‘মহাসাগরকে বাঁচান, ভবিষ্যৎ রক্ষা করুন’ স্লোগানকে সামনে রেখে শুরু হওয়া পাঁচ দিনব্যাপী জাতিসংঘের সমুদ্র সম্মেলন শেষ হলো। এবারের সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন, প্লাস্টিক দূষণ ও সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বৈশ্বিক পদক্ষেপের অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সমুদ্র রক্ষার একটি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়েছে। সমুদ্র দূষণ প্রতিরোধ নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি এবারও গভীর সমুদ্র খননের ঝুঁকি, অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ, প্লাস্টিক ও রাসায়নিক দূষণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো জরুরি সংকটগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সমুদ্র রক্ষায় ‘হাই সিজ ট্রিটি’ নামে পরিচিত চুক্তিতে ১৯টি নতুন দেশ সই করেছে। গঠন করা হয়েছে বিশাল অঙ্কের তহবিল, যাতে অংশ নিচ্ছে বিশ্বব্যাংক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বেশ কয়েকটি দাতা সংস্থাসহ একাধিক রাষ্ট্র।
আয়োজকরা জানিয়েছেন, নিসে অনুষ্ঠিত সমুদ্র সম্মেলনে জাতিসংঘের ১৭৫টি সদস্য রাষ্ট্র, ৬৪ জন রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান, ১১৫ জন মন্ত্রী, বহু আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রতিনিধি, সামুদ্রিক বিজ্ঞানী, পরিবেশ বিজ্ঞানীসহ প্রায় ১২ হাজার প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন। পাঁচ দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে শতাধিক ইভেন্ট। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্মেলনের সুবাদে সত্যিই বিশ্বের সমুদ্রগুলোর মান অনেক ভালো হবে।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, ‘জরুরি পরিস্থিতি’র মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের মহাসাগরগুলো। এবারের সম্মেলন ছিল মহাসাগর নিয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সমাবেশ যা পুরোপুরি সমুদ্র নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘সমুদ্র আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি বিপন্ন হলে, আমাদের ভবিষ্যৎও বিপন্ন হবে।’ তিনি বলেন, 'মহাসাগর আমাদের গ্রহের প্রাণভোমরা। এটি আমাদের শ্বাসের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের অর্ধেক সরবরাহ করে, কোটি কোটি মানুষকে আহার জোগায়, কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থানকে সহায়তা করে, এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তবুও আমরা এটিকে সীমাহীন সম্পদ মনে করে আচরণ করছি – এমন ভান করছি যেন আমাদের অপব্যবহার সহ্য করেও এর কোনো ক্ষতি হবে না। জলবায়ু পরিবর্তন মহাসাগরের অম্লতা ও উষ্ণতা বাড়াচ্ছে– যা প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস করছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি করছে ও বিশ্বজুড়ে মানুষকে হুমকির মুখে ফেলছে। যখন আমরা মহাসাগরকে বিষাক্ত করি, তখন নিজেদেরকেই বিষাক্ত করি।’
জাতীয় জলসীমার বাইরের ৬০ শতাংশ সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য একটি ঐতিহাসিক চুক্তি অনুমোদনের দিকে এগিয়ে যাওয়ায় এবারের সম্মেলনকে সকলেই সর্বসম্মতভাবে প্রশংসা করেছেন। নিসে ১৯টি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটি অনুমোদন করেছে, যার ফলে মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০-এ। চুক্তি কার্যকর করতে ৬০টি দেশের অনুমোদন প্রয়োজন। হাই সিজ অ্যালায়েন্সের রেবেকা হাবার্ড বলেছেন, ‘এই সপ্তাহে উচ্চ সমুদ্র চুক্তির অনুমোদন মহাসাগর রক্ষার ক্ষেত্রে বড় মাইলফলক।’
ফ্রান্সের মহাসাগর বিষয়ক বিশেষ দূত ওলিভিয়ার পওভার ডারভোর জানান, সেপ্টেম্বর মাসে নিউইয়র্কে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যা পূর্ণ হবে। এরপর চুক্তিটি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কার্যকর হবে।
এবারের সম্মেলনে গভীর সমুদ্র খননের বিরুদ্ধে বিশ্ব নেতারা শক্ত অবস্থান নেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ এটিকে ‘পাগলামি’ বলে মন্তব্য করেছেন। ব্রাজিলের লুলা দা সিলভা একে ‘লুণ্ঠনপ্রবণ প্রতিযোগিতা’ হিসেবে অভিহিত করেন। যদিও গভীর সমুদ্র খননের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক জোটে মাত্র চারটি নতুন দেশ যোগ দিয়েছে। মোট সদস্য দাঁড়িয়েছে ৩৭টি। এ জোট আগামী মাসে আন্তর্জাতিক সমুদ্রতল কর্তৃপক্ষের বৈঠকে খননের বিরোধিতা করবে বলে জানিয়েছে।
