সংস্থা যদি এই রেকর্ড গ্রহণও করে, তাহলে এর সাথে গণমাধ্যমের সম্পর্ক কী।