১৯৮৯ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে অল্প বেতনে একটি ছবি বাঁধাইয়ের দোকানে কাজ নেন মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। শিল্পকে ভালোবেসে ২০০২ সালে বেতন থেকে জমানো কিছু টাকা ও ধার করা অল্প মূলধন নিয়ে ‘ভাই ভাই ফ্রেম’ নামে নীলক্ষেতে নিজেই এ ব্যবসা শুরু করেন। ৩ বছর আগে ধারদেনা করে, ব্যাংক লোন নিয়ে হাজারীবাগের ‘ফিনিক্স ট্যানারি’ ভবনের ষষ্ঠ তলায় ভাড়া করা দোকানে ব্যবসা শুরু করেন। শুক্রবার (১৭ জানুয়ারি) ভবনটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তার সেই দোকান চোখের সামনেই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তার দোকানে কী ছিল না! মূল্যবান চিত্রকর্মসহ ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের যাবতীয় মালামাল, যার মূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা। সব হারিয়ে এখন ভবনের সামনে বসে শুধু দুই চোখের অশ্রুই ঝরাচ্ছেন এই ব্যবসায়ী।
শুধু জাহাঙ্গীর হোসেনই নয়, গতকাল ওই ভবনে লাগা আগুনে নিঃস্ব হয়েছেন আরও অনেকে। ক্ষতিগ্রস্ত আরেক ব্যবসায়ী ইমতিয়াজ আহম্মেদ বাবু বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, চার বছর আগে তিনি ওই ভবনের ছয় তলায় প্রিন্টিং প্রেসের একটি কারখানা চালু করেন। কারখানাটিতে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার মালামাল ছিল। সবই পুড়ে গেছে। কিছুই বের করতে পারেননি। সব হারিয়ে পাঁচ-ছয় জন কর্মচারী নিয়ে পথে বসেছেন। তার ভাষ্য, শুক্রবার জুমার নামাজের আগে দোকানপাট বন্ধ ছিল। আগুনের খবর পেয়ে এসে দেখেন উপরে দাউ দাউ করে জ্বলছে। কীভাবে, কোথায় আগুন লাগলো কিছুই বুঝতে পারছেন না।
ভবনটির সাত তলার নকশি প্লাস ফ্যাশন হাউজের স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেন নজীর বলেন, ‘আগুন বেড়ে আর দক্ষিণ দিকে যায়নি। তাহলে আমরাও শেষ হয়ে যেতাম। সামনে রমজান, আমার কারখানায় প্রচুর পাঞ্জাবি ছিল। যেগুলো সারা দেশে পাইকারি বিক্রি করি। তবে আগুনের হিটে আমার কারখানার ডেকোরেশন নষ্ট হয়েছে, কালো কালো ছাপ পড়েছে।’
শনিবার (১৮ জানুয়ারি) দুপুরে সরেজমিন অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ওই ভবনের সামনে গেলে দেখা যায়, নিরাপত্তার স্বার্থে কাউকেই ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। উৎসুক জনতা ভবনটি ঘিরে রেখেছে। বিভিন্ন ফ্লোরে কাজ করা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সামনে দাঁড়িয়ে আফসোস করছেন। এ সময় ভবনটি পরিদর্শন করতে আসেন ঢাকা মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পাশাপাশি আজও সেখানে অবস্থান করেন ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা। ভেতরে গেলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পঞ্চম তলা। সেখানে একটি রান্নাঘরের খোঁজ পাওয়া গেছে। পুড়ে যাওয়া রান্নার পাতিলের অস্তিত্বও মিলেছে। ব্যবসায়ীদের অনেকের ধারণা, ওই রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত। পঞ্চম তলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল বলে গতকাল ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছিল।
