পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার খেলার মাঠ দখলকে কেন্দ্র করে ‘চাচ্চুরা মাঠে খেলতে দেয় না, বাড়িওয়ালাও ছাদে উঠতে দেয় না’ শিরোনামে গত ২৭ জুন প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলা ট্রিবিউন। সেই প্রতিবেদনের পর অবশেষে মাঠটি দখলমুক্ত করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।
বৃহস্পতিবার (১৭ জুলাই) সরেজমিন দেখা গেছে, লক্ষ্মীবাজার খেলার মাঠে ফুটবল খেলায় মেতেছে শিশু-কিশোররা। দীর্ঘদিন পর মাঠে খেলতে পেরে আনন্দে আত্মহারা তারা। কেউ যেন আবার তাদের মাঠটি দখল করতে না পারে সেই অনুরোধ শিশু-কিশোরদের।
মাঠে ফুটবল খেলতে আসা মো. আদনান নামে এক কিশোর বাংলা ট্রিবিউনকে বলে, অনেকদিন মাঠে খেলতে পারিনি। স্কুলে খেলার মাঠ না থাকার কারণে আগে বিকাল হলেই এই মাঠে খেলতে আসতাম। কিন্তু এই মাঠে যখন খেলা বন্ধ ছিল তখন ঘরে বসে থাকতে হতো। কারণ বন্ধু-বান্ধব নিয়ে খেলার আর কোনও জায়গা ছিল না।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া এই কিশোর আরও বলে, গত বছরও এই মাঠ একবার দখল হয়। যার কারণে আমরা খেলতে পারিনি। দ্বিতীয় ধাপে মাঠ দখলমুক্ত করা হয়েছে। আমরা চাই, এই মাঠ যেন আর কখনও দখল না হয়। ঢাকা শহরে আরও বেশি-বেশি খেলার মাঠ হোক।
লক্ষ্মীবাজার মাঠে বিকালে খেলতে এসে বেজায় খুশি চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাফি। বাংলা ট্রিবিউনকে সে বলে, আমাদের মাঠে আমরা সকাল-বিকাল সবসময় খেলতে চাই। সবার কাছে অনুরোধ, আমাদের মাঠ যেন আর কখনও দখল না হয়।
তামজিদ নামে আরেকজনের ভাষ্য, বাসার ভেতরে ফুটবল খেললে আম্মু বকা দেয়, জিনিসপত্র নষ্ট হয়। আমি আর আমাদের ফ্ল্যাটের কয়েকজন বন্ধু মিলে ছাদে খেলতাম, সেটাও বাড়িওয়ালা আঙ্কেল বন্ধ করে দেন। এ জন্য এতদিন বাসায় মোবাইল আর গেমস খেলেই সময় পার করেছি। এখন যেহেতু মাঠে আবার খেলার সুযোগ হয়েছে নিয়মিত মাঠে খেলবো।
মাঠে শিশু-কিশোরদের খেলা উপভোগ করার সময় হাবিবুর রহমান নামে একজন স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে শহরজুড়ে দখলদারত্ব বেড়েছে। পুরান ঢাকার অনেক খালি জায়গা দখল হয়েছে। কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে আশ্চর্য লেগেছে যখন কিছু প্রভাবশালী এই মাঠ দখল করে ব্যবসা শুরু করে। সিটি করপোরেশনকে ধন্যবাদ মাঠটি দখলমুক্ত করে শিশুদের খেলার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।
তিনি আরও বলেন, দখলদারদের লাগাম টানতে না পারলে এরা আরব বেপরোয়া হয়ে উঠবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এই এলাকায় লম্বা সময়ের জন্য ফুটপাত দখলমুক্ত ছিল, চাঁদাবাজিমুক্ত এলাকা ছিল। কিন্তু এখন আবার দখল হয়ে গেছে, চাঁদাবাজি শুরু হয়েছে। একজন অভিভাবক হিসেবে আমার প্রত্যাশা, শিশুদের সব বিনোদনকেন্দ্র উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক। একইসঙ্গে রাজধানীর সব মাঠ দখলমুক্ত থাকুক, শিশু-কিশোরদের কোলাহলে সবসময় মাঠগুলো মুখরিত থাকুক।
মাহিনুর আক্তার নামে লক্ষ্মীবাজারের এক বাসিন্দা বলেন, রাজধানীতে এমনিতেই প্রয়োজনের তুলনায় খেলার মাঠের সংখ্যা অপ্রতুল। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা অত্যন্ত জরুরি। সরকারের উচিত, শিশুদের খেলাধুলার মাঠগুলো সবসময় দখলমুক্ত রাখা। এছাড়াও মাঠের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। তবেই এই প্রজন্ম মোবাইল বা গেমস খেলায় আসক্ত না হয়ে মাঠে খেলতে যাবে।
দখলদারদের উচ্ছেদের বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা হাছিবা খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রুটিনমাফিক আমাদের উচ্ছেদ অভিযান চলমান আছে। বিভিন্ন জায়গায় জোরজবরদস্তি করে যারা মাঠ দখল করেছিল, আমরা সেখানে অভিযান চালিয়ে দখলদারদের উচ্ছেদ করেছি।
এদিকে মাঠে দখলদারদের উচ্ছেদের বিষয়ে কবি নজরুল কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইরফান আহমেদ ফাহিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, লক্ষ্মীবাজারে সাধারণ জনগণের চলাচলে বাধা সৃষ্টিকারী মেলা বন্ধ এবং মাঠ দখলদারদের উচ্ছেদে সহযোগিতা করেছে কবি নজরুল কলেজ ছাত্রদল ও সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রদল। যদিও সিটি করপোরেশনের অভিযানে স্থানীয় কয়েকজন বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আমার তার তোয়াক্কা করিনি।
আরও পড়ুন...