সম্মেলনে সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে সমুদ্রদূষণ রোধ করার বিষয়টি। ২০৩০ সালের মধ্যে প্লাস্টিকসহ সব ধরনের সামুদ্রিক বর্জ্য কমাতে একটি আন্তর্জাতিক বাধ্যতামূলক চুক্তি প্রস্তাব করা হয়। এতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সমুদ্রদূষণ অর্ধেকে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা গ্রহণে আহ্বান জানানো হয়েছে। নিসে ৯০টিরও বেশি দেশের সরকারি প্রতিনিধিরা একটি প্রতীকী আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে প্লাস্টিক চুক্তিতে নতুন প্লাস্টিক উৎপাদন ও ব্যবহারের সীমা আরোপ করা হয়। যদিও তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো এই চুক্তির বিরোধিতা করেছে। ব্লু ইকোনোমি তথা ‘নীল অর্থনীতি’ গড়ে তোলার জন্য তহবিল গঠন করা হয়েছে। সমুদ্রভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে টেকসই করতে গঠিত হয়েছে তহবিল। এতে অংশ নিচ্ছে বিশ্বব্যাংক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বেশ কয়েকটি দাতা সংস্থা। মৎস্য, জাহাজ নির্মাণ, সামুদ্রিক পর্যটন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো হবে। যদিও সম্মেলনে দাতা ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা আগামী পাঁচ বছরে মহাসাগর অর্থনীতি টেকসই করার জন্য ৮.৭ বিলিয়ন ইউরো (১০ বিলিয়ন ডলার) প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি খুব বেশি আসেনি। ফ্রান্স প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য মাত্র দুই মিলিয়ন ইউরো ঘোষণা করেছে।
সমুদ্রের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করার জন্য গঠন করা হচ্ছে নতুন একটি ‘গ্লোবাল ওশেন মনিটরিং নেটওয়ার্ক’, যা মহাসাগরের উষ্ণতা ও অম্লতা বৃদ্ধির প্রভাব পর্যবেক্ষণ করবে। এছাড়া সম্মেলনে ঘোষণা করা হয়, ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিকভাবে সমুদ্রের ৩০ শতাংশ অঞ্চল সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। এর ফলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বড় অগ্রগতি আশা করা হচ্ছে। সম্মেলনে উন্নয়নশীল ও ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর জন্য প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে সহায়তার বিষয়টি গুরুত্ব পায় আলোচনায়।
জীবাশ্ন জ্বালানি ইস্যু নিয়ে আলোচনা না হওয়ায় সমালোচনা
ফ্রান্সের নিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ মহাসাগর সম্মেলনে মহাসাগর রক্ষায় বিশ্বনেতারা অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করলেও, জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা থেকে সরে আসার বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে সমালোচনা উঠেছে। সমালোচকরা বলছেন, জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা এবং অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানই মহাসাগর ও জীববৈচিত্র্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হলেও এই বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ বা অঙ্গীকার নাইস পলিটিক্যাল ডিক্লারেশনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। পরিবেশবিদরা বলছেন, সমুদ্র উষ্ণতার মূল কারণ হলো জীবাশ্ম জ্বালানি। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা না করাটা হতাশাজনক।
পরিবেশবাদী প্রতিষ্ঠান সিআইইএল- এর ব্রুনা কাম্পোস বলেন, 'মহাসাগর রক্ষার বিষয়ে যখন বৈশ্বিক সম্মেলন হচ্ছে, তখন জীবাশ্ম জ্বালানি ইস্যুটি বাদ দেওয়া অন্যায় এবং অগ্রহণযোগ্য। প্যাসিফিক ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো তাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অফশোর তেল-গ্যাস বন্ধের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি জোরালোভাবে তুললেও, তা চূড়ান্ত ঘোষণায় প্রতিফলিত হয়নি।
ইউরোপীয় ক্লাইমেট ফাউন্ডেশনের সিইও লরেন্স টুবিয়ানা বলেন, 'নিস দেখিয়েছে বৈশ্বিক সহযোগিতা এখনও সম্ভব, কিন্তু স্বাক্ষরকে সমাধান হিসেবে ভাবা যাবে না।' তিনি বলেন, ‘কোনো যৌথ বিবৃতিই সমুদ্র তাপপ্রবাহ ঠাণ্ডা করে না।’
প্রাক্তন মার্কিন জলবায়ু দূত জন কেরি, যিনি নিসে উপস্থিত ছিলেন, এক বিবৃতিতে বলেছেন, 'যতক্ষণ না আমরা বাতাসে নির্গত জীবাশ্ম জ্বালানি দূষণের বিরুদ্ধে লড়াই করি, ততক্ষণ পর্যন্ত সমুদ্র রক্ষা সম্ভব নয়।'