ওই ফ্লোরের কিছু লোহা ছাড়া বাকি সব পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। পুড়েছে ষষ্ঠ তলাও। আংশিক পুড়েছে সপ্তম তলা। ভবনটির কিছু ফ্লোরে পোশাক, প্লাস্টিক এবং ফার্নিচার কারখানাও রয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত জানতে পেরেছি ভবনটিতে বিভিন্ন ধরনের ৩৭টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আগুনের সূত্রপাত পঞ্চম তলা থেকে। কিছু কেমিক্যাল এবং ছোট ছোট ড্রাম পাওয়া গেছে। অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে সঠিক কারণ ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারাই ভালো বলতে পারবেন। কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সেটিও সব একত্রে না পাওয়া পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না। এছাড়া হতাহতের বিষয়ে কোনও খবর এখনও পাইনি। আমরা একটি জিডি করে রেখেছি। কেউ যদি মামলা করতে চায় করবে।’
এ প্রসঙ্গে হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ভবনের মালিক মারা গেছে। তবে তার দুই ছেলে রয়েছেন। দায় বলেন আর দায়িত্ব বলেন, দুটিই ভবন মালিকের। গতকালও আমরা ছিলাম, আজও পরিদর্শনে এসেছি। প্রতিটি বিষয়ে কার কী দায়দায়িত্ব ছিল জানার চেষ্টা করছি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) লে. কর্নেল মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ছুটির দিনের কারণে আমাদের তদন্ত কমিটি এখনও সাইন হয়নি, রবিবার হবে। তদন্তে সব কিছুই দেখা হবে। এটা আগে একটি ট্যানারি ছিল। ট্যানারি থেকে পরিবর্তন হয়ে মাল্টি অকুপেন্ট হয়েছে। বিভিন্ন ফ্লোরে বিভিন্ন ধরনের পণ্যসামগ্রী ছিল। এখানে অনেক কিছুর ব্যত্যয় ঘটেছে। ভবনটিতে ফায়ার সেফটি প্ল্যান নেই।’
তিনি বলেন, ‘রাজউক এটাকে কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ বলেছিল, তারা কী বলছে, আমরা সেগুলো খতিয়ে দেখছি। এত বড় একটি বিশাল বিল্ডিংয়ে মাত্র দুটি সিঁড়ি। যেখানে বিভিন্ন ফ্লোরে কয়েক হাজার শ্রমিক থাকেন। ফ্লোরগুলোতে গোডাউনও রয়েছে। সেখানে অনেক দাহ্য পদার্থ ছিল। এসবের ক্ষেত্রে কোনও নিয়ম-নীতি মানা হয়নি। সবাই শুধু লাভের চিন্তা করেছে।’
মো. তাজুল ইসলাম আরও বলেন, ‘সেফটির বিষয়টি তারা টোটালি অমান্য করেছে। যেহেতু ভবনটিতে শ্রমিকরা থাকে, নিশ্চিত রান্নাবান্নার ব্যবস্থা ছিল। আর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বলতে এক্সটিংগুইসার ছাড়া কিছুই ছিল না। এটাও যে মাত্রার থাকার কথা সেটা ছিল না।’
এর আগে শুক্রবার ভবনটি পরিদর্শনে এসে ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা বলেছিলেন, ‘অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বাড়াতে একাধিকবার এ ভবনটিকে অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তবে তারা কোনও ব্যবস্থা নেননি। ভবনটি খুবই পুরোনো, যার ফলে এখানে কোনও ধরনের কাজ করা যাবে কিনা তা তদন্তে করে দেখতে হবে।’
শুক্রবার দুপুর ২টা ১৪ মিনিটে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। ২টা ২৩ মিনিট থেকে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। ফায়ার সার্ভিসের চারটি স্টেশন থেকে ১১টি ইউনিট প্রায় আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে হাজারীবাগ থানা পুলিশ, র্যাব, স্কাউটসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সহায়তায় করে। তবে উৎসুক জনতার ভিড়ের কারণে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের কাজ করতে বেশ বেগ পেতে হয়। পরে ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী এবং বিজিবি সদস্যরাও যোগ দেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগে ২০২৩ সালের একই দিনে ‘ফিনিক্স ট্যানারি’ ভবনে আগুন লাগে। সে সময় ফায়ার সার্ভিসের ৮টি ইউনিট প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ২০১৪ সালেও ভবনটিতে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে।