পণ্ড হলো আরও দুই বছর বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী থাকার আকাঙ্ক্ষা

সবকিছুই ছিল চূড়ান্ত, তৈরি হয়েছিল প্রস্তাবনাও। কিন্তু বাদ সাধলো দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বিমানবন্দরের উন্নয়নের নামে শত শত কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগে দায়ের করা ৪টি মামলার আসামি হওয়ায় বেবিচকের দুর্নীতির ‘বরপুত্র’ হিসেবে আলোচিত  প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানের চুক্তিভিত্তিক আরও দুই বছর থাকার আকাঙ্ক্ষা পণ্ড হয়েছে।

এ বিষয়ে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মঞ্জুর কবীর ভুঁইয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখন এই বিষয় নিয়ে ভাবছি না। বিষয়টি পরে দেখা যাবে।

এক প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি যতটুকু শুনেছি তিনি সৎ। তবে যেহেতু তার নামে মামলা হয়েছে, দুদক তদন্ত করছে। তারা তদন্ত করুক। আইন আইনের গতিতে চলবে।

তবে এ বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার কার্যালয়ে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। এরপর তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও রিসিভ করেননি। পরে ফোনে মেসেজ পাঠিয়ে বক্তব্য চাওয়া হলেও উত্তর দেননি তিনি। 

সূত্রমতে, দুর্নীতির অভিযোগে মামলার পর দেশত্যাগে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও আরও দুই বছর বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী পদে থাকতে আবদার করেছিলেন হাবিবুর রহমান। তাকে পুনরায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে একটি প্রস্তাবনাও প্রস্তুত করা হয়। বুধবার (২৯ জানুয়ারি) সেটিতে চেয়ারম্যান স্বাক্ষর করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা ছিল। তবে দুদকের ৪টি মামলার পর সেই প্রস্তাবনা থমকে গেছে।

জানা যায়, বেবিচকের বর্তমান এই প্রধান প্রকৌশলীকে দুর্নীতির বরপুত্র বলা হলেও অদৃশ্য শক্তির বলে গত নভেম্বরে তিনি এ পদে নিয়োগ পান। ওই সময় তার বিরুদ্ধে দুদকের দুটি মামলা চলমান ছিল। সবশেষ দুদক বিমানবন্দর উন্নয়নের নামে শত শত কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগে আরও ৪টি মামলা দায়ের করে। এই মামলাগুলোর আসামিদের অন্যতম তিনি। এত কিছুর পরও তিনি এই পদে থাকতে আবার আবেদনের বিষয়টি বুধবার ফাঁস হলে বেবিচকজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। এই প্রস্তাবনাটি বাংলা ট্রিবিউনের হাতে এসেছে।

ওই প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, তিনি আগামী ২৩ মার্চ অবসর-উত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাবেন। এ সময় তার পদটি শূন্য হবে। তার পরবর্তী হিসেবে জ্যেষ্ঠ ফিডার পদধারীর বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা ফৌজদারি মামলা চলমান। এ কারণে তাকে পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব না। পরের কর্মকর্তা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) নিযুক্ত থাকায় তাকেও নিয়োগ দেওয়া সম্ভব না। এ অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পদটি শূন্য থেকে যাবে।

প্রস্তাবনায় হাবিবুর রহমানের কর্মজীবনের নানা পদে থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে তার ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। এবং পরবর্তী দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ব্যাপারে সুপারিশ করা হয়।

বেবিচকের নাম প্রকাশ না করা শর্তে একাধিক কর্মকর্তা বলেন, তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত এটা সবাই জানে। এরপরও তিনি অদৃশ্য শক্তির বলে প্রধান প্রকৌশলী হয়ে যান। মার্চেই তার অবসরে যাওয়ার কথা। এর আগে তিনি তার আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী এই পদে আরও দুই বছর থাকার জন্য সবকিছু ম্যানেজ করে একটি প্রস্তাবনাও তৈরি করেন। শুধু চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর বাকি ছিল। কিন্তু এই মামলা ও তার বিরুদ্ধে দেশত্যাগে আদালতের নিষেধাজ্ঞা এলে বেবিচকজুড়েই আলোচনার জন্ম দেয়। একপর্যায়ে বুধবার তার প্রস্তাবনাটি চেয়ারম্যান আর স্বাক্ষর করেননি। এতে তার আকাঙ্ক্ষা আপাতত ভেস্তে গেছে।

প্রসঙ্গত, তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে সোমবার চারটি মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদক মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন বলেন, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির মাধ্যমে ৮১২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে রয়েছে আসামিদের বিরুদ্ধে।

আক্তার হোসেন আরও জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মুহিবুল হক, সাবেক যুগ্ম সচিব জনেন্দ্রনাথ সরকার, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সাবেক চেয়ারম্যান এম মফিদুর রহমান, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল মালেক, সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার মো. হাবিবুর রহমান, অ্যারোনেস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল আলম, পরিচালক লুৎফুল্লাহ মাজেদ, কমিউনিকেশন-নেভিগেশন অ্যান্ড সার্ভিল্যান্স-এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট শীর্ষক প্রকল্পের পরিচালক আফরোজা নাসরিন সুলতানা এবং সাবেক প্রকল্প পরিচালক (পরিকল্পনা) একেএম মনজুর আহমেদ পরস্পর যোগসাজশে প্রতারণা, জালিয়াতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিগত ১৫ বছরে দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরের উন্নয়নকাজের নামে হাজার হাজার কোটি লুটপাট ও আত্মসাৎ করেছেন। মামলার পরের দিন মঙ্গলবার মামলার অন্যতম আসামি হাবিবুর রহমানসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা দেয় আদালত।

আরও খবর:

এবার ৪ মামলার আসামি বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী

বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলীসহ ৮ আসামির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা