কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ের ৩২ নম্বর হোল্ডিংয়ের বাণিজ্যিক ভবনের সবগুলো ফ্লোরেই দোকান ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অফিস। সপ্তাহের শেষ দিন দুপুরে লাঞ্চ ব্রেকের আগে আগে সব অফিসেই তখন দারুণ ব্যস্ততা। কিছুক্ষণ পর ধোঁয়া, আগুনের গুঞ্জন। মুহূর্তেই বিভিন্ন ফ্লোরে শুরু হয় হুড়োহুড়ি। দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছেন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। অষ্টম তলার আগুন মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভবনে। বাঁচার জন্য মানুষের গগনবিদারী চিৎকার। কাঁচ ভেঙে রশি বেয়ে নামার প্রাণান্ত চেষ্টা। হাত ফসকে আহত হলেন কেউ কেউ। পাঁচ ঘণ্টা পর আগুনের নিয়ন্ত্রণ নেয় ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু এরই মধ্যে ঝরে যায় ২৬টি তাজা প্রাণ, আহত হন ৭৩ জন। ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ রাজধানীর বনানীর ফারুক রূপায়ন (এফ আর) টাওয়ারের বাণিজ্যিক ভবনে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় রাজধানীর বনানী থানায় পুলিশের একটি ও দুদকের দুইটিসহ মোট তিনটি মামলা হয়। তবে ঘটনার ছয় বছর পরও তিনটি মামলার বিচারকাজ এখনও শেষ হয়নি। সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে আটকে আছে দুদকের দুটি মামলা। আর পুলিশের করা মামলাটির এখনও চার্জগঠনই হয়নি। ধীরগতিতে চলছে সাক্ষ্যগ্রহণ ও চার্জগঠনের কাজ।
জানা গেছে, ২০১৯ সালের ৩০ মার্চ বনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) মিল্টন দত্ত বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। ২০২২ সালের ২৭ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক সমীর চন্দ্র সূত্রধর আদালতে এই মামলায় চার্জশিট দেন। চার্জশিটে ভবন মালিক এস এম এইচ আই ফারুক, তাজভীর উল ইসলাম, সেলিম উল্লাহ, এ এ মনিরুজ্জামান, সৈয়দ আমিনুর রহমান, ওয়ারদা ইকবাল, কাজী মাহমুদুন নবী ও রফিকুল ইসলামকে অভিযুক্ত করা হয়। তবে ভবন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান রূপায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান মুকুলকে মামলা থেকে অব্যাহতির আবেদন করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। পরে মামলাটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত না হওয়ায় পিবিআইকে অধিকতর তদন্তের জন্য নির্দেশ দেন ঢাকার সিএমএম আদালত। এরপর পিবিআই মামলার তদন্ত শুরু করে। গত ২২ জানুয়ারি মামলাটি তদন্ত করে আদালতে একই আসামিদের অভিযুক্ত করে ও লিয়াকত আলী খান মুকুলকে অব্যাহতির সুপারিশ করে চার্জশিট জমা দেন তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রফিকুল ইসলাম।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রশিদুল আলমের আদালত পিবিআই’র দেওয়া ৮ আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট গ্রহণ করেন। পরে গত বছরের ২৩ এপ্রিল মামলাটি ঢাকা মহানগর অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত-৯ এ বদলি হয়। ১১ মাস পরও সেই আদালতে চার্জগঠন হয়নি। আগামী ১৭ এপ্রিল এই মামলার চার্জশিটভুক্ত অন্যতম আসামি ইজারা গ্রহীতা এস এম এইচ আই ফারুকের মৃত্যুর প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করা হবে। এদিন এ সংক্রান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। বাকি ৭ আসামি বিভিন্ন সময় আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন। বর্তমানে তারা জামিনে আছেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, লিয়াকত আলী খান মুকুল এবং এফ আর টাওয়ার বিল্ডিং ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা অসৎ উদ্দেশ্যে আর্থিক সুবিধার লোভে নির্মাণ বিধিমালা না মানায় এফআর টাওয়ারে এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ১৯৯৬ সালে এফআর টাওয়ারের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদিত নকশায় ভবনের উচ্চতা ১৮ তলা। কিন্তু নির্মাণ বিধিমালা না মানায় ভবনটি ২৩ তলা করা হয়েছে। পরে ২০০৫ সালে এফআর টাওয়ারের মালিকপক্ষ রাজউকের কাছে আরেকটি নকশা জমা দেয়। ১৯৯৬ সালে মূল যে নকশা রাজউক অনুমোদন দিয়েছিল তার সঙ্গে নির্মিত ভবনটির অনেক বিচ্যুতি রয়েছে। এ কারণে দণ্ডবিধির ৪৩৬/৩০৪(ক)/৪২৭/১০৯ ধারায় মামলা হয়। এজাহারে ভবনের ইজারা গ্রহীতা এস এম এইচ আই ফারুক, রূপায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান মুকুল ও ২২ তলার ফ্ল্যাটের মালিক তাজভীর উল ইসলামকে আসামি করা হয়।
আসামি তাজভীরের আইনজীবী মাজেদুর রহমান মামুন বলেন, ভবনে ২২ তলার ৩টি ফ্ল্যাটের মালিক ছিলেন তাজভীর। আগুন লেগেছে ৮ম তলা থেকে। তিনি তিনটি মাত্র ফ্ল্যাটের মালিক। এগুলো তিনি কিনেছেন। ভবন নির্মাণসহ কোনও অনিয়মের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা নেই। আমরা আশা করি, এ মামলা থেকে তিনি খালাস পাবেন।
আসামি মাহমুদুন নবীর আইনজীবী আব্দুল হক আব্বাসী সুজন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ১১তম তলার মালিক মাহমুদুন নবী। ৮ম তলায় শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লেগে ১০ তলা পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। ১১তলায় তো কোনও অনিয়ম নেই। এছাড়া ভবনের কোনও পদে আমার মক্কেলের থাকার প্রমাণ নেই। অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ভবনের পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে কোনও মিটিংয়ে আমার মক্কেল ছিলেন, এ ধরনের কোনও প্রমাণ নেই। সুষ্ঠু বিচার হলে মাহমুদুন নবী নির্দোষ প্রমাণিত হবেন।
মামলা সম্পর্কে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ঢাকা মহানগরের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, মামলাটির দুই দফা তদন্ত শেষে বর্তমানে চার্জগঠন পর্যায়ে রয়েছে। চার্জগঠনের পর বিচার শুরু হবে। আমরা সাক্ষীদের হাজির করে যত দ্রুত সম্ভব মামলার বিচারকাজ শেষ করার চেষ্টা করবো।
সাক্ষ্যগ্রহণে আটকে আছে দুদকের দুই মামলা
এ ঘটনায় নকশা জালিয়াতি ও ভুল নকশা অনুমোদনের অভিযোগে দুদকের উপপরিচালক আবু বকর সিদ্দিক দুইটি মামলা করেন। দুই মামলার বিচার শুরু হলেও সাক্ষ্যগ্রহণে তেমন অগ্রগতি নেই। দীর্ঘ সাড়ে তিন বছরে একটি মামলায় ৮ জন ও অপর মামলায় ২০ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।
জানা গেছে, ২০১৯ সালের ২৫ জুন উপপরিচালক মো. আবুবকর সিদ্দিক বাদী হয়ে রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. হুমায়ুন খাদেমসহ চার জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিলেন। অপর আসামিরা হলেন- রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ইজারা গ্রহীতা সৈয়দ মো. হোসাইন ইমাম ফারুক (এম এইচ আই ফারুক), রূপায়ন হাউজিং এস্টেট লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক লিয়াকত আলী খান মুকুল এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সাইদুর রহমান।
যেখানে দণ্ডবিধির চারটি ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন-১৯৪৭ এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়। ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দুদকের উপপরিচালক আবু বকর সিদ্দিক অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০২১ সালের ১৮ অক্টোবর ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল আদালতে ৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জগঠন করেন। পরে একই বছর ১৫ নভেম্বর থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এ পর্যন্ত ৪০ জনের মধ্য ২০ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। আগামী ২৮ এপ্রিল এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ রয়েছে।
একই দিন অনিয়মের অভিযোগে দুদক আরেকটি মামলা করে। এ মামলায় ২০ জনকে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়। পরে তদন্ত সাপেক্ষ আরও পাঁচ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে নতুন করে এজাহারভুক্তির তালিকা থেকে সাত জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর ২০২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ১৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেন তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের তৎকালীন উপপরিচালক আবু বকর। পরে ২০২১ সালের ১৫ নভেম্বর ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। পরে মারা যাওয়ায় এ মামলা থেকে দুই জনকে অব্যাহতি দেন আদালত। তারা হলেন- ভবনের ইজারা গ্রহীতা মো. হোসাইন ইমাম ফারুক (এইচ আই ফারুক) ও রাজউকের অফিস সহকারী এনামুল হক। সর্বশেষ মামলাটির ৪৬ জন সাক্ষীর মধ্যে ৮ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। গত ১৬ মার্চ এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের পর আগামী ৩০ এপ্রিল সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন আদালত।
ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল কোর্টের পেশকার আরিফ হোসেন এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, আসামিরা অসৎ উদ্দেশ্যে অন্যায়ভাবে পরস্পর যোগসাজশে প্রতারণা, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ১৯৯৬ এর বিধি-বিধান লঙ্ঘন করেন। এছাড়া ভবন নির্মাণের ছাড়পত্র ইস্যু, ফি জমা ও নকশা অনুমোদন ছাড়া ভুয়া নকশা তৈরি, ১১ তলার ডেভিয়েশনসহ নির্মাণ, ১৯ হতে ২৩ তলা পর্যন্ত অবৈধভাবে নির্মাণ করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্ধক প্রদান ও বিক্রি করার অপরাধ করেন। যে কারণে দণ্ডবিধির ৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১৬৬/ ১০৯ ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারায় অভিযোগপত্র দাখিলের সিদ্ধান্ত নেয়।
দুদকের মামলায় অভিযুক্ত আসামিরা হলেন- রূপায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান মুকুল, এফআর টাওয়ার ওনার্স সোসাইটির সভাপতি তাজভীর উল ইসলাম, রাজউকের সাবেক পরিচালক মো. শামসুল আলম, সহকারী পরিচালক মেহেদুজ্জামান, সহকারী পরিচালক শাহ মো. সদরুল আলম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক জাহানারা বেগম, সহকারী অথরাইজড অফিসার নজরুল ইসলাম, রাজউকের উচ্চমান সহকারী মো. সাইফুল আলম, ইমারত পরিদর্শক ইমরুল কবির ও মো. শওকত আলী, উচ্চমান সহকারী মো. শফিউল্লাহ, সাবেক অথরাইজড অফিসার মো. শফিকুল ইসলাম, নিম্নমান সহকারী মুহাম্মদ মজিবুর রহমান মোল্লা ও শওকত আলী।
মামলার অগ্রগতির বিষয়ে জানতে দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর রুহুল ইসলামকে কয়েকবার কল দিয়েও পাওয়া যায়নি।